ঢাকা, বাংলাদেশ   রোববার ০৬ এপ্রিল ২০২৫, ২৩ চৈত্র ১৪৩১

বাংলাদেশের কূটনৈতিক সাফল্য

ড. এসএম জাহাঙ্গীর আলম

প্রকাশিত: ২০:৪৮, ৫ এপ্রিল ২০২৫

বাংলাদেশের কূটনৈতিক সাফল্য

ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও শি জিনপিংয়

বর্তমান বিশ্বে দশজন সম্মানিত ব্যক্তির মধ্যে অন্যতম হলেন শান্তিতে নোবেলজয়ী প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তাঁর মেধা, প্রজ্ঞা, জ্ঞান ও দূরদর্শী চিন্তভাবনা অতুলনীয়। বিশ্বের বহু দেশ তাঁর চিন্তা-ভাবনাকে কাজে লাগিয়েছে এবং লাগাচ্ছে। মতাদর্শের ঊর্ধ্বে থেকে বিশ্ব নেতৃবৃন্দ তাঁকে সম্মানের চোখে দেখেন। এ দৃশ্যটা দেখা গেল চীন সফরকে কেন্দ্র করে।

তাকে চীন সরকার সে দেশ সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন আর সেটা ছিল ভিন্নরূপে। তাঁর সম্মানে চীন সরকার বিশেষ বিমান পাঠিয়েছিলেন। তিনি চীনে পৌঁছার পর সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মান জানানো হয়। ড. ইউনূস চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকসহ ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃবৃন্দসহ রাষ্ট্রের ঊর্ধ্বতন ব্যক্তিদের সঙ্গে বৈঠক করেন। তিনি চীনের শীর্ষ ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দের সঙ্গেও বৈঠকে মিলিত হন।

ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে চীনের বেজিং বিশ্ববিদ্যালয় সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি প্রদান করেন। গত ২৯ মার্চ এক বিশেষ অনুষ্ঠানে ক্ষুদ্রঋণ ও দারিদ্র্য বিমোচনে বৈশ্বিক নেতৃত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে তাঁর হাতে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি তুলে দেওয়া হয়।
বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতার বিষয়ে একটি চুক্তি এবং আটটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। প্রধান উপদেষ্টার চারদিনের চীন সফরে ২৮ মার্চ তৃতীয় দিনে দুদেশের মধ্যে এই দ্বিপক্ষীয় চুক্তি ও স্মারকগুলো স্বাক্ষরিত হয়। চীন সরকার এবং সে দেশের বেসরকারি কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে ২ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার ঋণ এবং অনুদানের চুক্তি সম্পন্ন করেছে বাংলাদেশ।

যে সব সমঝোতা স্মারক হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে দুদেশের কালজয়ী সাহিত্য ও শিল্পকর্মের অনুবাদ ও সৃজন, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও খবর আদান-প্রদান, গণমাধ্যম, ক্রীড়া এবং স্বাস্থ্য খাতে বিনিময় সহযোগিতা। এর পাশাপাশি প্রধান উপদেষ্টার দ্বিপক্ষীয়  চীন সফরে দুদেশের মধ্যে পাঁচটি সহযোগিতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা হয়েছে।

এগুলো হলো, বিনিয়োগ আলোচনা শুরু করা, চীনের বিশেষায়িত অর্থনৈতিক অঞ্চল চালু, মোংলা বন্দরের আধুনিকীকরণ ও সম্প্রসারণ, একটি রোবট ফিজিওথেরাপি ও পুনর্বাসন কেন্দ্র নির্মাণ এবং কার্ডিয়াক সার্জারি গাড়ি অনুদান। বিশ্বের ২৯টি দেশের সঙ্গে ২২টি এফটিএ করেছে চীন, যার মধ্যে উন্নয়নশীল ও উন্নত- দুই ধরনের দেশই আছে। চীন আগামী মাস (ডিসেম্বর) থেকে বাংলাদেশকে শত ভাগ শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা দেওয়ার ঘোষণা ইতোমধ্যে দিয়েছে- এ কথা উল্লেখ করে বাণিজ্য উপদেষ্টা বলেন, ‘বেশি পরিমাণে পণ্য রপ্তানির মাধ্যমে আমরা এ সুযোগ কাজে লাগাতে চাই।’ চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক সম্পর্ক রয়েছে।

