
হুতিদের বিরুদ্ধে হামলা চালানোর বিষয়ে ট্রাম্পের সিদ্ধান্তটি বিপথগামী
মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ইয়েমেনে নতুন করে উত্তেজনা পরিলক্ষিত হচ্ছে। লোহিতসাগরে মার্কিন রণতরি হামলার কবলে পড়লে হুতিদের ওপর মার্কিন হামলায় ৫৩ জন নিহত হয়। গত ১৫ মার্চ ট্রাম্প মার্কিন সেনাবাহিনীকে হুতিদের ওপর হামলা চালানোর নির্দেশ প্রদান করলে সানার উত্তরে হুতিনিয়ন্ত্রিত প্রদেশে হামলা চালানো হয়। হুতিদের রাজনৈতিক ব্যুরো যুক্তরাষ্ট্রের এই হামলাকে যুদ্ধাপরাধ হিসেবে অভিহিত করেছে। তারা এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, মার্কিন আগ্রাসনের জবাব দেওয়া হবে। হুতিদের সশস্ত্র বাহিনী এ হামলার জবাব দিতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে।
ইয়েমেনে মার্কিন হামলা হুতিদের ফিলিস্তিনের প্রতি সমর্থন অব্যাহত রাখা থেকে বিরত রাখতে পারবে না। এরই পরিপ্রেক্ষিতে মার্কিন রণতরিতে প্রতিশোধমূলক হামলা চালানো হয়েছে বলে হুতি জানিয়েছে। হুতি বিদ্রোহীরা ইয়েমেনের একটি সশস্ত্র গোষ্ঠী। তারা আনসার আল্লাহ বা আল্লাহর সমর্থক হিসেবে পরিচিত। সংগঠনটির আবির্ভাব হয় গত শতকের নব্বইয়ের দশকে। তবে তারা ব্যাপকভাবে আলোচনায় আসে ২০১৪ সালে।
যে সময় তারা ইয়েমেনের রাজধানী সানা দখল করে নেয়। তখন দেশটির প্রেসিডেন্ট আবদরাব্বু মনসুর হাদি ইয়েমেন ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়। শিয়া গোষ্ঠীটিকে ইরানের প্রক্সি হিসেবে দেখা উচিত নয়। কারণ, এর নিজস্ব ভিত্তি আছে, নিজস্ব স্বার্থ আছে এবং নিজস্ব লক্ষ্যও রয়েছে। ১৯৯০ সালে ইয়েমেনে আরব প্রজাতন্ত্র (উত্তর ইয়েমেন) এবং গণপ্রজাতন্ত্রী ইয়েমেন (দক্ষিণ ইয়েমেন) দেশ দুটি একত্রিত হয়ে ইয়েমেন প্রজাতন্ত্র গঠিত হয়।
রাজধানী সানা হচ্ছে দেশটির বৃহত্তম শহর। দেশটির পশ্চিমে লোহিতসাগর এবং দক্ষিণে এডেন উপসাগর। আফ্রিকা মহাদেশ থেকে বাব এল মান্দেব প্রণালির মাধ্যমে এটি বিচ্ছিন্ন। ২০১৫ সালের মার্চ মাসে সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট ইয়েমেনে হস্তক্ষেপ করলে পশ্চিমা জোট সৌদি আরবকে সমর্থন দেয়। সামরিক জোট ইয়েমেনে হুতিদের বিরুদ্ধে ব্যাপক অভিযান চালালেও শেষ পর্যন্ত ইরান সমর্থিত হুতিদের পরাজিত করতে ব্যর্থ হয়।
২০১৭ সালে দুর্ভিক্ষের পর দেশটির সরকারব্যবস্থা ভঙ্গুর হয়ে পড়েছে। দেশটির বেশিরভাগ অংশ এখন হুতিদের নিয়ন্ত্রণে। যার মধ্যে রাজধানী সানা, দেশটির উত্তরাংশ এবং লোহিতসাগরের উপকূল অঞ্চল; যদিও তারা ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার নয়। এর ফলে, লোহিত সাগরের প্রবেশপথ হিসেবে খ্যাত বাব আল মানদাব প্রণালি হুতিদের নিয়ন্ত্রণে; যেটি ইউরোপের সঙ্গে এশিয়ার যোগাযোগের সংক্ষিপ্ততম বাণিজ্যপথ হিসেবে পরিচিত।
লোহিত সাগর হচ্ছে ভূমধ্যসাগর ও ভারত মহাসাগরের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ। ২০১৪ সালে শিয়া মুসলিম গোষ্ঠী হুতি বিদ্রোহীরা রাজধানী সানা দখলে নেওয়ার পর থেকে গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে দেশটি। হুতিদের বিরুদ্ধে সৌদি আরবের নেতৃত্বে যৌথ বাহিনীর আকাশপথে হামলার কারণে আরও বেশি ধ্বংস ডেকে এনেছে। ইয়েমেন ও সৌদি আরব এখন শান্তি আলোচনায় রয়েছে।
