ঢাকা, বাংলাদেশ   শনিবার ০১ মার্চ ২০২৫, ১৬ ফাল্গুন ১৪৩১

নতুন রাজনৈতিক দল ‘জাতীয় নাগরিক পার্টি’র আত্মপ্রকাশ

বাংলাদেশে ভারতের দালালি চাই না, আ. লীগেরও দালালি চাই না

প্রকাশিত: ২৩:০৫, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৫

বাংলাদেশে ভারতের দালালি চাই না, আ. লীগেরও দালালি চাই না

ছবি : জনকণ্ঠ

নতুন রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মপ্রকাশ করেছে। শুক্রবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) বিকেল ৪টায় সংসদ ভবনের সামনে মানিক মিয়া এভিনিউয়ে একটি মঞ্চে দলের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়।

নতুন রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টির আত্মপ্রকাশ উপলক্ষে আমরা সাধারণ মানুষের প্রতিক্রিয়া জানতে চাই। কথা বলি বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষের সাথে। নতুন বাংলাদেশে তাদের চাওয়া-পাওয়া, তাদের আঙ্খাক্ষা এবং ভবিষ্যত বাংলাদেশে নতুন রাজনৈতিক দলের অবস্থান, বাংলাদেশকে তারা আগামীতে কেমন দেখতে চায়, তা জানতে চাওয়া হয়।

নতুন রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টির আত্মপ্রকাশ অনুষ্ঠানে আসা এক ব্যক্তি বলেন, “আমি আশা করব এই নতুন দল যে আসতেছে আজকে, যারা আত্মপ্রকাশ হবে, তারা ফ্যাসিবাদমুক্ত এবং হচ্ছে দলীয় রাজনীতিমুক্ত একটা সমাজ গঠন করবে। যেখানে আম-জনতা সেফলি থাকবে। যেখানে কোন আওয়ামী লীগের দালাল থাকবে না। যেখানে কোন দলীয় পক্ষ থাকবে না। সরকারি অফিসে সবাই নিউট্রালি কাজ করবে।

আপনারা তো সাংবাদিক, আপনারা তো ভালো করেই জানেন, যে প্রত্যেকটা সেক্টরেই দুর্নীতি হইতেছে, প্রচুর দুর্নীতি হইতেছে, এ টু জেড দুর্নীতি। সমন্বয়করাও ঠিকমত কাজ করতে পারে নাই। যার কারণে পদত্যাগ করতেছে একজন। এই জিনিসটা চাই না, সেইফ বাংলাদেশ চাই। আমি চাই, পুলিশ পুলিশের কাজ করুক। আর্মি আর্মিদের কাজ করুক। বিডিআর বর্ডার পাহারা দিক পারফেক্টলি। আর বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের দালালি চাই না, ইন্ডিয়ার দালালিও চাই না।”

আরেকজন বলেন, “যে স্পিড ছাত্রদের মধ্যে আমরা লক্ষ্য করেছি, এটা আসলে কোন দলের মধ্যে আমরা বিগত আমাদের জন্মের পর থেকে দেখিনি। সেই হিসাবে আমরা মনে করি যে, নতুন যে ছাত্র রাজনৈতিক দল গঠন হচ্ছে, আমাদের চাওয়া-পাওয়া তাদের কাছে, নতুন বাংলাদেশকে নিয়ে নতুন ছাত্রদের কথা বলবে। নতুন মানুষের কথা বলবে এবং আপামর জনতার কথা বলবে। সেখানে কোন বিদেশীদের শিখিয়ে দেওয়া বুলি তারা বলবে না।”

সামরিক বাহিনী থেকে অবসরপ্রাপ্ত একজন বলেন, “আমাদের প্রত্যাশা মূলত এটাই যে রাজনৈতিক দলের বিগত দিনে আমরা দেখেছি, ভেরি ব্যাড। আমাদের যে অভিজ্ঞতা, খুব ভালো না এবং অতিষ্ট। সত্যি কথা বলতে বাংলাদেশের একজন নাগরিক হিসেবে ৫০ প্লাস আমার বয়স চলে, আমি একজন সামরিক বাহিনী থেকে অবসরপ্রাপ্ত একজন কর্মকর্তা, এতদিনের ভিতরে আমি রিটায়ারমেন্টে আসছি ১৫ বছর প্লাস। বাট আমি এখনো ভোট দিতে পারি নাই। বাংলাদেশের যে একজন সিটিজেন, এটাই আমি প্রমাণ করতে পারি নাই। কারণ এই দেশে সুষ্ঠ কোন নির্বাচন হয় নাই। ভোট দেওয়ার মত কোন পরিস্থিতি ছিল না। এবং গতানুগতিক যেই রাজনৈতিক হানাহানি মারামারি লগি-বৈঠা মারামারি, এগুলো আমরা চাই না। আমরা চাচ্ছি আসলে, এই যে আধুনিক যুগ, এখন যুগ পাল্টাইছে, আসলে ওই মানধাত্তার আমলে রাজনীতি, এখন চলবে না দেশে।