এ দেশে বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও মানুষের জন্য কাজের সুযোগ তৈরি করেছে চীন। এর মাধ্যমে চীনের সঙ্গে এ দেশের সম্পর্কে যোগ হয়েছে অনন্য মাত্রা। পণ্য আমদানির উৎস হিসেবে এক সময় বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের প্রথম পছন্দের দেশ ছিল ভারত। তবে এক যুগ আগেই তা পাল্টে গেছে। ২০০৮-০৯ অর্থবছর থেকে চীনা পণ্যের হিস্যা বেড়েছে বাংলাদেশের বাজারে। এখনো তা বজায় আছে। অর্থাৎ পণ্য আমদানিতে বাংলাদেশী ব্যবসায়ীদের প্রথম পছন্দের দেশ চীন।
এদিকে পাকিস্তান ড. ইউনূসকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে সে দেশ সফর করার জন্য। পাকিন্তান ইতোমধ্যে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের উন্নতি ঘটাতে শুরু করেছে। দেশটি বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদার করছে। বাংলাদেশে যেমন পাকিস্তানের পণ্যের বাজার রয়েছে, তেমনি পাকিস্তানেও বাংলাদেশী পণ্যের বাজার আছে। বিশেষ করে কাঁচাপাট ও পাটজাত পণ্যের বাজার। মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশী শ্রমিকদের জন্য আরও সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হচ্ছে। ড. ইউনূস মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে টেলিফোনের যোগাযোগ করেছেন। 
এদিকে থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাঙ্ককে বিমসটেকের শীর্ষ সম্মেলনের আসরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের দ্বিপক্ষীয় বৈঠক আয়োজনের যে প্রস্তাব ঢাকা দিয়েছিল, তাতে নয়াদিল্লির সাড়া পাওয়া গেছে। এই সফরে শীর্ষ সম্মেলনের শেষে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক পর্যালোচনার জন্য বৈঠক করেন।

বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলের সাত দেশের অর্থনৈতিক সহযোগিতা বিষয়ক জোট বিমসটেকের ষষ্ঠ শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে ২ থেকে ৪ এপ্রিল। ড. ইউনূসকে নরেন্দ্র মোদি ঈদের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। এটাও একটা শুভ লক্ষ্মণ বটে। এর পাশাপাশি দীর্ঘদিন পর ইউনূস-মোদি বৈঠক একটি কূটনৈতিক সাফল্য অবশ্যই। যেখানে দ্বিপক্ষীয় বিষয়গুলো প্রাধান্য পেয়েছে।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একটি ছোট্র দেশ হলো বাংলাদেশ। আমাদের দেশটি ছোট হলেও এর গুরুত্ব অনেক বেশি। কারণ, এখানে ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগের সম্ভাবনা অনেক বেশি। শুধু তাই নয়, ভৌগোলিক দিক দিয়েও অনেক গুরুত্ব রয়েছে বাংলাদেশের। ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে বাংলাদেশে ক্রান্তীয় মৌসুমী জলবায়ু বিরাজ করে, যা মনুষ্য বসবাসের অনুকূল। দেশটির অধিকাংশ এলাকা গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র নদীবাহিত পলি দ্বারা গঠিত।

দেশের প্রায় সর্বত্র জালের ন্যায় নদী-নালা থাকায় একে নদীমাতৃক দেশ বলা হয়। এখানে রয়েছে কৃষি কাজের উপযোগী উর্বর মাটি ও জলবায়ু, জমির সেচকার্যে ব্যবহারের জন্য নদী-নালা ও ভূগর্ভস্থ পানি, শিল্প ও কৃষিকার্যে নিয়োগের উপযুক্ত দক্ষ ও অদক্ষ শ্রমিক, আন্তর্জাতিক ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য গভীর ও অগভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণ করার উপযুক্ত সামুদ্রিক পরিবেশ এবং সর্বোপরি সুন্দর মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশ।

ভূরাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান আধুনিক যুগে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অধিকাংশ সমুদ্রপথে সম্পন্ন হয়ে থাকে। এই কারণে সমুদ্র পথে পণ্য পরিবহন খরচ তুলনামূলকভাবে অন্যান্য পরিবহন মাধ্যম অপেক্ষা অনেক কম।
ড. ইউনূসের যোগ্য নেতৃত্ব বাংলাদেশকে বিশ্বে উচ্চমাত্রায় নিয়ে যাচ্ছে। গোটা বিশ্ব এখন সুনজর দিচ্ছে বাংলাদেশের ওপর। বিশ্বে পরাশক্তি পশ্চিমে যুক্তরাষ্ট্র আর পূর্বে চীন আর রাশিয়াও বাংলাদেশের ওপর সুদৃষ্টি দিচ্ছে। পশ্চিমা দেশগুলো বিনিয়োগ ও বাণিজ্য বাড়াতে আগ্রহী হয়ে উঠছে। চীন তো আছেই।

শুধু বাণিজ্যই নয়, সামরিক দিক দিয়েও বাংলাদেশকে সহায়তা করতে অনেক দেশ এগিয়ে আসছে। এ সবই বাংলাদেশের জন্য নানামাত্রিক কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

লেখক : সাবেক কর কমিশনার ও প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান-ন্যশনাল এফএফ ফাউন্ডেশন

×