
নাহিদ, আখতার, সারজিস ও হাসনাত
দুই হাজার চব্বিশ সালের ৩৬ জুলাই শেখ হাসিনার স্বৈরাচারী সরকারের গুলিতে নিহত দুই হাজার শহীদ পরিবার এবং ৩১ হাজার আহত যোদ্ধার রক্তভেজা বিজয়ের চেতনা নিয়ে আজ আত্মপ্রকাশ ঘটবে ছাত্র-জনতার নতুন রাজনৈতিক দল। রাজধানীর মানিক মিয়া এভিনিউয়ে জাতীয় সংসদের সামনে বিকেল তিনটায় নতুন এই রাজনৈতিক শক্তির সূচনা হবে।
নতুন দল ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে তৈরি হয়েছে নানা কৌতূহল ও সমীকরণ। নতুন এই রাজনৈতিক দলের নাম রাখা হচ্ছে ‘জাতীয় নাগরিক পার্টি’। ইতোমধ্যে তিনটি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা পদ ছেড়ে জনতার কাতারে দাঁড়িয়েছেন চব্বিশের এক দফার ঘোষক নাহিদ ইসলাম। তিনি এ দলটির আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব নিচ্ছেন।
দলটির সদস্য সচিব হচ্ছেন নাগরিক কমিটির সদস্য সচিব আখতার হোসেন। মুখ্য সমন্বয়ক হচ্ছেন নাসিরুদ্দীন পাটওয়ারী। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আহ্বায়ক হাসনাত আবদুল্লাহ হচ্ছেন দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক এবং উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হচ্ছেন সারজিস আলম।
বুধবার পর্যন্ত ১৫১ সদস্যের কমিটি গঠন করার খসড়া থাকলেও ওইদিন ছাত্রদের দল গঠনের পর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আন্দোলন, ক্ষোভে বিশৃঙ্খল পরিবেশ তৈরি হওয়ায় এখন মূল দলে সন্তোষের কমিটির জন্য আরও ২০ সদস্য বাড়িয়ে ১৭১ করা হচ্ছে।
এছাড়া কোর কমিটি গঠন হবে ২৪-৩০ জন নিয়ে। শহীদ এবং আহত পরিবারকে সামনে রেখে ৩৬ দফা ইশতেহার ঘোষণা দেওয়া হবে। সারাদেশ থেকে দুই থেকে আড়াই লাখ মানুষ উপস্থিতির টার্গেট নেওয়া হয়েছে। দল গঠনের প্রথম যাত্রায় শহীদ পরিবারের চাওয়া চাহিদায় জুলাই গণহত্যার বিচারের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হবে। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধসহ যারা দুই হাজার মানুষকে খুন করেছেন তাদের ফাঁসি নিশ্চিতের জন্য বড় কর্মসূচির বার্তা দেওয়া হবে। কমিটি গঠনের পর পর চমকপ্রদ কয়েকটি কর্মসূচি দেওয়া হবে।
নাহিদ, আখতার, সারজিস এবং হাসনাত ছাড়াও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদ চূড়ান্ত করা হয়েছে। যাদের মধ্যে রয়েছেন আব্দুল হান্নান মাসুদ, আরিফুল ইসলাম আদীব, আবু সাঈদ লিয়ন, ডা. তাসনিম জারা, আব্দুল্লাহ আল আমিন অনিক রায়, অলিক মৃ প্রমুখ।
নতুন দলটি মধ্যপন্থি আদর্শ ধারণ করবে এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পরিচালিত হবে। এই দলের প্রতিষ্ঠা হবে জুলাই আন্দোলনের চেতনায় এবং দলের নাম এবং প্রতীক নির্ধারণ করা হয়েছে এই আন্দোলনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে। দলের মূল আদর্শ হবে মধ্যপন্থি; যেখানে নাগরিক, গণতান্ত্রিক এবং বিপ্লবী শব্দগুলো প্রাধান্য পাবে। ধর্ম, জাতি, গোষ্ঠী সবার উপস্থিতি নিশ্চিত করা হবে।
এদিকে নতুন দলের ঘোষণাকে কেন্দ্র করে চলছে নানা প্রস্তুতি। বৃহস্পতিবার সরেজমিনে দেখা যায়, সকাল থেকেই মানিক মিয়া এভিনিউতে স্টেজ নির্মাণের কাজ চলছে। পাশাপাশি ওয়াশরুম ও বিভিন্ন বুথ নির্মাণেরও কাজ চলছে। সন্ধ্যায় কাজের গতি আরও বাড়ে বলেও জানান আয়োজকরা।
