ঢাকা, বাংলাদেশ   রোববার ০৬ এপ্রিল ২০২৫, ২৩ চৈত্র ১৪৩১

যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কারোপ

-

প্রকাশিত: ২০:৩৯, ৫ এপ্রিল ২০২৫

যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কারোপ

সম্পাদকীয়

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিভিন্ন দেশের পণ্যের ওপর নতুন করে শুল্কারোপ করেছেন, যাকে ‘বাণিজ্য যুদ্ধ’ হিসেবে আখ্যায়িত করছে অনেক দেশ। ট্রাম্পের এ সিদ্ধান্তে বাংলাদেশী পণ্যের ওপর শুল্ক বাড়িয়ে ৩৭ শতাংশ করা হয়েছে। এতদিন দেশটিতে বাংলাদেশী পণ্যের ওপর গড়ে ১৫ শতাংশ করে শুল্ক ছিল। বাড়তি শুল্কারোপের তালিকায় বাংলাদেশের ওপরে রয়েছে কম্বোডিয়া (৪৯ শতাংশ) এবং শ্রীলঙ্কা (৪৪ শতাংশ)।

বাংলাদেশের প্রধান দুই রপ্তানি পণ্যের বাজারের অন্যতম যুক্তরাষ্ট্র। দেশের প্রধান রপ্তানি পণ্য তৈরি পোশাকের একটি বড় অংশ রপ্তানি হয় দেশটিতে। সে দেশে বছরে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানি হয় প্রায় ৮ দশমিক ৪ বিলিয়ন (৮৪০ কোটি) ডলার, যা প্রধানত তৈরি পোশাক। গত বছর যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি পোশাক রপ্তানি দাঁড়ায় ৭ দশমিক ৩৪ বিলিয়ন (৭৩৪ কোটি) ডলারে। নতুন করে উচ্চ মাত্রায় এ শুল্কারোপে বাংলাদেশের রপ্তানি, বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা।

তৈরি পোশাকশিল্প বাংলাদেশের অর্থনীতির অস্তিত্বের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। দেশটির মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি আসে এ খাত থেকে। এ খাতে কাজ করেন প্রায় ৪০ লাখ মানুষ। দেশটির মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ১০ শতাংশ আসে তৈরি পোশাকশিল্প থেকে। এসব বিষয় হিসাব করলে বলতে হয়, ট্রাম্পের নতুন শুল্ক বাংলাদেশের এ খাতের জন্য সবচেয়ে বড় ধাক্কা।
বাড়তি শুল্কারোপে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সমালোচনা করেছেন বিশ্বনেতারা। তাদের মধ্যে মার্কিন মিত্রদেশ ইতালির জর্জিয়া মেলোনি ও অস্ট্রেলিয়ার অ্যান্থনি অ্যালবানিজও রয়েছেন। অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যালবানিজ ট্রাম্পের ওই ঘোষণাকে ‘অন্যায় শুল্ক’ আরোপ হিসেবে সমালোচনা করে বলেন, এর জন্য মার্কিনদের সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হবে। গণ-অভ্যুত্থানের মুখে গত বছরের জুলাই-আগস্টের অভ্যুত্থানে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারের পতন হয়। সে সময়ে সহিংস বিক্ষোভের কারণে দেশে তৈরি পোশাকের উৎপাদন বিঘিœত হয়েছিল।

ফলে পশ্চিমা ফ্যাশন ব্র্যান্ডগুলোর কাছে বেশ জনপ্রিয় এ বাজারের দীর্ঘমেয়াদি সম্ভাবনা নিয়ে তৈরি হয়েছিল সন্দেহ। মনে রাখতে হবে, আমাদের তৈরি পোশাকের অন্যতম প্রধান গন্তব্য হলো যুক্তরাষ্ট্র। তৈরি পোশাকের কাঁচামাল তুলার অন্যতম আমদানি বাজারও যুক্তরাষ্ট্র। তৈরি পোশাক খাত দেশের অর্থনীতির অন্যতম লাইফলাইন। কাজেই অর্থনীতিতে যে কোনো ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আগেই বাংলাদেশের যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

ট্রাম্পের শুল্কনীতি কতদিন টেকসই হবে, সেটি সময়ই বলে দেবে। বাড়তি শুল্কের চাপ শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপরই এসে পড়ে। তাই ট্রাম্পের নিজ দেশেই তীব্র প্রতিক্রিয়া হওয়ার কথা। পাল্টা শুল্কের চাপে মার্কিন ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলো আমাদের পোশাকের দাম কমানোর ওপর চাপ দেবে, এটাই বাস্তবতা। এখন যে ক্রয়াদেশ আছে, সেগুলোর দামও কমাতে বলতে পারে ক্রেতারা। ফলে সম্মিলিতভাবে সেই চাপ সামাল দেওয়ার প্রস্তুতি থাকতে হবে।

সরকারের সমীচীন হবে বেসরকারি খাতের সঙ্গে আলোচনা করে কৌশল নির্ধারণ করা। তাছাড়া শুল্ক বিষয়ে আলোচনার সুযোগও কাজে লাগানো চাই। এটা ঠিক, যে দেশ যখন শুল্ক কমাবে, যুক্তরাষ্ট্রও তাদের ওপর শুল্ক কমাবে। অবিলম্বে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহযোগিতা ফোরাম চুক্তির (টিকফা) প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরা এবং শুল্ক হ্রাসের জন্য আলোচনা শুরু করা প্রয়োজন।

×