সেই হিসাবে এই জাতি, তাদের ২৪ এর আন্দোলনে যেরকম আমরা তাদের উপরে ভরসা রাখছি এবং এখনো আমরা রাখছি, আমরা আশা করছি, তাদের দ্বারা আগামী দিনে ভালো কিছু হবে এবং ভালো কিছু হবে বিধায়, আমরা নিজেরা ২৪ এর আন্দোলনে নিজেরা সম্পূর্ণভাবে, নিজের শারীরিক, মানসিক সবকিছু দিয়ে তাদের সাথে ছিলাম, এখনো আছি, ইনশাল্লাহ ভবিষ্যতেও থাকবো। আশা করি, আগামীতে এই দলের সাথে দিক-নির্দেশনামূলক যেকোনো ধরনেরই তারা সাহায্য চাবে, আমরা করতে প্রস্তুত এবং করব ইনশাল্লাহ।”

অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করতে আসা অন্য ব্যক্তি বলেন, “দল গঠন হওয়ার আগে, আমরা সারাদেশেই অনলাইনে এবং অফলাইনে ক্যাম্পেইন করেছি। সাধারণ মানুষের কথা আমরা নিয়ে এসেছি। তারা যে দাবি-দাওয়া দিয়েছে, সে অনুসারে আমাদের নতুন দলের কাছে প্রত্যাশা, এদেশের মানুষ ৫৩ বছরে যে ঐক্যমতে পৌঁছাতে পারি নাই, আমরা জাতীয় ঐক্যমতে পৌঁছাতে চাই সকল বিষয় এবং বাংলাদেশপন্থা একটি রাজনৈতিক দল গঠন করতে চাই এবং মানুষকে নাগরিক মর্যাদা দিতে চাই এবং এ কারণে আমাদের দলের নাম ‘জাতীয় নাগরিক পার্টি’ এবং সেই দলের কাছে আমাদের সকল আপামর জনসাধারণের এবং দলিত শ্রেণী থেকে শুরু করে  প’শ শ্রেণী পর্যন্ত সবাই যাতে এই দলের কাছে একটি একটি বার্তা পায়, সেটি হচ্ছে তরুণদের এই রাজনৈতিক দলে সকল মানুষ এর মর্যাদা থাকবে সমান এবং একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য আমাদের যে উদ্যোগ, সে উদ্যোগে সবাই শামিল হবে, এটাই হচ্ছে আমাদের নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত এবং নতুন রাজনৈতিক দলের কাছে প্রত্যাশা।”

নতুন দলের কাছে প্রত্যাশা নিয়ে আরেকজন বলেন, “মানুষ যেটা চায়, সেটা হচ্ছে যে সাম্য এবং বৈষম্যবিহীন এবং একজন নাগরিক সে তার নাগরিক পরিচয়ে যাতে সমাজে বসবাস করতে পারে, কোন ধরনের রাজনৈতিক পরিচয়ে যাতে তার নাগরিক অধিকারটুকু হরণ না হয়।”

সর্বশেষ, আরেকজন তরুণের কাছে নতুন দলের প্রত্যাশা নিয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আমি মূলত সাভার থেকে আসছি, আমি ভোর ৬:৩০ মিনিটে বের হয়েছি। বিশেষ করে, আমি পায়ে হেঁটে এসেছি। আমার এই ব্যানারটা নিয়ে এটা আমার দ্বিতীয়বারের মতো এই সংসদ ভবনে আসা। কারণ প্রথম আমি আগস্টের পাঁচ তারিখে, যখন চার তারিখে ঘোষণা হলো যে, আগামীকালকে আসা হবে, সবাই তখন একটা ট্রেন্ডিং চলতেছে অনলাইন মিডিয়ায় যে, আলিফ যদি মক্কায় পায়ে হেঁটে যেতে পারে, আমরা আসতেছিলাম, পাশাপাশি অনেক ব্রেরিকেড ছিল। পুলিশ, সেনাবাহিনী অনেক কিছু ছিল। আমরা অলিগলি দিয়ে ভ্যান গাড়ি এবং নৌকায় করে এসছিলাম। তখন আমি গাড়ি ব্যবহার করি, আজকেই আমি প্রথম কোন গাড়ি ব্যবহার করি নাই। ৩০ কি. মি. পর পায়ে হেঁটে এসছি। আসার মাঝে আমি অনেকের সাথে কথা বলছি, অনেকে উদ্যোগী হয়ে আমার সাথে জানতে চেয়েছে, ঠিক আছে কোথায় যাচ্ছেন! এই নতুন নাগরিক পার্টি কি, কিভাবে? উনাদের সাথে আমি কথা বলে আমি বুঝতে পারলাম যে, উনারা বলতেছে আমাদের সাথেই অনেক আগে থেকে আসছে। কিভাবে আসছে! উনারা বলে আমরা সকল অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে, একমাত্র আপনাদের এই প্লাটফর্ম। পাশাপাশি আমার ব্যক্তিগত থেকে, আমি অনেকগুলো ক্যাম্পাস অতিক্রম করেছি।