জানা গেছে, ছাত্রদের এই জমায়েতে মেডিক্যাল টিম, ওয়াশরুম, পুলিশ বুথ, পানির ব্যবস্থা থাকবে। একই সঙ্গে ব্যাকস্টেজে মেয়েদের জন্য অন্য বুথের ব্যবস্থা থাকবে। পাশাপাশি ভিআইপিদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা থাকবে। নতুন এই রাজনৈতিক দলের আত্মপ্রকাশ অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন জুলাই আন্দোলনে আহত ও নিহত পরিবারের সদস্যরা। এছাড়া বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারাও থাকবেন। পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকদেরও যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে।
নতুন রাজনৈতিক দলে যুক্ত ছাত্রনেতারা বলছেন, নতুন রাজনৈতিক দলটির প্রধান টার্গেট থাকবে তরুণ ভোটার, যারা বিগত ১৬ বছর শেখ হাসিনার শাসনামলে ভোট দিতে পারেননি। দল ঘোষণার দিন দুই হাজার শহীদ পরিবার এবং ৩১ হাজার আহত ব্যক্তির চাওয়া চাহিদা অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। শহীদ পরিবারকে সামনে রেখেই শপথ অনুষ্ঠান হবে।
এবং সেখানে দুই হাজার শহীদের খুনিদের বিচারের প্রতিশ্রুতি থাকবে নতুন দলটির অন্যতম এজেন্ডা। ছাত্র নেতৃত্বদ্বয় বলছেন, নতুন রাজনৈতিক দল গঠন হলেও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন এবং জাতীয় নাগরিক কমিটি অরাজনৈতিক সংগঠন হিসেবেই থাকবে। এই প্ল্যাটফর্ম স্ব অবস্থায় থাকবে। যে প্ল্যাটফর্ম থেকে হাসিনা সরকারের পতন হয়েছে। এই প্ল্যাটফর্ম প্রেসার গ্রুপ হিসেবে কাজ করবে। একই সঙ্গে চব্বিশের ছাত্র-জনতার সকল হত্যার বিচার বাস্তবায়ন পর্যন্ত এটি কাজ করবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক নাজমুল হাসান জনকণ্ঠকে বলেছেন, জুলাই আন্দোলনের চেতনা নিয়ে যে নতুন রাজনৈতিক দল ঘোষণা হবে, সেখানে অবশ্যই তারুণ্য শক্তি অগ্রাধিকার পাবে। যাদের ভূমিকায় হাসিনা দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছে। আপনারা জানেন, দীর্ঘ যুগ ধরে বাংলাদেশে দুইটা দলের কাছে তরুণদের স্বপ্ন বাস্তবায়ন হয়নি।
তরুণদের আশা-আকাক্সক্ষ্যা বাস্তবায়ন হয়নি। যার ফলে ২৪- এর গণঅভ্যুত্থান সৃষ্টি হয়েছে। দুই হাজার মানুষ জীবন দিয়েছে। আমরা আশা রাখব, যারাই নতুন দলে নেতৃত্বে আসবেন, তাদের প্রধান কাজ যেন হয় চব্বিশের গণহত্যার বিচার নিশ্চিত করা। চব্বিশের আন্দোলনে যারা সম্পৃক্ত ছিল তাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য সিনথিয়া জাহিন আয়েশা জনকণ্ঠকে বলেন, চব্বিশের আন্দোলনে নারীদের ভূমিকা অনেক বেশি ছিল। তাদের যেন নতুন রাজনৈতিক দলে অগ্রাধিকার দেওয়া হয় এমন প্রত্যাশা থাকল। তারুণ্য শক্তির নতুন রাজনৈতিক দলটি সব জনপ্রত্যাশা পূরণ করবে আশা রাখছি।
নাগরিক কমিটির যুগ্ম আহবায়ক আরিফুল ইসলাম আদিব জনকণ্ঠকে বলেছেন, আমাদের সবারই প্রত্যাশা অনুযায়ী নাহিদ ভাই ইতোমধ্যে পদত্যাগ করেছেন। তিনি রাজনৈতিক দলের আহ্বায়ক হোক, এটা সবারই চাওয়া। পাশাপাশি সদস্য সচিব হিসেবে আখতার হোসেন ভাই সবারই পছন্দের।
নাছির উদ্দিন পাটওয়ারী, সারজিস ভাই, হাসনাত ভাইসহ অনেকেই আলোচনায় রয়েছেন। তবে বিষয়গুলো এখনো আলোচনার মধ্যে রয়েছে। যারা ’২৪-এর আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছেন সবারই মতামত নেওয়া হচ্ছে, অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। সবাইকে নিয়ে দল ঘোষণা করা হবে।
জাতীয় নাগরিক কমিটির সদস্য আব্দুল্লাহ আল মনসুর জনকণ্ঠকে বলেছেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনা নিয়ে নতুন রাজনৈতিক দলের যাত্রা শুরু হবে। সব শ্রেণি-পেশার মানুষ দলে থাকবেন। নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত করাই থাকবে দলের টার্গেট। একই সঙ্গে চব্বিশের খুনিদের বিচার নিশ্চিতে ভূমিকা পালন করা।