ঢাকা, বাংলাদেশ   শুক্রবার ০৪ এপ্রিল ২০২৫, ২১ চৈত্র ১৪৩১

আগামী সপ্তাহ থেকে দেশব্যাপী কর্মসূচি

গণপরিষদ নির্বাচনসহ চার দাবিতে মাঠে নামছে এনসিপি

আবদুর রহিম

প্রকাশিত: ০১:০৩, ৪ এপ্রিল ২০২৫

গণপরিষদ নির্বাচনসহ চার দাবিতে মাঠে নামছে এনসিপি

এনসিপি

আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ, সংবিধান পুনর্লিখনে গণপরিষদ নির্বাচন, জুলাই বিপ্লবের ঘোষণাপত্র, দুই হাজার ছাত্র-জনতার হত্যা ও ৩১ হাজার মানুষকে আহতের বিচারে দাবিতে মাঠে নামছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। আগামী সপ্তাহ থেকে ঢাকাসহ সারাদেশে এই দাবি নিয়ে নতুন দলটি সোচ্চার হবে। সারাদেশে শহীদ পরিবার ও আহত যোদ্ধাদের নিয়ে দলটি কর্মসূচি পালন করবে। জাতীয় নির্বাচনের পূর্বেই সংবিধান পুনর্লিখনের জন্য গণপরিষদ নিশ্চিত করতে চায় তারা। প্রয়োজনে জাতীয় নির্বাচন এবং গণপরিষদ এক সঙ্গে চলবে বলেও দলটির ভাষ্য। 
এনসিপি নেতারা বলছেন, চব্বিশের যে গণ-অভ্যুত্থান হয়েছে, হাসিনা পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছেন। হাজার হাজার ছাত্র-জনতার রক্তের  বিনিময়ে কেবল সরকার পরিবর্তন নয়; বরং শাসনকাঠামো ও সাংবিধানিক পরিবর্তন করে নতুন একটি বাংলাদেশের যাত্রা শুরু করার জন্যই হয়েছে। প্রকৃত গণতন্ত্র, ইনসাফ ও সাম্য নিশ্চিতে সাংবিধানিক নিয়মের বাহিরে গিয়ে বিপ্লবীদের মতামত ও প্রধান বিচারপতির পরামর্শে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন হয়েছে। ইতোমধ্যে প্রধান উপদেষ্টা এ দেশের মানুষের আস্থা অর্জন করতে পেরেছেন।  
সংশ্লিষ্ট বিশেজ্ঞরা বলছেন, স্বাধীন বাংলাদেশে গণপরিষদ বিষয়টি কিন্তু নতুন নয়। মূলত সংবিধান রচনা করতে যে কমিটি গঠন করা হয় তাকে গণপরিষদ বলে। দেশের ৫৪ বছরের ইতিহাসে তা একবারই গঠিত হয়েছিল ১৯৭২ সালের ২৩ মার্চ। ১৯৭০ সালের প্রাদেশিক ও জাতীয় নির্বাচনে জয়ী প্রতিনিধিরা ছিলেন এর সদস্য। বর্তমানে গণপরিষদ ইস্যু নিয়ে আলোচনার সূত্রপাত ৫ আগস্টের পর সংবিধান পরিবর্তনের দাবি থেকেই শুরু হয়েছে।

রাজনৈতিক দলগুলোর বিভিন্ন মতামত থাকলেও অনেকে বলছেন গণপরিষদ ও জাতীয় নির্বাচন এক সঙ্গে হতে পারে। তবে জুলাই অভ্যত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া দলটি গণহত্যার দায়ে আওয়ামী লীগকে জাতীয় নির্বাচনের আগে নিষিদ্ধসহ হত্যকা-ের বিচার যাত্রা নিশ্চিতে অনড় অবস্থানে রয়েছে। আগামী সপ্তাহ থেকে দলটি বিশেষ চারটি দাবি নিয়ে সারাদেশে সিরিজ কর্মসূচি পালন করবে। দাবি নিশ্চিতের আগে দলটি নির্বাচনের পক্ষে মতামত দেবে না বলেও দলটির বড় অংশ জানিয়েছেন। 
জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) সদস্য সচিব আখতার হোসেন বলেছেন, গণপরিষদ ও জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) একক প্রার্থী দেবে। তিনি বলেন,  সংস্কার ও বিচার দৃশ্যমান করা, একই সঙ্গে গণপরিষদ নির্বাচনের যে বাস্তবতা আছে, সে ব্যাপারে সরকারকে কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে। সরকার যদি চাপে পড়ে সংস্কারবিহীনভাবেই দেশটিকে ছেড়ে দেয়, সেক্ষেত্রে অবশ্যই জনগণকে সঙ্গে নিয়ে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলা হবে।