আমি এখন পর্যন্ত কোন রাজনৈতিক দলে অংশগ্রহণ করি নাই। আজকেই প্রথম, আমি যেটা এই রাজনৈতিক দলে অংশগ্রহণ করব। এবং এই রাজনৈতিক দলটাও আজকেই আত্মপ্রকাশ হচ্ছে, একদিন আমি থাকবো না, এই রাজনৈতিক দলটা থাকবে। এই দলের থেকে চাওয়া, প্রথমত অন্যায়-অবিচার এবং আমাদের যারা যুবসমাজ ছিলাম, যারা আন্দোলনের ভূমিকা দিয়েছি, প্রত্যেকের যাতে কর্মসংস্থান অথবা চাকরি হয়।”

উল্লেখ্য, নতুন রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টির আত্মপ্রকাশ অনুষ্ঠানে বিএনপি, জামায়াতসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের আমন্ত্রিত নেতারা উপস্থিত ছিলেন। এর মধ্যে ছিলেন জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না, গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি, হেফাজতে ইসলামের নায়েবে আমির আহমেদ আলী কাসেমী, বিকল্পধারার নেতা মেজর (অব.) আব্দুল মান্নান, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব মাওলানা জালালুদ্দীন আহমেদ, লেবার পার্টির একাংশের চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, ইসলামী ঐক্য জোটের সহসভাপতি জসিম উদ্দিন, বিএলডিপির চেয়ারম্যান শাহাদাত হোসেন সেলিম এবং বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব আহমেদ আবদুল কাদের।

নতুন দলের অন্যতম নেতা আব্দুল হান্নান মাসুদ, নুসরাত তাবাসসুম ও আরিফুল ইসলাম আদীব বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় দলের প্রধান উপদেষ্টার কাছেও আমন্ত্রণপত্র পৌঁছে দেন।

এ প্রসঙ্গে হান্নান মাসুদ জানান, “আমরা শহীদ পরিবার, আহত ব্যক্তিদের পাশাপাশি উপদেষ্টাদের আমন্ত্রণ জানিয়েছি। ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে আমাদের সঙ্গে থাকা রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা, বিদেশি বন্ধু ও কূটনীতিকদেরও আমন্ত্রণ করেছি।”

‘নতুন দলের নেতৃত্ব’

জাতীয় নাগরিক পার্টির মুখপাত্র সামান্তা শারমিন জানান, দলের আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন মো. নাহিদ ইসলাম, যিনি সম্প্রতি অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ থেকে পদত্যাগ করেছেন।

দলের সদস্যসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন আখতার হোসেন, যিনি জাতীয় নাগরিক কমিটির সদস্যসচিব ছিলেন।

অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে রয়েছেন:

জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক: সামান্তা শারমিন ও আরিফুল ইসলাম আদীব, জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্যসচিব: তাসনিম জারা ও নাহিদা সারওয়ার (নিভা), প্রধান সমন্বয়কারী: নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, যুগ্ম সমন্বয়ক: আব্দুল হান্নান মাসুদ, মুখ্য সংগঠক (দক্ষিণাঞ্চল): হাসনাত আবদুল্লাহ, মুখ্য সংগঠক (উত্তরাঞ্চল): সারজিস আলম।

বিশ্লেষকদের মত, জাতীয় নাগরিক পার্টির আত্মপ্রকাশের মধ্য দিয়ে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন একটি শক্তির সংযোজন হলো।

 

সূত্র:  https://www.youtube.com/watch?v=HfXek4t_NOg

মো. মহিউদ্দিন

×