হুতিরা গত নভেম্বর থেকে সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে হুমকি হয়ে উঠায় যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য তাদের ওপর পাল্টা হামলা চালায়। জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় ২০২২ সালের এপ্রিলে ইয়েমেনে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। জাতিসংঘ ২০২৩ সালের মার্চে ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধকে বিশে^র সবচেয়ে ভয়াবহ মানবিক সংকট হিসেবে আখ্যা দেয়। ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সশস্ত্র সংগঠন হামাস ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরাইলে নজিরবিহীন হামলা চালালে গাজায় নির্বিচারে হামলা শুরু করে ইসরাইল। যুক্তরাষ্ট্র গাজা যুদ্ধে ইসরাইলকে সমর্থন প্রদান করে।
গাজায় ইসরাইলি হামলার প্রতিবাদে এবং ফিলিস্তিনি জনগোষ্ঠী ও হামাসের প্রতি সমর্থন জানিয়ে ২০২৩ সালের নভেম্বরে লোহিত সাগরে চলাচলকারী ইসরাইলি জাহাজে হুতিরা হামলা চালানো শুরু করে। গত ১৯ জানুয়ারি গাজায় প্রথম ধাপের যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলে হুতিরা জাহাজে হামলা বন্ধ করে। গত ১ মার্চ গাজায় যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হয়।
এদিকে গাজায় থাকা ইসরাইলের বাকি বন্দিদের মুক্তি দিতে হামাসকে বাধ্য করতে গাজায় অবরোধ আরোপ করে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে লোহিত সাগরে ইসরাইল সংশ্লিষ্ট জাহাজগুলোকে লক্ষ্য করে হুতিরা পুনরায় হামলা চালানোর হুমকি প্রদান করে। যুক্তরাষ্ট্র তাই হুতিদের বিরুদ্ধে বড় পরিসরে সামরিক অভিযান শুরু করে।
লোহিত সাগরে নতুন করে হামলার কারণে তেলের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। অথচ প্রায় ১৫ শতাংশ বৈশি^ক বাণিজ্য জাহাজ এই সাগরপথ ব্যবহার করে। এর পরিবর্তে জাহাজগুলোকে এখন দক্ষিণ আফ্রিকার আশপাশে আরও দীর্ঘ পথ ব্যবহার করতে হচ্ছে। ট্রাম্প বলেছেন, এক বছরেরও বেশি সময় আগে যুক্তরাষ্ট্রের পতাকাবাহী জাহাজ সুয়েজ খালের ভেতর দিয়ে নিরাপদে লোহিত সাগরে যাতায়াত করেছে।
এশিয়া এবং ইউরোপের মধ্যে দ্রুততম সমুদ্রপথ হচ্ছে এই সুয়েজ খাল। তেল এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহনে এই পথ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ট্রাম্প হুতিদের উদ্দেশে লিখেছেন, যদি তোমরা না থামো, তবে তোমাদের ওপর নরক বৃষ্টি হবে; যা তোমরা আগে কখনো দেখনি। তিনি মার্র্কিন সেনাবাহিনীকে ইয়েমেনের হুতিদের বিরুদ্ধে একটি নিষ্পত্তিমূলক ও শক্তিশালী সামরিক অভিযান শুরুর নির্দেশ দিয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্র তার লক্ষ্য অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত ইয়েমেনে হুতিদের বিরুদ্ধে ব্যাপক আকারে প্রাণঘাতী শক্তি প্রয়োগ করবেন বলে ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। ইরানের অর্থায়নে হুতিরা মার্কিন বিমানে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে বলে ট্রাম্প অভিযোগ করেন। তারা যুক্তরাষ্ট্রের সৈন্য ও মিত্রদের লক্ষ্যবস্তু করেছে। ট্রাম্প বলেন, হুতিদের জলদস্যুতা, সহিংসতা ও সন্ত্রাসবাদের জন্য ক্ষয়ক্ষতিসহ তা মোকাবিলায় বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার খরচ হয়েছে।