অভ্যুত্থানের দালিলিক হিসেবে সরকারকে জুলাই ঘোষণাপত্র বাস্তবায়ন করতে।  যত দ্রুত সময়ের মধ্যে সম্ভব সরকারকে উদ্যোগী হয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্যের ভিত্তিতে জুলাই ঘোষণাপত্র জারি করতে হবে। একইসঙ্গে আমরা এটাও মনে করি যে, জুলাই ঘোষণাপত্রের একটা আইনি বাধ্যবাধকতার জায়গা থাকতে হবে। এটি নিছক কোনো ঐতিহাসিক দলিল নয়, বরং এর মধ্যে দিয়ে যেন একটা আইনি বাধ্যবাধকতার জায়গা তৈরি হয়।
এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন বলেন, আমরা ধরে নিতে পারি, এককভাবে গণপরিষদের ব্যাপারে বিএনপির আপত্তি নেই। গণপরিষদ ও সংসদ নির্বাচন একসঙ্গে করতে গেলে তাদের আপত্তি। সেটি প্রয়োজনে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান হবে। আমরা বলেছি, গণপরিষদ নির্বাচনে যারা জিতে আসবেন, সংবিধান প্রণয়নের পর তারাই আইনসভায় রূপান্তরিত হয়ে যাবেন। এটি হলে এখানে স্বল্প বা দীর্ঘমেয়াদি কোনো সমস্যাই হবে না। 
জুলাই অভ্যুত্থানের সংগঠক ডা. মাহমুদা মিতু বলেন, আগে বিচার, সংস্কার, গণপরিষদ নির্বাচন তারপর জাতীয় নির্বাচন দিতে হবে। সংবিধান পরিবর্তন না করে নির্বাচন নয়। দেশটাকে অগোছালো কাঠামো দিয়ে আর কোনো ফ্যাসিস্ট তৈরির কারখানা হিসেবে দেখতে চাই না। এ দেশে অন্যায় করলে অপরাধ করলে বিচার হয় এই দৃষ্টান্ত না স্থাপন করে সংসদ নির্বাচন দেখতে চাই না। এটা না হলে আবারও গুম খুনের রাজনীতি প্রতিষ্ঠিত হবে। 
এ নিয়ে এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, ছাত্ররা যখন এক দফায় সরকারের পতন, বাংলা ব্লকেড টানা কর্মসূচি দিয়েছে আমরা তখন জিজ্ঞেস করিনি তোমরা কারা। ছাত্ররা যখন সকল রাজনৈতিক দলকে রাস্তায় নামার আহ্বান করেছে, আমরাও নেমেছি, তারাও সবার সহযোগিতা চেয়েছেন। সবাইকে নিয়ে একটা গণ-অভ্যুত্থানের পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। এখন আমরা নানান প্রশ্ন করছি তারা কারা? বিএনপি কিন্তু প্রথমে বলেছিল ছাত্রদের সঙ্গে আমাদের সমর্থন নাই। তবে বিএনপি ভেতরে ভেতরে সহযোগিতা করেছিল। 
তিনি বলেন, আমাদের একটা গণপরিষদের পরিবেশ দরকার। কারণ সংবিধান পুনর্লিখন দরকার। এটা বিভিন্ন জায়গা থেকে প্রশ্ন এসেছে। কেউ বলছেন একটা নতুন সংবিধান দরকার, আবার কেউ বলছেন সংবিধান সংস্কার দরকার। আমাদের যে বিপ্লবটা হয়েছে সেখানে কোনো নিয়মতান্ত্রিক বা সাংবিধান নিয়ম অনুসরণ করে হয়নি। নিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতি হাসিনা ধ্বংস করে গিয়ে পালাতে বাধ্য হয়েছেন।

যে কারণে সংবিধান সংশোধনে গণভোট নেওয়া, সংবিধান সভার নির্বাচনের কথা আসছে। এখন এখানে বড় অংশের মতামত এসেছে সংসদ নির্বাচনের আগেই সংবিধান সংস্কার করা। জাতীয় নির্বাচন এবং গণভোট এক সঙ্গে করলে আমার কাছে এটার কোনো সমস্যা মনে হচ্ছে না। সবার ঐক্যমতের ভিত্তিতে গণপরিষদ আবশ্যক। 
এনসিসির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, গণপরিষদ নির্বাচন ও জাতীয় সংসদ নির্বাচন একসঙ্গে হতে পারে। এর মাধ্যমেই নতুন কাঠামো ও নতুন বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব হবে। গণপরিষদ নির্বাচনের মাধ্যমে একটি নতুন সংবিধান প্রকৃত গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় উত্তরণে সহায়তা করবে। নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘বিচারের পর সংস্কার কার্যক্রম করে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে দ্রুত জাতীয় সংলাপে গিয়ে আমাদের জুলাই সনদ ও জুলাই ঘোষণাপত্র বাস্তবায়ন আমরা দেখতে চাই।’

×