ঢাকা, বাংলাদেশ   রোববার ০৬ এপ্রিল ২০২৫, ২৩ চৈত্র ১৪৩১

মানহীন প্রাথমিক শিক্ষা

-

প্রকাশিত: ২০:৪০, ৫ এপ্রিল ২০২৫

মানহীন প্রাথমিক শিক্ষা

সম্পাদকীয়

সদ্য স্বাধীন দেশে ১৯৭৩ সালে ৩৭ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ করা হয়। পরবর্তীতে ২০১৩ সালে এক সঙ্গে ২৬ হাজার ১৯৩টি রেজিস্টার্ড প্রাথমিক বিদ্যালয় করা হয় জাতীয়করণ। বর্তমানে বাংলাদেশে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ৬৫ হাজার ৯৯টি। দুঃখজনক হলো শিক্ষার সার্বিক মানোন্নয়নে কোনো সরকারই কার্যকর ও টেকসই পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি।

শিক্ষার্থীরা কতটা শিখছে বা দক্ষতা অর্জন করছে, সে বিষয়ে যথাযথ পর্যবেক্ষণ নেই। তদারকি আছে শুধু ক্লাসে উপস্থিত শিক্ষার্থী ও বেঞ্চ গণনায়। দেশে প্রাথমিক শিক্ষার উন্নয়নে গত এক যুগে দুটি বৃহৎ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়, যার ব্যয় ৩৩ হাজার ৪৭৩ কোটি ৬৪ লাখ ৩৬ হাজার টাকা। কিন্তু এর কোনো সুফল আসেনি। ঠেকানো যায়নি প্রাথমিক শিক্ষার মানের অবনতি। শিক্ষার মানোন্নয়নে প্রয়োজন শিখন-শেখানোর কৌশলের আধুনিকায়ন।

কিন্তু বাংলাদেশে বিগত সময়ে জোর দেওয়া হয়েছে শুধু অবকাঠামো নির্মাণে বিগত সরকারের আমলে দেশে শিক্ষা খাতে যেসব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, সেগুলোর প্রায় সবই ছিল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে। শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার হার নিয়ে কাজ হয়েছে। শ্রেণিতে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিও বেড়েছে। কিন্তু তারা ক্লাসে কতটা শিখছে, সে বিষয়ে জোর দেওয়া হয়নি। 
দেশের শিক্ষাবিদরা বলছেন, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠদানের পদ্ধতি ও পরীক্ষা নিয়ে অনেক শোরগোল তোলা হলেও শিক্ষার মানের অবনতি ঠেকানো যায়নি। প্রাথমিকের সহকারী শিক্ষকরা বেতন পান ১৩তম গ্রেডে। শিক্ষকদের বেতন-ভাতা কম হওয়ায় প্রভাব পড়ছে মানের ওপর। শিক্ষাবিদগণ মনে করছেন, শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাতের নেতিবাচক প্রভাব মানসম্মত শিক্ষায় পড়ে।

শিক্ষার্থী ও শিক্ষকের মধ্যে সম্পর্কের দূরত্ব, পর্যাপ্ত অবকাঠামো ও তহবিলের অভাব প্রাথমিক শিক্ষার মান ক্রমাবনতির দিকে ধাবিত করছে। প্রাথমিক স্তরে হাজার হাজার শিক্ষকের পদ খালি রেখে মানসম্পন্ন শিক্ষা আশা করা যায় না। বৈশ্বিক পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের দেশের শিক্ষকদের প্রশিক্ষণও মানসম্পন্ন নয় বিধায় শ্রেণিকক্ষে কাক্সিক্ষত মানের পাঠদান থেকে বঞ্চিত হচ্ছে কোমলমতি শিশুরা। 
শিশুদের জন্য প্রাথমিকে মানসম্মত শিক্ষা বাস্তবায়নে লক্ষ্যে ২০১১ সালে তৃতীয় প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন প্রকল্প (পিইডিপি-৩) হাতে নেয় সরকার। ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে সম্পন্ন এ প্রকল্পে ১৮ হাজার ১৫৩ কোটি ৮৮ লাখ ৩৬ হাজার টাকা ব্যয় হয়। প্রাথমিক শিক্ষায় শক্তিশালী সুশাসন নিশ্চিতের পাশাপাশি বিদ্যালয়ে শিখন ও শেখানোর গুণমানের উন্নয়ন, সর্বজনীনভাবে বিস্তৃত একটি সুষ্ঠু সমতাভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সরকার ২০১৮ সালে চতুর্থ প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন প্রকল্প (পিইডিপি-৪) কার্যক্রম শুরু করে।

২০২২ সালের জুলাইয়ে সম্পন্ন হওয়া এ প্রকল্পে ১৫ হাজার ৩১৯ কোটি ৭৬ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। বিপুল ব্যয়ের এই দুটি প্রকল্প শেষে শিক্ষার্থীদের দক্ষতায় উন্নতি হওয়ার কথা ছিল। তবে এসব প্রকল্প শেষে শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার হার কমা এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন ছাড়া শিক্ষার মানে তেমন কোনো প্রভাব পড়েনি। শিক্ষা অধিদপ্তর ও ইউনিসেফের ‘ন্যাশনাল স্টুডেন্ট অ্যাসেসমেন্ট-২০২২’ অনুযায়ী তৃতীয় শ্রেণির ৫১ শতাংশ ও পঞ্চম শ্রেণির ৫০ শতাংশ শিক্ষার্থী বাংলায় দুর্বল।

তৃতীয় শ্রেণির প্রায় ৬১ শতাংশ ও পঞ্চম শ্রেণির ৭০ শতাংশ শিক্ষার্থী দুর্বল গণিতে। তাদের গণিতের দক্ষতা তৃতীয় শ্রেণির উপযোগীও নয়। এহেন দুরবস্থার অবসানে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় যথাযথ পদক্ষেপ নেবে বলেই প্রত্যাশা।

×