তারা জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে বলেও ট্রাম্প উল্লেখ করেন। ট্রাম্প হুতিদের বড় সমর্থক ইরানকেও হুমকি দিয়ে বলেন, হুতিদের সমর্থন দেওয়া তেহরান অবিলম্বে যাতে বন্ধ করে। আর যদি ইরান যুক্তরাষ্ট্রকে হুমকি প্রদান করে, তাহলে তেহরানকে সম্পূর্ণরূপে জবাবদিহির আওতায় আনা হবে বলে ট্রাম্প উল্লেখ করেন।
ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর মধ্যপ্রাচ্যে হুতিদের বিরুদ্ধে চলমান এই হামলাই হচ্ছে এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সামরিক অভিযান। যুক্তরাষ্ট্র এমন এক সময়ে এ হামলা শুরু করেছে, যখন নিষেধাজ্ঞা বাড়িয়ে তেহরানকে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনায় বসতে বাধ্য করার চেষ্টা করছে।
হুতিরা বিগত ১৮ মাস ধরে ইয়েমেন উপকূলের ব্যস্ত সমুদ্রপথ লক্ষ্য করে অভিযান চালিয়েছে। ইয়েমেনি সশস্ত্র বাহিনী জানিয়েছে, তারা ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করেছে। দেশটির সেনাবাহিনীর মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি বলেন, গাজার ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করে এই হামলা চালানো হয়েছে। তিনি আরও বলেন, ইসরাইলের আগ্রাসন এবং গাজার অবরোধ প্রত্যাহার না হওয়া পর্যন্ত এই অভিযান অব্যাহত থাকবে। তবে এবার যুক্তরাজ্য হুতিদের বিরুদ্ধে হামলায় অংশ নেয়নি।
তবে যুক্তরাষ্ট্রকে নিয়মিত জ¦ালানি সহায়তা করছে। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপের পরও হুতিরা জানিয়েছে, তারা লোহিত সাগরে ইসরাইলি জাহাজের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো বন্ধ করবে না। রয়টার্সকে প্রদত্ত এক সাক্ষাৎকারে হুতি নেতা জামাল আমের বলেন, গাজায় ফিলিস্তিনিদের সমর্থনে তারা লোহিত সাগরে ইসরাইল জাহাজের বিরুদ্ধে আক্রমণ অব্যাহত রাখবে এবং মার্কিন সামরকি চাপ বা তাদের মিত্র ইরানের অনুরোধেও তারা তাদের অবস্থান পরিবর্তন করবে না।
ইসরাইল গাজায় পুনরায় হামলা শুরু করার পর গাজা, ইয়েমেন ও লেবানন একজোটে ইসরাইলের বিভিন্ন অঞ্চলে রকেট হামলা চালায়। এর জবাবে ইসরাইল এই তিনটি অঞ্চলে অবিরত হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। দক্ষিণ লেবাননেও হামলা চালিয়েছে ইসরাইলি বাহিনী। লেবাননের প্রধানমন্ত্রী নাওয়াফ সালাম বলেন, তার দেশ একটি নতুন যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে। দক্ষিণ লেবাননে আবারও সামরিক অভিযান শুরু হলে তা লেবাননকে এক ভয়াবহ যুদ্ধে টেনে নিয়ে যেতে পারে।
ইসরাইলের নতুন সেনাপ্রধান এয়াল জামির বলেছেন, লেবাননের দায়িত্ব তাদের সীমান্ত নিরাপদ রাখা। এই রকেট হামলার জন্য তীব্র প্রতিশোধ নেওয়া হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন। নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, যদি সংঘাত আরও বেড়ে যায়, তাহলে ইসরাইল ও লেবাননের মধ্যে একটি সম্পূর্ণ যুদ্ধ শুরু হতে পারে। গত ২০ মার্চ জেরুজালেম পোস্টের একটি প্রতিবেদন থেকে জানা যায় যে, যুক্তরাষ্ট্র ইসরাইলকে অনুরোধ করেছে, তারা যেন হুতি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা না চালায়, বরং বিষয়টি তারা যুক্তরাষ্ট্রের ওপর ছেড়ে দেয়।
