
ঈদের আগে জনকণ্ঠে প্রকাশিত শেষ লেখায় বলেছিলাম, ‘শত্রুমিত্র ভেদাভেদ ভুলে সবার সঙ্গে মিলে মহান হয়ে ওঠার, বলা ভালো মানুষ হয়ে ওঠার বড় সুযোগ সামনে এনে দেয় ঈদ। অথচ আমরা এ দিকটিতে কী সহজে উপেক্ষা করে যাই। নিজেকে বিলিয়ে দেওয়ার গভীর আনন্দ-আহ্বান এড়িয়ে যাই। যদি তা না যেতাম, তাহলে আমরা নিশ্চয়ই ঈদের দিনটিকে পরমানন্দের দিবস করে তুলতে পারতাম। এবারের ঈদে কি আমরা এদিকটি বিবেচনা করে দেখব?’ বাস্তবতা হলো, হৃদয়বান বিবেকবান মানুষের অভাব নেই আমাদের সমাজে। অভাব কেবল উদ্যোগ গ্রহণের। সদিচ্ছা বাস্তবায়নের। নিজেকে সক্রিয় ও অঙ্গীকারবদ্ধ করে তোলায়।
তিনদিনের ছুটি শেষে বুধবার যথারীতি আমরা অফিস করছি পরদিন সকালে পাঠকের হাতে সংবাদপত্র তুলে দিতে। বসে গেছি কলাম লিখতে। যথারীতি ঈদের দিন সকালে জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠান নিটোরে (পঙ্গু হাসপাতাল হিসেবে পরিচিত) গিয়েছিলাম। দিনভর সেখানেই ছিলাম। জরুরি বিভাগের ফটকে নেমে রোগীদের জন্য আনা দুপুরের খাবারের প্যাকেটগুলো নামিয়ে ইএফ ওয়ার্ডের নার্সিং স্টেশনে কর্মরত একজন নার্সকে ফোন করি। তিনি জানান, মহিলা কর্মী ক্যান্সারে আক্রান্ত, অন্যদিকে ওয়ার্ডবয় আসেনি। ওপর থেকে সহযোগিতা পাব না বুঝে নিচের ওয়ার্ডবয়ের সন্ধান করি খাবারের প্যাকেটগুলো তিনতলার ওয়ার্ডে পৌঁছে দেওয়ার জন্য। যা হোক, ভাগ্য ভালো বলতে হবে। একজনকে পেয়ে গেলাম। সমস্যার সমাধান হলো। এদিকে একজন টিভি ক্যামেরাম্যান ছুটে এসে বললেন, এসব খাবার কি অমুক রাজনৈতিক দলের? হাসলাম। এখানে এসে কুড়ি-ত্রিশজন লোককে গেটের বাইরে দেখেছি নেতার জন্য অপেক্ষা করতে। তিন-চারটে টিভি ক্যামেরাও প্রস্তুত। লোকদেখানো কিছু ব্যাপার-স্যাপার হবে বলেই অনুমান করলাম। রোগীর সঙ্গে ফটোসেশন হবে। বক্তৃতা হবে। মূল লক্ষ্য হলো প্রচার। সেজন্য টিভি ক্যামেরাম্যানদেরও ম্যানেজ করা হয়েছে ঈদের দিন সকাল সকাল। পুরোটাই একটা চক্র। এই চক্র যদি পঙ্গু হাসপাতালের অন্তত ২০ জনের সম্পূর্ণ দায়িত্ব গ্রহণ করত, তাহলে সত্যিকারের একটা কাজের কাজ হতো। আমাদের রাজনীতি ও সমাজ যতদিন সাধারণ মানুষের কষ্ট লাঘবের, দুস্থ রোগীদের কল্যাণে শতভাগ নিবেদিত না হবে, ততদিন কিছু মানুষ আঙুল ফুলে তাল গাছ হবেই।
ঈদের দিন সড়ক দুর্ঘটনা ঘটবে, এটি যেন অবধারিত। আমি পঙ্গু হাসপাতালের যে ওয়ার্ডে ছিলাম (ইএফ) সেখানে প্রতি বছরই দেখি সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে দুই-পাঁচজন ভর্তি হয়েছেন। এবার বিকেল হওয়ার আগেই চলে এলেন দুই তরুণ, তারা পৃথক দুটি মোটরবাইক দুর্ঘটনার শিকার। ঈদের দিন ফাঁকা রাস্তায় বেপরোয়া গতিতে বাইক চালানো যেন বহু তরুণ-যুবার কাছে নেশার মতো। ফলে দু-চারজনের ধরণীতল নির্ধারিত।
