ঢাকা, বাংলাদেশ   শনিবার ০৫ এপ্রিল ২০২৫, ২২ চৈত্র ১৪৩১

ছাদ রেস্তোরাঁর বিপদ

প্রকাশিত: ২১:০২, ৪ এপ্রিল ২০২৫

ছাদ রেস্তোরাঁর বিপদ

সম্পাদকীয়

ঢাকা মহানগরী নিয়ে নানা সময়ে আন্তর্জাতিক সমীক্ষা ও গবেষণায় নেতিবাচক চিত্র উঠে এসেছে। দূষিত বায়ুর শহর হিসেবে পরিচিত ঢাকা বিশে^র বসবাস-অযোগ্য শহরের তকমাও পেয়ে গেছে। পরিবেশগত নানা বিপদ ও ঝুঁকি রয়েছে এই শহরে বসবাসকারী নাগরিকদের। অধুনা মিয়ানমারে ভূমিকম্পের পর ঢাকায় ভূমিকম্পের আশঙ্কা করছেন অনেকেই। ভূমিকম্পের পরে উদ্ধার তৎপরতা নিয়ে নানা কথাও শোনা যাচ্ছে। বলাবাহুল্য, সেখানে কোনো আশার আলো নেই।

অতি জনঅধ্যুষিত ও গায়ে গা-লাগা অনাধুনিক আবাসনের বাহুল্যের কারণে পুরান ঢাকা ভূমিকম্পে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হবে কিনা সেটি নিয়ে আলোচনা আছে। এদিকে রোজার ঈদের আগে-পরে ঢাকায় অসহনীয় গরম পড়ছে, তাপমাত্রা ৩৫ ছুঁইছুঁই। এরকম একটা পরিস্থিতিতে স্বাভাবিকভাবে গরম কমিয়ে নাগরিক জীবনে স্বস্তি আনার প্রসঙ্গ আলোচিত হচ্ছে। 
ঢাকায় বহুতল ভবনের ছড়াছড়ি। এসব ভবনের ছাদে বাগান গড়ে তোলা গেলে উষ্ণতা কমানো যায়; ভবনের ছাদে বাগান থাকলে তা আশপাশের এলাকার তাপমাত্রা কমাতে বড় ভূমিকা পালন করে। অথচ বছর বছর ছাদ-বাগানের সংখ্যাকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে ছাদ রেস্তোরাঁ।  ইতোমধ্যে ভবনের ছাদে ২০০টির মতো রেস্তোরাঁ গড়ে তোলার সংবাদ এসেছে গণমাধ্যমে।

বলা দরকার, রাজধানীর বহুতল ভবনের ছাদে স্থাপিত রেস্তোরাঁর ৯৯ শতাংশই অননুমোদিত, রাজউকের পক্ষ থেকে অনুমোদন দেওয়া হয়নি। ছাদে উচ্চ তাপে রান্না এবং প্লাস্টিক-জাতীয় দাহ্যবস্তু ব্যবহার করে সাজানোর কারণে সংশ্লিষ্ট ভবন ও এর আশপাশের ভবনে আগুন লাগা এবং তা ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁঁকি রয়েছে। 
বিশ্বব্যাংকের এক গবেষণা বলছে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ঢাকা শহরে যে তীব্র তাপপ্রবাহ সৃষ্টি হয়, তা কমাতে ঢাকার বহুতল ভবনের ওপর ছাদ-বাগান হতে পারে অন্যতম বিকল্প। কিন্তু ছাদ-বাগানের পরিবর্তে ভবনের ছাদগুলো হয়ে উঠছে একেকটি জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ড। ফলে যে ছাদ জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অতিরিক্ত তাপমাত্রা মোকাবিলায় ভূমিকা রাখতে পারত, তা-ই বাড়িয়ে তুলছে তাপপ্রবাহ।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের ভাষ্য, মেগা সিটি ঢাকায় বহুতল ভবনের ছাদে রেস্তোরাঁ এখন গোদের ওপর বিষফোঁড়া। কোনো ছাদ রেস্তোরাঁকে অগ্নিনিরাপত্তার সনদ দেয়নি ফায়ার সার্ভিস। বিদ্যমান ইমারত নির্মাণ বিধিমালায় ভবনের ছাদে বড় কোনো স্থাপনা নির্মাণের নিয়মও নেই। তাহলে কিভাবে এত ছাদ রেস্তোরাঁ গড়ে উঠল?
নগর-পরিকল্পনাবিদ ও স্থপতিরা বলছেন, বহুতল ভবনের ছাদগুলোকে দুর্যোগ-আশ্রয় এলাকা (ডিজাস্টার রিফিউজ এরিয়া) হিসেবে ব্যবহার করা যায়। সেখান থেকে হেলিকপ্টার বা অন্য কোনোভাবে বাসিন্দাদের উদ্ধার করা যায়। ফলে সেটি উন্মুক্ত রাখা কিংবা ছাদবাগান বানানোর জন্যই উপযুক্ত। ২০২০ সালে বিশ্বব্যাংকের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, ছাদে উদ্ভিদের উপস্থিতি বাইরে থেকে ভবনের ভেতরে তাপ প্রবেশে বাধা দেয়।

তাই স্বল্প পরিমাণ তাপ ভবনে প্রবেশ করে। এ কারণে জ্বালানির (বিদ্যুৎ) ব্যবহার কমে এবং ভবনের বাসিন্দাদের জন্য আরামদায়ক পরিবেশ তৈরি হয়। নানা বাস্তব বিবেচনায় ভবনের ছাদ উন্মুক্ত রাখা কিংবা সবুজ বাগান গড়ে তোলা জরুরি। ছাদে রেস্তোরাঁ নয়, ছাদ-বাগান করার জন্য সামাজিক সচেতনতা বাড়ানোর বিকল্প নেই।

×