ঢাকা, বাংলাদেশ   রোববার ০৬ এপ্রিল ২০২৫, ২৩ চৈত্র ১৪৩১

অনলাইনে শুভেচ্ছা বিনিময়

ড. এম. মেসবাহউদ্দিন সরকার

প্রকাশিত: ২০:৫৭, ৫ এপ্রিল ২০২৫

অনলাইনে শুভেচ্ছা বিনিময়

অনলাইনে শুভেচ্ছা বিনিময়

বাস্তব (Real, Actual) জগতের অনুভব, স্বাদ, সাধ্য, স্থায়িত্ব, বিস্তৃতি, আশা-নিরাশা, উপযোগিতা, কার্যকারিতা এবং প্রতিক্রিয়াসহ কাক্সিক্ষত বিষয় যেখানে শেষ সেখান থেকে এসব বিষয়কে আদিম বা সনাতন (Primitive) বাস্তবতার চেয়ে অধিক উপযোগিতা, প্রয়োজনীয়তা ও গ্রাহ্যতায় প্রত্যাশিত সুবিধামতো পাওয়া কিংবা উপভোগ করার নামই হলো ভার্চুয়াল (virtual) জগৎ। অর্থাৎ বাস্তব জগতের চেয়ে অধিক বাস্তব হচ্ছে  ভার্চুয়াল জগৎ। বাস্তব হচ্ছে ক্ষণস্থায়ী স্বপ্ন, ঠুনকো এবং অকার্যকর।

আর ভার্চুয়াল হচ্ছে দীর্ঘস্থায়ী ও কার্যকর এবং নিশ্চিত। প্রযুক্তির উৎকর্ষে ভার্চুয়াল ধারণাটি বর্তমানে এক অভাবনীয় সাফল্য হিসেবে দাঁড়িয়েছে, যা বাস্তবতার চেয়ে অধিক স্থায়ী, ক্রিয়াশীল এবং সুদূরপ্রসারী। তবে ভার্চুয়াল জগতের এই সাফল্য এসেছে বাস্তবতার হিসাব কষেই। বাস্তব হচ্ছে গোনার জন্য হাতের আঙুল। আর ভার্চুয়াল হচ্ছে ক্যালকুটের বা কম্পিউটার। অ্যাকচুয়াল হচ্ছে ঠ্যালাগাড়ি। আর ভার্চুয়াল হচ্ছে রকেট।

এরকম হাজারো উদাহরণ আছে অ্যাকচুয়াল এবং ভার্চুয়ালের। আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির যত ধরনের আবিষ্কার রয়েছে তার মধ্যে ভার্চুয়ালিটি অন্যতম। আসলে বাস্তব নয়, তবে বাস্তবের মতো পরিবেশ ও অনুভূতি সৃষ্টি করতে পারার প্রযুক্তিই হলো ভার্চুয়ালিটি। সারাবিশ্বের মতো বাংলাদেশেও ধীরে ধীরে এ ভার্চুয়ালিটির জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পাচ্ছে।

চলচ্চিত্রের অঙ্গনে বিভিন্নরকম সিনেমা তৈরিতে এবং বিজ্ঞানভিত্তিক (সাইন্স ফিকশন) অ্যাডভেঞ্চার কাহিনীকে বাস্তবের মতো রূপ দিতে এই ভার্চুয়ালিটির জুড়ি নেই। শিশুদের নানারকম খেলা তৈরিতে ভার্চুয়াল রিয়েলিটির মারাত্মক পারফরমেন্স এখন বিশ্বব্যাপী সমাদৃত। 
ভার্চুয়াল প্রযুক্তির এই ছোঁয়া এখন লেগেছে ঈদ বার্তায়ও। প্রযুক্তির কারণে গোটা বিশ্ব এখন হাতের মুঠোয়। তাই দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে থাকা বন্ধু-বান্ধব কিংবা আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে ভার্চুয়াল ঈদ সমাবেশ করতে দেখা যাচ্ছে। পরস্পরের সঙ্গে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময়, ঈদের নতুন পোশাক দেখানো এবং ভার্চুয়ালি একসঙ্গে বসে ঈদের সুস্বাদু খাবার উপভোগ করার অপরূপ দৃশ্য শেয়ার করার সুযোগ করে দিয়েছে এই ভার্চুয়াল প্রযুক্তি।

ভার্চুয়াল ঈদের এই দৃশ্য অনেকটা অ্যাকচুয়াল ঈদের মতোই। এর মাত্রা যেন আরও পূর্ণতা পেয়েছে ভার্চুয়াল ঈদ কার্ডের মাধ্যমে। অ্যাকচুয়াল ঈদ কার্ডের বদলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভার্চুয়াল শুভেচ্ছা কার্ড পাঠানোকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে বর্তমান প্রজন্ম। অথচ এক সময় ঈদ কার্ডের দোকানগুলো স্কুল, কলেজগামী শিক্ষার্থীদের পদচারণায় ছিল ব্যস্ত। দোকানগুলোতে টাঙ্গানো থাকত রং-বেরঙের নকশা করা কার্ড।

