
খালেদা জিয়া
এ মাসেই দেশে ফিরবেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। দেশে ফিরে দ্রুত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দাবি জোরদার করবেন। আর বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকদের সঙ্গে বৈঠক করবেন। এ ছাড়া সারাদেশের সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের মাঠে সক্রিয় রাখার কৌশল হিসেবে বিভিন্ন কর্মসূচি পালনের নির্দেশ দেবেন। দেশে ফেরার আগে লন্ডন থেকে সৌদিআরব গিয়ে ওমরাহ পালন করতে পারেন তিনি।
সূত্র মতে, লন্ডনে চিকিৎসা নেওয়ার পর বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার বেশ উন্নতি হয়েছে। তাই আগের চেয়ে ভালো আছেন তিনি। এ পর্যন্ত করা স্বাস্থ্য পরীক্ষার সবগুলো রিপোর্টই ভালো এসেছে। লন্ডনের কিংস্টনে ছেলে তারেক রহমানের বাসায় চিকিৎসকদের পরামর্শে নিয়মিত ওষুধ সেবনের পাশাপাশি নাতনিদের সঙ্গে ভালো সময় কাটাচ্ছেন।
মাঝে মধ্যে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে পার্কেও বেড়াতে যাচ্ছেন। তাই সার্বিক বিবেচনায় তিনি স্বস্তিতে রয়েছেন। এখন তিনি দেশে ফেরার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন। দেশে ফিরে সরাসরি না হলেও মাঝে মাঝে তিনি ভার্চুয়ালি বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময় করবেন।
খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত চিকিৎসক ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন বলেছেন, ছেলে তারেক রহমানের বাসায় অবস্থান করলেও লন্ডন ক্লিনিকের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক প্যাট্রিক কেনেডি ও জেনিফার ক্রসের ত্ত্বাবধানে ম্যাডামের চিকিৎসা চলছে।
তাঁর আগের শারীরিক পরীক্ষাগুলোর রিপোর্ট ভালো এলেও লন্ডন ক্লিনিকের চিকিৎসকদের পরামর্শে আবারও পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয়েছে। এই পরীক্ষার রিপোর্ট দেখে প্রয়োজনে আবারও তাকে লন্ডন ক্লিনিকে নেওয়া হবে। এর পর চিকিৎসকরা সিদ্ধান্ত নেবেন কত দ্রুত তিনি দেশে ফেরার মতো অবস্থায় যেতে পারবেন।
সূত্র জানায়, কিছুদিনের মধ্যেই খালেদা জিয়ার চিকিৎসা বোর্ড তাঁর শারীরিক অবস্থা নিয়ে বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনা করবেন। তার পর শারীরিক অবস্থার আরও উন্নতি হলে তিনি এ মাসেই দেশে ফিরে আসবেন।
উল্লেখ্য, কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানির পাঠানো রাজকীয় এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে গত ৭ জানুয়ারি বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া চিকিৎসার জন্য লন্ডনের উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করেন। ৮ জানুয়ারি হিথ্রো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নেমে সেখান থেকে সরাসরি তাঁকে অ্যাম্বুলেন্সে করে ডেভেনশায়ার প্লেসে ‘দ্য লন্ডন ক্লিনিক’-এ ভর্তি করা হয়।
লন্ডন ক্লিনিকে অধ্যাপক ড. জন প্যাট্রিক কেনেডির তত্ত্বাবধানে ১৭ দিন চিকিৎসার পর খালেদা জিয়া হাসপাতাল থেকে ছেলের বাসায় গিয়ে অবস্থান করেন। এর পর লন্ডন ক্লিনিকে তার জন্য গঠিত মেডিক্যাল বোর্ডের সিদ্ধান্তে ছেলে তারেক রহমানের বাসায়ই অধ্যাপক প্যাট্রিক কেনেডি ও অধ্যাপক জেনিফার ক্রসের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা চলে।
এদিকে লন্ডন যাওয়ার পর থেকেই ছেলে তারেক রহমান সব সময় মায়ের কাছাকাছি থেকে শারীরিক অবস্থাসহ সবকিছুর খোঁজ রাখছেন। এ ছাড়া তারেক রহমানের স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান ও প্রয়াত ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর স্ত্রী শর্মিলা রহমান সিঁথি ওষুধ সেবনের বিষয়টি তদারকিসহ তিনি কখন কি খাবেন সেদিকে খেয়াল রেখে নিয়মিত বাসায় তৈরি করা খাবার পরিবেশন করছেন।
