
হাসিমুখে বাংলাদেশ থেকে ইংল্যান্ড গেছেন হামজা চৌধুরী
এএফসি এশিয়ান কাপর বাছাইাপর্বে স্বাগতিক ভারতের বিপক্ষে অল্পের জন্য জিততে পারেনি বাংলাদেশ। এই ম্যাচে লাল-সবুজ জার্সিতে অভিষেক হয়েছে হামজা চৌধুরীর। তিনিই ছিলেন ম্যাচের প্রধান আকর্ষণ। তার খেলা নিয়ে জনকণ্ঠের কাছে বিশ্লেষণ করেছেন বাংলাদেশ জাতীয় নারী ফুটবল দলের ফরোয়ার্ড কৃষ্ণা রানী সরকার এবং বাংলাদেশ জাতীয় যুব ফুটবল দলের ম্যানেজার ও সাবেক জাতীয় ফুটবলার জাহিদ হাসান এমিলি।
কৃষ্ণা রানী সরকার বলেন, ‘বাংলাদেশ-ভারত ম্যাচে হামজার খেলা দেখলাম। তার খেলা দেখে খুব ভালো লেগেছে। আমি মুগ্ধ। তাকে আমি রেট করবো টেন অব টেন। তিনি যেভাবে ডিফেন্ডিং, অ্যাটাকিং সব রোলই প্লে করেছেন, যেভাবে ওঠানামা করে খেলেছেন ... মোটকথা দলের জন্য যেভাবে খেলা দরকার, ঠিক সেভাবেই খেলেছেন, পুরোপুরি প্রত্যাশা পূরণ করেই। হানড্রেডে হানড্রেড। এককথায় আউটস্ট্যান্ডিং।’
কৃষ্ণা আরও বলেন, ‘ফুটবল তো আসলে দলগত খেলায়। ভালো করতে গেলে এক্সপিরিয়েন্স, বন্ডিং লাগে। জাতীয় দলের হয়ে এই প্রথম খেললেত হামজা। সময় স্বল্পতার কারণে দলের সঙ্গে খুব বেশি অনুশীলন করার সময় পাননি তিনি। তারপরও নিজের এক্সপিরিয়েন্স দিয়ে সতীর্থদের সঙ্গে ঠিকই চমৎকারভাবে মানিয়ে নিতে পেরেছেন। তাদের সঙ্গে ভালো বন্ডিং হয়েছে, বোঝাপড়াও মন্দ ছিল না। এটা আমাদের প্লেয়ারদের জন্য যেমন ভালো হয়েছে, তেমনি ওনার জন্যও ভালো হয়েছে।’
এটা কি হামজার জন্য আক্ষেপের বিষয় না, যে তিনি এত ভালো খেললেন, কিন্তু তার দুর্দান্ত অভিষেকে তার দল জিততে পারল না? তার সতীর্থরা ৫/৬টা গোলের সুযোগ পেয়েও অন্তত একটা গোলও করতে পারলেন না? একমত হলেন কৃষ্ণা, ‘প্রথম যে গোলটা মিস হলো, সেটাই গোল হতে পারতো। হামজা ভাই একাধিক গোলের চান্স ক্রিয়েট করে দিয়েছিলেন, কিন্তু তার সতীর্থরা সেগুলো একটিও কাজে লাগাতে পারেননি। যদি সেগুলোর একটিও কানেক্ট হতো, তাহলে একটি গোল তো হতোই। কাজেই আক্ষেপ তো থাকবেই।’
হামজার ওপর মূল দায়িত্ব ছিল বাংলাদেশের আতঙ্ক সুনীল ছেত্রীকে মার্কিং করার বা আটকানোর, এটি তিনি কতটুকু করতে পেরেছেন? কৃষ্ণার জবাব, ‘সুনলি ছেত্রী অনেকদিন পর অবসর ভেঙে ফের জাতীয় দলে ফিরেছেন। তার ওপরই ভারতের ভরসা ছিল বেশি। আর হামজা সেই ভরসার পাত্র সুনীলকে বেশ ভালোমতোই সামলেছেন।’
সবশেষে কৃষ্ণার ভাষ্য, ‘হামজা ভাই বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলের জন্য ভবিষ্যতের জন্য নয়, এখনই তিনি সন্দেহতীতভাবেই একটা সম্পদ। প্রথম ম্যাচেই তিনি যেভাবে খেলেছেন, তাতে তিনি সমর্থকদের প্রত্যাশা পুরাপুরি মিটিয়েছেন। আগামীতে তিনি আরও ভালো খেলবেন এবং দলকে সাফল্য এনে দেবেন, এটাই আশাকরি।’ জাহিদ হাসান এমিলি বলেন ‘যদি ইন্ডিয়া-বাংলাদেশ ম্যাচটা ওভারঅল দেখে থাকেন, তাহলে বলবো ম্যাচে যে ২২ জন প্লেয়ার খেলেছেন, তাদের মধ্যে ম্যান অব দ্য ম্যাচ হচ্ছেন হামজা।