কারণ, যুক্তরাষ্ট্র মনে করে যে, তাদের বিমানবাহী রণতরীর টানা ও কার্যকর হামলা চালানোর সক্ষমতা বেশি রয়েছে। তবে সাবেক মার্কিন কূটনীতিক নাবিল খুরি বলেছেন, হুতিদের বিরুদ্ধে হামলা চালানোর বিষয়ে ট্রাম্পের সিদ্ধান্তটি বিপথগামী। এ হামলা বিদ্রোহী গোষ্ঠীকে দমন করতে পারবে না। যা ঘটছে তার কোনো সামরিক যুক্তি নেই।
ট্রাম্প ইরানকে সতর্ক করে দিয়ে জানান, ইয়েমেনের হুতি আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের পথে আক্রমণ চালিয়ে গেলে তাদের ভয়াবহ পরিণতির মুখোমুখি হতে হবে। হুতিদের ছোড়া প্রতিটি গুলির জন্য ইরানের নেতৃত্বকেই দায়ী করা হবে বলে ট্রাম্প জানান। ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের ইরান মদদ দিচ্ছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন।
ইরান হুতিদের তহবিল, অস্ত্র ও গোয়েন্দা সহায়তা দিচ্ছে বলে ট্রাম্প অভিযোগ করেন। তবে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে ইরানের রাষ্ট্রদূত আমির সাইদ ইরাভানি ইয়েমেনে জাতিসংঘের অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা অমান্যের অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ইরান এ অঞ্চলে অস্থিতিশীলতা তৈরি করে এমন কার্যক্রমে জড়িত নয়। ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিহীন অভিযোগ তুলেছে বলে তিনি দাবি করেন।
এদিকে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, ইয়েমেন অবিরত সামরিক অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। পাশাপাশি ইয়েমেনি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মুখে দ্বিতীয় রণতরি মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন করার ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ইয়েমেনি বাহিনী হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, মার্কিন ও ইসরাইল আগ্রাসন চলতে থাকলে তারা আরও কঠোর প্রতিক্রিয়া দেখাবে। ইয়েমেনের হুতি আন্দোলনের নেতা আব্দুল মালিক আল-হুতি বলেছেন, ইয়েমেনের বিরুদ্ধে মার্কিন আগ্রাসন কঠোর প্রতিরোধের মধ্যে পড়বে এবং ইয়েমেনি সশস্ত্র বাহিনী মার্কিন বিমানবাহী রণতরী এবং এ অঞ্চলে মোতায়েনকৃত যুদ্ধজাহাজকে লক্ষ্যবস্তু করবে।
তিনি আরও বলেন, মার্কিন আগ্রাসন বরং ইয়েমেনের সক্ষমতা আরও উন্নত করতে অবদান রাখবে এবং আমরা উত্তেজনা দিয়ে উত্তেজনা মোকাবিলা করব। ইরানের মিত্র দেশগুলোর মধ্যে ফিলিস্তিনের হামাস ও লেবাননের হিজবুল্লাহ অনেকটা দুর্বল হয়ে পড়েছে। গত ডিসেম্বরে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদ ক্ষমতাচ্যুত হয়ে রাশিয়ায় আশ্রয় গ্রহণ করেন। তবে ইয়েমেনের হুতিদের এখনো হামলা চালানোর মতো সক্ষমতা রয়ে গেছে।
মূলত জো বাইডেনই হুতিদের ওপর হামলা শুরু করেছিলেন। লোহিত সাগরে জাহাজে হুতিদের হামলা চালানোর সক্ষমতা হ্রাস করাই ছিল এর উদ্দেশ্য। কিন্তু প্রত্যাশা অনুযায়ী তা কার্যকর হয়নি। তাই ট্রাম্প প্রশাসন হুতিদের বিরুদ্ধে আরও বেশি আক্রমণাত্মক হামলা চালাতে যাচ্ছেন।