জানা যায়, লন্ডনে খালেদা জিয়া সবচেয়ে ভালো সময় কাটাচ্ছেন তিন নাতনির সঙ্গে। তিন নাতনির মধ্যে রয়েছেন- তারেক রহমানের মেয়ে ব্যারিস্টার জাইমা রহমান এবং আরাফাত রহমান কোকোর মেয়ে জাসিয়া রহমান ও জাহিয়া রহমান। কখনো তিন নাতনি একসঙ্গে আবার কখনো বড় নাতনি জাইমা রহমান এককভাবে খালেদা জিয়ার কাছে বসে খোশগল্প করেন।
আবার কখনো কখনো খালেদা জিয়া টেলিভিশনে দেশ-বিদেশের খবর দেখেন। আবার কখনো কখনো তিনি স্বজনদের সঙ্গে ফোনসহ বিভিন্ন মাধ্যমে কথা বলে সময় কাটান। দেশ-বিদেশের বিএনপি নেতারাও নিয়মিত খালেদা জিয়ার খোঁজখবর রাখছেন বলে জানা যায়।
প্রায় ৮০ বছর বয়সী সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া দীর্ঘদিন ধরে লিভার সিরোসিস, কিডনি, হার্ট, ডায়াবেটিস, আর্থ্রাইটিস ও চোখের সমস্যাসহ নানা শারীরিক অসুস্থতায় ভুগছেন। ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি কারাবন্দি হওয়ার পর বিদেশে নিয়ে উন্নত চিকিৎসা দেওয়ার বারবার চেষ্টা করলেও আওয়ামী লীগ সরকার তাঁকে সেই সুযোগ দেয়নি। তবে এ বছর ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলে ৬ আগস্ট তিনি স্থায়ী মুক্তি পান। এর পর খালেদা জিয়ার বিদেশে গিয়ে চিকিৎসার পথ সুগম হয়।
জানা যায়, লন্ডন যাওয়ার আগে খালেদা জিয়ার লিভার ট্রান্সফারের কথা বলা হলেও পরে লন্ডন ক্লিনিকে চিকিৎসা শুরুর পর সে অবস্থান থেকে সরে আসে তাঁর মেডিক্যাল বোর্ড। প্রায় ৮০ বছর বয়সী খালেদা জিয়াকে আপাতত ওষুধের মাধ্যমেই চিকিৎসা চালানো হচ্ছে। তবে তাঁর শারীরিক অবস্থার আরও উন্নতির পর এর বাইরেও যদি কোনো চিকিৎসার প্রয়োজন হয় তবে যুক্তরাষ্ট্রের জন হপকিনস হসপিটালের মেডিক্যাল টিমের সদস্যদের পরামর্শ নিয়ে লন্ডনের মেডিক্যাল বোর্ডের চিকিৎসকরা সিদ্ধান্ত নেবেন।
এদিকে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া যে দেশে এসে দ্রুত নির্বাচনের দাবি জোরদার করবেন তা ঈদের দিনে বিএনপির সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে লন্ডন থেকে ভার্চুয়ালি শুভেচ্ছা বিনিময় অনুষ্ঠানে দেওয়া তাঁর বক্তব্য থেকেই ইঙ্গিত পাওয়া যায়। তিনি দলের নেতাকর্মীদের উদ্দেশ করে বলেন, দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। সবাই মিলে ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
জানা যায়, খালেদা জিয়া দেশে ফিরে দ্রুত জাতীয় নির্বাচনের দাবিতে দলের সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের বিভিন্ন কর্মসূচি দিয়ে মাঠে সক্রিয় রাখবেন। সেইসঙ্গে আন্তর্জাতিক অঙ্গনের সহযোগিতা পেতে বিদেশী কূটনীতিকদের সঙ্গে বৈঠক করবেন।
বিএনপি সূত্র জানায়, খালেদা জিয়া কখন দেশে ফিরবেন সে জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন দলের সর্বস্তরের নেতাকর্মীরা। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দলটির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার দিকনির্দেশনা বড় বেশি প্রয়োজন বলে তারা মনে করছেন। শারীরিক অবস্থা ঠিক থাকলে এ মাসের যে কোনো সময় তিনি দেশে ফিরবেন। তখন দলীয় কর্মকা- আরও গতিশীল হবে।
সম্প্রতি বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সাংবাদিকদের জানান, দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া আগের চেয়ে ভালো আছেন। সম্ভবত মধ্য এপ্রিলে তিনি লন্ডন থেকে দেশে ফিরবেন।