যদি হামজার খেলা নিয়ে আমাকে রেটিং করতে বলা হয়, তাহলে আমি তাকে দশের মধ্যে দশ-ই দেব। এবার কারণ তিনিই একমাত্র খেলোয়াড়, যিনি মাঠের অন্য খেলোয়াড়দের চেয়ে একেবারে ভিন্ন ধাঁচের খেলা খেলেছেন। তার খেলাটা একেবারেই আলাদা মনে হয়েছে। তিনি যে পজিশনে খেলেছেন, সেই প্রত্যেকটা জোনে গিয়ে তার দায়িত্বটা সূচারুভাবে পালন করেছেন। এবং কিছু অতিরিক্ত দায়িত্বও পালন করেছেন তিনি। যেমন ধরুন রাইটব্যাকে তিনি রহমত মিয়াকে কভার করেছেন।
লেফট ব্যাকে সাদকে কভার করেছেন। মিডফিল্ডে হৃদয় ও যারা ছিল, তিনি তাদের বেশ ভালোভাবে কভার-আপ করেছেন। কোনো কোনো সময় তিনি তারিক কাজীকেও পর্যন্ত কভার করেছেন। সুতরাং তিনি যে পজিশনে খেলেন, আমার মনে হয় তিনি তার সেরা খেলাটাই খেলেছেন। তার কাছ থেকে যেটা সবচেয়ে বড় পাওয়া ছিল, ওয়ার্ল্ড ফুটবলে যে দু-তিনজন প্লেয়ার আছে, তার মধ্যে হামজা একজন; যিনি অপোনেন্টের কাছ থেতে বল কেড়ে নেওয়ার ব্যাপারে দক্ষ।
ভারতের বিপক্ষেও তিনি এই কাজ করেছেন চমৎকারভাবে। দেখবেন বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বল দখলের লড়াইয়ে তিনিই কিন্তু জয়ী হয়েছেন। তাই বলব, হামজার পারফরম্যান্স এককথায় অসাধারণ ছিল। তাই এই ম্যাচের সেরা খেলোয়াড় আমার চোখে তিনিই।’
ইংল্যান্ড থেকে বাংলাদেশে এসে এবং দলের সঙ্গে শিলং গিয়ে হামজা কিন্তু সতীর্থদের সঙ্গে খুব বেশি বেশি অনুশীলন করার সময় পাননি। সেক্ষেত্রে একটা শঙ্কা ছিল যে হয়তো দলের সঙ্গে মানিয়ে নিতে সমস্যা হবে হামজার এবং তার প্রভাব পড়বে তার মাঠের খেলায়। কিন্তু হয়েছে ঠিক ঠিক তার উল্টো। বরং ভারতের বিপক্ষে মাঠে তিনি সতীর্থদের চেয়ে বেশি উজ্জ্বল ছিলেন। অথচ বেশিরভাগ খেলোয়াড়দের ক্ষেত্রে দেখা যায় তারা মানিয়ে নিতে পারেন না।
এ ব্যাপারে এমিলির দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেন, ‘খুবই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। হঠাৎ করে এসে দলের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়াটা খুবই কষ্টকর, অনেক সময় অসম্ভবও বটে। তবে হামজার বেলায় তা হয়নি। আমার মনে হয় এমনটা হয়েছে হামজা ইজ এ ভেরি হাম্বল পার্সন। ভদ্র ও নমনীয় একটা ছেলে। হাসিমুখ ছাড়া কথা বলে না। অফ দ্য ফিল্ডে যখন আপনার একটা অন্যরকম চরিত্র ফুটে উঠবে, তখন মাঠের ফুটবলে কিন্তু সেই চরিত্রটা প্রতিফলিত হবেই। আপনি যখন ভালো ব্যবহারের মানুষ হবেন, তখন অন্যদের সঙ্গে একটা গুড রিলেশন তৈরি হবে।
এতে মাঠে অন্য প্লেয়ারদের সঙ্গে তার একটা অন্যরকম রিলেশন তৈরি হবে। যার কারণে হামজারও মানিয়ে নিতে সময় লাগেনি। আর আপনি যদি মুডি হতেন, বেশি ভাব নিতেন, নিজের ইগো বেশি প্রাধান্য দেবেন, তখন কিন্তু আপনার এডজাস্ট করতে বেশি সময় লাগবে। হামজার মতো এত উঁচুমানের প্লেয়ার যে এত কম প্র্যাকটিস করে এত তাড়াতাড়ি জাতীয় দলের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারবে, এটা ভাবতেই পারিনি। এর প্রধান কারণ তিনি একজন বিনয়ী মানুষ।’