লোহিত সাগরে জাহাজে হামলা চালানো বন্ধের ঘোষণা না দেওয়া পর্যন্ত হুতিদের বিরুদ্ধে চলমান অভিযান অব্যাহত থাকবে বলে যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে। তবে মার্কিন হামলা জারি থাকলে নিজেরাও পাল্টা হামলা অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছে হুতিরা। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেন, হুতিরা যখনই বলবে আমরা আপনাদের জাহাজে হামলা বন্ধ করব, তখনই আমরা তাদের ড্রোনে গুলি করা থামিয়ে দেব।
তিনি আরও বলেন, গুরুত্বপূর্ণ জলপথে আমাদের সম্পদ নিশানা করে হামলা বন্ধ করতে হবে। যাতে করে জাহাজ চলাচলের স্বাধীনতা পুনরায় চালু করা যায়; এটা যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় স্বার্থ। ইরান দীর্ঘদিন ধরে হুতিদের পৃষ্ঠপোষকতা করছে, তা বন্ধ করতে হবে। এদিকে ইয়েেেমনে হুতি বিদ্রোহীদের ওপর মার্কিন বিমান হামলার একটি পরিকল্পনা ফাঁস হয়।
হামলার লক্ষ্যবস্তু, মোতায়েন করা অস্ত্র ও হামলার ক্রমসম্পর্কিত তথ্যসহ নানা বিষয় এ পরিকল্পনায় উল্লেখ করা হয়। এমন ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে ডেমোক্র্যাট আইন প্রণেতারা বলেন, এটি যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার লঙ্ঘন এবং এতে আইনের ব্যত্যয় ঘটেছে। এদিকে ইয়েমেনের হুতিরা লোহিত সাগরে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধজাহাজে হামলার দাবি করেছে। হুতির মুখপাত্র বলেন, হুতিরা ইয়েমেনের কৌশলগত জলসীমায় ইসরাইলি নৌযান চলাচলে বাধা সৃষ্টি অব্যাহত রাখবে।
যতদিন পর্যন্ত গাজায় ইসরাইলি আগ্রাসন বন্ধ না হবে এবং গাজার ওপর থেকে অবরোধ তুলে নেওয়া না হবে, ততদিন পর্যন্ত হুতিরা ইসরাইলি শক্তির বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে যাবে। বর্তমান সময়ে লোহিত সাগর একটি গুরুতর নিরাপত্তা হুমকির মুখে। এটি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় ধরনের বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। হুতি যোদ্ধাদের হামলার ফলে ইসরাইলের প্রধান পৃষ্ঠপোষক যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল অনেকটা বন্ধ হয়ে গেছে; যা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এক বড় ধরনের পরাজয়।
গাজায় ইসরাইলের হত্যাযজ্ঞের প্রতিশোধ হিসেবে হুতিরা লোহিত সাগরে মার্কিন যুদ্ধজাহাজসহ অন্য শত্রু সামরিক জাহাজগুলোতে হামলা চালাচ্ছে। হুতিদের হামলার কারণে এই বাণিজ্যপথে ব্যাঘাত ঘটছে, যা পশ্চিমা শক্তির জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা মাইক ওয়ার্ল্ডস বলেছেন, বিপদ এড়াতে ৭৫ শতাংশ পণ্যবাহী জাহাজ এখন সুয়েজ খালের পরিবর্তে আফ্রিকার দক্ষিণ উপকূল ঘুরে চলাচল করবে।
ফলে, পশ্চিমা দেশগুলোকে ভিন্ন নৌপথ ব্যবহারে বাধ্য করা হচ্ছে। এই সংঘাতের কারণে বিশ্ব বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং বৈশি^ক অর্থনীতিতে ব্যাপক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। হুতিদের লোহিত সাগরে জাহাজে হামলা ইয়েমেনে স্থায়ী শান্তি প্রক্রিয়ার জন্য হুমকি হতে পারে।
লখক : সহযোগী অধ্যাপক
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়