চাঁদ, তারা, মসজিদ, কাবাঘর, কার্টুন, তারকাদের ছবির মাঝে লেখা থাকত ঈদ শুভেচ্ছা। নতুন প্রজন্ম লাইন দিয়ে কিনত ‘ঈদ কার্ড’। সমবয়সী শিক্ষার্থীরা অপেক্ষায় থাকতো কখন আসবে তার বন্ধুর কাছ থেকে ‘ঈদ কার্ড’। ছোটরা বায়না ধরে বাড়ি থেকে নিত বাড়তি টাকা। কে কতজনের কাছ থেকে ঈদ কার্ড পেল বা না পেল- এগুলো নিয়ে চলত নানা হিসাব ও মান-অভিমান। সম্ভবত নব্বই দশক পর্যন্ত ছিল ‘ঈদ কার্ড’ আদান-প্রদানের সবচেয়ে জমজমাট সময়।

ঈদের জামাকাপড় কেনার সঙ্গে ‘ঈদ কার্ড’ কেনাও ছিল তখন অন্যতম অনুষঙ্গ। প্রিয়জন, বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়স্বজন ও ছোটদের মাঝে ‘ঈদ কার্ড’ বিতরণ করা ছিল এক বিশেষ সংস্কৃতি। দোকানগুলোতে শেষ হয়ে যেত ‘ঈদ কার্ড’, ফুরাত না চাহিদার ভিড়। তাই অনেকে রাত জেগে বন্ধুর জন্য হাতে বানাত রঙিন ‘ঈদ কার্ড’, সেখানে থাকত বাঁকা চাঁদের ছবি, থাকত শিশুদের কোলাকুলির দৃশ্য ইত্যাদি।
কিন্তু সেই ‘ঈদ কার্ড’ আজ চলে গেছে স্মৃতির আর্কাইভে। নতুন প্রজন্ম জানে না ঈদ কার্ডে শুভেচ্ছা বিনিময়ের কথা। প্রযুক্তির দাপটে হারিয়ে গেছে সেই ঐতিহ্য। আজ বন্ধু কিংবা কাছের মানুষ থেকে ঈদের শুভেচ্ছা মেলে হোয়াটসঅ্যাপ, ইমো, টুইটার, ইমেল, ফেসবুক, ই-কার্ড, লিংকড ইন, ম্যাসেঞ্জার, ভাইবার, স্নাপচ্যাট, জি-প্লাস, ইনস্ট্রাগ্রাম এসএমএস আর এমএমএসে। যাকে বলে ভার্চুয়াল জগতের ভার্চুয়াল শুভেচ্ছা।

দেখতে বাস্তবের মতোই রঙিন ও চমৎকার হলেও ঈদ কার্ডের আনন্দের মতো এতে নেই সেই আবেগ, অনুভূতি ও ভালোবাসা। অন্তত তিন কোটি মানুষ এবার এসএমএসের মাধ্যমে ঈদের শুভেচ্ছা আদান-প্রদান করেছে। টাকার অংকে যা আড়াই কোটি টাকার বেশি। শুধু তাই না, ঈদের সালামিও হয়ে গেছে আজ ক্যাশলেস বা মোবাইল ব্যাংকিংয়ে। আগে চকচকে নতুন নোট সংগ্রহ করে ঈদের দিন তুলে দেওয়া হতো পরিবারের ছোট সদস্যের হাতে ঈদ সালামি হিসেবে, আজ সেই সালামির কাজটি হচ্ছে মুঠোফোনে।

বিকাশ, নগদের মতো প্ল্যাটফর্ম থেকে সবাইকে এক সঙ্গে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে সালামি। এমনকি ঈদের নামাজ শেষে প্রতিবেশী বা স্বজনদের বাড়ি বেড়াতে যাওয়ার যে রেওয়াজ ছিল সেটাও রূপ নিয়েছে ভিডিও কলে। অর্থাৎ এ যেন অ্যাকচুয়াল থেকে ভার্চুয়াল ঈদের ডিজিটাল সংস্কৃতি। এমনি করে জাকাত ও ফিতরার হাজার-কোটি টাকা আদান-প্রদান হচ্ছে অনলাইন ব্যাংকিং, বিকাশ কিংবা নগদে। এসব প্রত্যাশিরাও নতুন চকচকে অ্যাকচুয়াল টাকার পরিবর্তে ভার্চুয়াল টাকা পাওয়ার আশায় বিকাশ ও নগদ অ্যাকাউন্ট খুলে বসে থাকে।