ইএফ নামের ওয়ার্ডে বর্তমান রোগীর সংখ্যা ৭০ জন। পাশাপাশি দুটি সুবিশাল কক্ষ মিলে একটি ওয়ার্ড। এটিকে এখন ইনফেকশন ওয়ার্ড করা হয়েছে। পুরোটাই ফ্রি বেডের ওয়ার্ড। হাড় ভাঙা রোগীদের নানা কারণে চোটের স্থানে ইনফেকশন হয়। কারো কারো পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে যে অঙ্গহানির আশঙ্কা দেখা দেয়। গত কয়েক বছর যেমন মনে হয়েছিল সড়ক দুর্ঘটনা বেশ বেড়ে গেছে। ঈদের দিন মোটরবাইকে একের পর এক দুর্ঘটনা ঘটছে, এবার কি পরিস্থিতির উন্নতি হলো? নাকি অনেক রোগী এখন চলে যাচ্ছেন প্রাইভেট ক্লিনিকে। দুস্থ রোগীদের অবশ্য বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার সামর্থ্য নেই। তাই চিকিৎসা বিলম্বিত হলেও তারা বাধ্য হয়েই পঙ্গু হাসপাতালে চিকিৎসা গ্রহণ করেন। বলা দরকার, হাসপাতালের নতুন ভবনটি বেশ পরিপাটি। রোগীদের হাসপাতালবাস অতটা চাপাচাপির দশায় নেই। পুরনো ভবনটায় আগের মতোই রোগীদের বাহুল্য এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার সংকট রয়েছে।
আমরা তো জানিই, ঈদের দিনেও ঈদ করার পুরো সুযোগ বা অবকাশ হয় না বহু মানুষের। কেননা, ঈদের দিনও তাদের পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে হয়। একজন গৃহিণীও ঈদের দিন কম অবকাশ পান। তিনিও দিনভর থাকেন ব্যস্ত। তবু রান্না-বান্না, আপ্যায়নের মাঝেও ঈদের আনন্দ উঁকি দিয়ে যায়। অন্যদের আনন্দে আনন্দিত থাকার মতো মানুষ পরিবারে সবার আগে ওই গৃহিণী বা মা-ই। যা হোক, হাসপাতালেও ঈদ আসে। কিন্তু ঈদের আনন্দ স্পর্শ করে না পীড়িত ব্যক্তি ও তার পাশে থাকা স্বজনদের।
এক দশক ধরে রোজার ঈদে পঙ্গু হাসপাতালে যাওয়া নিয়ম করে ফেলেছি। করোনাকালে কোনো রেস্টুরেন্ট অর্ডার না নেওয়ায় একবার বাসায় তৈরি দুপুরের খাবার নিয়ে গিয়েছিলাম রোগীদের জন্য। এবার অর্ডার দিই। ঈদের দিন অর্ডার পাওয়া সহজ নয়। দিনভর পঙ্গু হাসপাতালে কাটিয়ে মনে হলো, বিত্তহীন, খেটেখাওয়া মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় সাময়িকভাবে পঙ্গু হয়ে পড়লে পুরো পরিবারটিই অনেকটা পথে বসে যায়। তাদের পাশে দাঁড়াবার তেমন কেউই থাকে না। এত সামাজিক, রাজনৈতিক সংগঠন। তবু হঠাৎ বিপদে পড়া একটি পরিবারের পাশে কাউকে পাওয়া যায় না। এমনকি দুর্ঘটনার জন্য যারা দায়ী তারাও চিকিৎসার ব্যয় বহনে এগিয়ে আসে না। তাদের বাধ্যও করা যায় না। আমাদের সমাজ কি আগে এমনটা ছিল? তবে ভালো লাগলো দেখে যে, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় রোগীদের চিকিৎসা ব্যয়ের জন্য এককালীন দুই হাজার টাকা প্রদান করে থাকে। সেজন্যে রোগীকে নির্ধারিত ফর্মে আবেদন করতে হয়। অবশ্য অনেক রোগীই এটা জানেন না। নার্স ও ওয়ার্ড বয়দের থেকে তথ্য পেয়ে আর্থিক সাহায্যের জন্য আবেদন করেন। এবার স্বেচ্ছায় একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের এক ডিরেক্টর বিকেলের দিকে এসেছিলেন দুয়েকজনকে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার অভিপ্রায়ে। মূলত পঙ্গু শিশুদের মায়েদের সঙ্গে কথা বলতে। কৃতজ্ঞতা জানাই তাকে।