প্রত্যাশিত টাকা পেতে দেরি হলে সরাসরি অ্যাকচুয়ালি দেখা করার পরিবর্তে ভার্চুয়ালি ফোন করেই স্মরণ করিয়ে দেয়। তবে এখনো মসজিদের সামনে বসা ফকির-মিসকিনকে সাহায্য করা হচ্ছে অ্যাকচুয়ালি, অর্থাৎ সরাসরি টাকা-পয়সা দিয়ে। ভবিষ্যতে এমনটি থাকবে বলে মনে হচ্ছে না। কারণ আজকাল ফকির-মিসকিন ঘরের দরজায় নক করে অ্যাকচুয়ালি ভিক্ষা না করে মাইকে অডিও বাজিয়ে অনেকটা সেমি-ভার্চুয়ালি ভিক্ষা করে।
ভার্চুয়াল জগতের অনেক উপকারিতা থাকলেও এর অপসংস্কৃতি কম নয়। অনলাইন শপিংয়ে প্রতারণার বিষয়টি কম-বেশি প্রায় সকলেরই জানা। ভুয়া আইডি খুলে ফেসবুকে বন্ধুত্বের জের ধরে কত অঘটন ঘটছে প্রতিনিয়ত। মাধ্যমটিতে বয়স, ধর্ম, জাত, সাদা-কালো নিয়ে চলে অনেক লুকোচুরি। নানা প্রলোভন দেখিয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হ্যাকিং করা বিশ্বব্যাপী আজ একটি মারাত্মক সাইবার ক্রাইম। ভার্চুয়াল কার্ড বিতরণেও এর প্রভাব পড়ছে নিঃসন্দেহে।

তবে ঈদের মতো পবিত্র ও পরম আনন্দের বিষয় ভার্চুয়ালি হওয়ার ফলে সত্যিকারের আনন্দ পাওয়া যায় না। ভার্চুয়ালি যতই গল্প-আড্ডা করা যাক না কেন হ্যান্ডসেক, কোলাকুলি কিংবা ছোটদের মাথায় হাত বুলিয়ে আদর কিংবা গালে চুমু খাওয়ার পরিতৃপ্তি কি ভার্চুয়ালি পাওয়া যায়? আগে গ্রামে ও মহল্লায় ঈদের সময় ছোটখাটো পিকনিক, ঘুড়ি ওড়ানো, ক্রিকেট বা ফুটবল খেলা, নৌকাবাইচসহ কত সংস্কৃতির চর্চা হতো।

এসব আয়োজনকে কেন্দ্র করে বন্ধু-বান্ধব ও এলাকাবাসীর মধ্যে হতো সুখ-দুঃখ ও ভাবের আদান-প্রদান। আজ সেগুলো শুধুই ইতিহাস। ঘরের কোণে টিভির সামনে বসে এসব ভার্চুয়াল বিনোদনে কোনো তৃপ্তি নেই। ভার্চুয়াল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে মানুষ কানেক্ট হতে পারলেও কেন যেন একা ও নিঃসঙ্গ। 
তাই বর্তমান প্রজন্মের কিশোর-কিশোরী বা তরুণরা ই-বার্তার শুভেচ্ছায় আনন্দ পেলেও যারা ঈদ কার্ডের যুগ পার করেছেন তাদের কাছে এখনকার ডিজিটাল যুগের ই-শুভেচ্ছাবার্তা কোনোভাবেই আনন্দময় হয় না। ছাপা কার্ড বিতরণে পরস্পরের মধ্যে যেমনি কুশল বিনিময় হয়, হৃদ্যতা বাড়ে, ডিজিটাল মাধ্যমে সেটা নেই বললেই চলে। তাই বলতে হয় ডিজিটাল প্রযুক্তির উৎকর্ষে আমাদের অনেক কিছুই বিলীন হয়ে যাচ্ছে।

অনলাইনে সামাজিক মাধ্যমে শুভেচ্ছা বিনিময় পোস্ট করলে দেখা যাচ্ছে হাজার হাজার মানুষের কাছে চলে যাচ্ছে অনায়াসে। প্রযুক্তির এই উৎকর্ষতা এখানেই শেষ নয়। বর্তমান সময়ের সবচেয়ে আলোচিত আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে আপনি চাইলে বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গে কোলাকুলি, হ্যান্ডসেট বা কুশল বিনিময়ের ছবিও তৈরি করতে পারবেন।

এমনকি সেই ৪০, ৫০ বা ১০০ বছরের পুরানো গ্রামের ঈদ জামাতের ছবিও প্রকাশ করতে পারবেন। কিভাবে আপনার মা এবং দাদি নিজ হাতে  সেমাই তৈরি ও রান্না করেছেন তাও প্রকাশ করতে পারবেন। ভার্চুয়াল প্ল্যাটফর্মের কল্যাণে এত এত সুবিধা থাকলেও নেই সেই আবেগ, অনুভূতি এবং পরম আনন্দ।
লেখক : অধ্যাপক, তথ্যপ্রযুক্তিবিদ, আইআইটি, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

×