পঙ্গু হাসপাতালে মূলত বিত্তহীন, দুস্থ রোগীদেরই প্রাধান্য। কোনো না কোনো দুর্ঘটনায় সাময়িকভাবে পঙ্গু হয়েই রোগীরা আসেন পঙ্গু হাসপাতালে। সাত-আট বছর আগে দেখেছি বাস-মিনিবাস ছিল দুর্ঘটনার প্রধান একটি কারণ। এ থেকে সমাজ বাস্তবতাও বোঝা যায়। বাস-মিনিবাসের চালকদের অনিয়ম, নেশা করে গাড়ি চালনা, অনেক ক্ষেত্রে লাইসেন্সবিহীন কিংবা যথাযথ প্রশিক্ষণ না থাকা চালকের গাড়ি চালানোসহ অনেক কথাই আমরা হাজারবার শুনেছি। এর কোনোটিই যে অসত্য, এমনও নয়।
পঙ্গু হাসপাতালে থাকতে কিংবা রোগীর সেবা করতে কারই বা ভালো লাগে। আর হাড়ভাঙা রোগের চিকিৎসা দীর্ঘকাল ধরে করা হয়। অনেক সময় অনেকটা অনিশ্চয়তাও থাকে। রংপুরের সাইফুল, বরিশালের আগৈলঝরার সৌরভ জয়ধর, ময়মনসিংহের নান্দাইলের রিয়াদÑ এমন দু’চারজনই শুধু নয়, সবারই দুর্ঘটনার গল্প অত্যন্ত করুণ। শুনতে শুনতে চোখে পানি এসে যায়। সুচিকিৎসা না পেলে তাদের কারো কারো আগামী জীবন অনেকটা পঙ্গু দশায় কাটার ঝুঁকি রয়েছে, বুঝতে পেরে মনটা দমে যায়। আমার মজার মজার কথায় সাময়িক আনন্দিত হলেও কিছুক্ষণ পরেই তাদের চোখেমুখে লক্ষ্য করেছি অনিশ্চয়তা আর হতাশা। আমার যৎসামান্য আর্থিক সহায়তায় সবচেয়ে দুস্থ রোগীদের আর কতখানি উপকার হবে?
দরিদ্র রোগীর সুচিকিৎসা নিশ্চিত করা চাই। যার পা কেটে ফেলতে হয়েছে তার কৃত্রিম পা সংযোজনের ব্যবস্থা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষই নেবে, এমনটা নাও হতে পারে। এক্ষেত্রে স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান, বিত্তবান ব্যক্তিদের এগিয়ে আসা জরুরি। গণমাধ্যমের বন্ধুদের কাছে অনুরোধ থাকবে, দুস্থ রোগীদের নিয়ে প্রতিবেদন করুন। মানুষের হৃদয় স্পর্শ করে এমনভাবে সার্বিক বিবরণ তুলে ধরুন। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি যদি দুর্ঘটনায় পতিত হয়ে পঙ্গু হাসপাতালে মাসের পর মাস পড়ে থাকেন, তাহলে তার পুরো পরিবার বিপন্ন হয়ে পড়ে। সেই বিপর্যস্ত অর্থকষ্টে জর্জরিত পরিবারের পাশে সরকার এসে দাঁড়াবে, এই ভাবনায় আটকে না থেকে বড় বড় করপোরেট হাউস, ব্যংকগুলোর সামাজিক দায়িত্ব পালনের (সিএসআর) ফান্ডের যাতে সদ্ব্যবহার হতে পারে, সেই উদ্যোগ নেওয়া চাই। শ্রমিকদের সংগঠনের অভাব নেই। একজন শ্রমিক কারখানায় কাজ করতে গিয়ে দুর্ঘটনাগ্রস্ত হলে ওই কারখানার মালিকপক্ষের কাছ থেকে রোগীর চিকিৎসা ব্যয় আদায় করা যায়। একইভাবে যে-ট্রাক এসে ধাক্কা বা চাপা দিয়ে কোনো ব্যক্তির অঙ্গহানি ঘটাচ্ছে, সেই ট্রাক মালিকের কাছ থেকে একইভাবে খরচ আদায় করা যায়। আমাদের দেশে এখনো দুর্ঘটনা ঘটানো বাস বা ট্রাকচালককে যথাযথ শাস্তি প্রদানের উদ্যোগ গড়ে ওঠেনি। আইনের বহু ফাঁকফোকর আছে, আছে নীতিহীন পুলিশের তৎপরতা। তাই প্রকৃত ভুক্তভোগী ক্ষতির শিকার হন। এক্ষেত্রেও সামাজিক রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর করণীয় রয়েছে। বিপন্ন মানুষকে বাঁচাতে হবে আগে। তার পরিবারের পাশে দাঁড়াতে হবে। তা না হলে এসব স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এবং রাজনৈতিক দলের উপযোগিতা কিভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে?
লেখক : সাহিত্যিক ও সাংবাদিক
[email protected]