
আরবীতে একটা কথা আছে : ‘আল কিজবু উম্মুল খাবায়িছ’- মিথ্যাচার সকল নোংরামির মূল। নিজের কথা ও কাজে অসত্য, কপটতা ও প্রতারণার আশ্রয় নেওয়াই মিথ্যাচার। আজকের সমাজে ব্যাধিটি বেশ ব্যাপক আকারে ধারণ করেছে। কথা-বার্তা লেনদেন, ব্যবসা-বাণিজ্য, চাকরি-বাকরি কোথায় নেই মিথ্যাচার? এমনকি রাজনৈতিক মঞ্চগুলোও এখন বহুলাংশে মিথ্যাচারে দূষিত হয়ে পড়েছে।
নিজে অহরহ মিথ্যা বলা অন্যের ওপর মিথ্যা আরোপ করা যেন আজকাল সাধারণ ব্যাপার এবং যুগের ফ্যাশন হয়ে দাঁড়িয়েছে। সমাজে পরস্পর কাদা ছোড়াছুঁড়ি, অন্যকে যে কোনোভাবে ঘায়েল করার প্রাণান্তর চেষ্টায় মিথ্যা অন্যতম হাতিয়ার। সর্বস্তরের নৈতিক অধঃপতনের কারণেই এ অবস্থা। এটি রীতিমতো উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার কারণও বটে। একথা ঠিক যে, মিথ্যাচারের বেসাতি কখনো স্থায়ী হয় না। মিথ্যুক বা মিথ্যাচারী ব্যক্তি তার অজান্তেই সমাজচ্যুত হয়ে পড়ে; হাস্যকর ও ব্যক্তিত্বহীন হয়ে পড়ে। আর ধর্মীয় অভিসম্পাত তার ওপর তো আছেই। ইসলাম ধর্ম মিথ্যাচারকে অন্যতম মুনাফিকী চরিত্র হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
হুজুর (স.) ইরশাদ ফরমায়েছেনÑমুনাফিকের চিহ্ন তিনটি। (১) যখন কথা বলে মিথ্যাই বলে (২) যখন ওয়াদা করে খিলাফ করে। (৩) আর যখন তার কাছে কোনো আমানত রাখা হয় তা সে খিয়ানত করে। কুরআনুল কারীমে মুনাফিকদের ব্যাপারে বলা হয়েছে : ‘ইন্নাল মুনাফিকীনা লাক-জীবুন-মুনাফিকরা মাত্রই মিথ্যাবাদী।’Ñ (সূরা মুনাফিকুন, আয়াত ১)। আর ‘ইন্নাল মুনা-ফিকীনা ফিদ্দারকিল আসফালিন মিনান্না-র’ অর্থাৎ নিশ্চয়ই মুনাফিকদের স্থান জাহান্নামের সর্বনিম্ন গহবরে।’Ñ ( সূরা নিসা, আয়াত ১৪৫)।
বলাবাহুল্য, মানব সমাজের সদস্যদের মাঝে বিদ্যমান পারস্পরিক সম্পর্কই হচ্ছে মানব সমাজের ভিত্তি। এ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয় কথা বলার মাধ্যমে। সত্য কথা মানুষের কাছে প্রকৃত তথ্যকে প্রকাশ করে থাকে। তাই তা সমাজের গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভসমূহের অন্যতম। ক্রমাগত সত্য চর্চার মাধ্যমে পারস্পরিক বিশ্বাসের ভিত্তি হয় সুদৃঢ় ও মজবুত। এর দ্বারা আসে আত্মিক প্রশান্তিও। আমীরুল মু’মেনীন হযরত আলী (রাদি.) ইরশাদ করেছেন : ‘প্রকৃত মুসলমান ঐ ব্যক্তি যে নিজের অপকার হলেও, বাহ্যত উপকারী মিথ্যার ওপর সত্যকে প্রাধান্য দেয় আর ঐ প্রাধান্যের মাধ্যমে আত্মিক প্রশান্তি লাভ করে।’
বস্তুত মিথ্যাবাদী মানব সমাজের পহেলা নম্বর দুশমন। অপরাধ আর অনিষ্টতা লালন করে মিথ্যা। মিথ্যাচার মানুষকে নেশাজাত দ্রব্যের মতো উম্মাদ করে তোলে। তার মাঝে ভালো মন্দের পার্থক্যকারী বিবেক লোপ ঘটায়। এ জন্য পবিত্র ইসলাম ধর্ম মিথ্যাকে একটি কবিরাহ গুনাহ বা জঘন্যতম পাপ হিসেবে গণ্য করে এবং মিথ্যাবাদীর কোনো ধর্মীয় বৈশিষ্ট্য রয়েছে বলে স্বীকার করে না।
প্রিয় নবী ইসলামের মহান পয়গাম্বর হুজুরে আকরাম (স.) এর হাদিস থেকে জানা যায় যে, ‘মিথ্যাবাদী, প্রতিশ্রুতি ভঙ্গকারী ও আমানতের খিয়ানতকারীÑ এ তিন প্রকারের লোক মুনাফিক বা কপট, যদিও তারা নামাজ পড়ে আর যদিও তারা রোজা রাখে।’ হুজুর (স.) এর জামাতা ও চতুর্থ খলিফা আলীর (র. ওয়াজ.) এ প্রসঙ্গে বলেছেন; ‘মানুষ তার ঈমানের স্বাদ তখনই আস্বাদন করতে পারে যখন সে ঠাট্টার ছলে হলেও মিথ্যা বলা পরিত্যাগ করে।’ একদিনকার ঘটনা। দরবারে নবুয়াতে হুজুর (স.) বসা। এমন সময় অনুশোচনায় সিক্ত এক লোক এসে আরজ করলেন : ওহে আখেরী জামানার পয়গাম্বর (স.) আমাকে দয়া করে বলুন, আমি ব্যক্তিগতভাবে বেশ খারাপ প্রকৃতির লোক। (এই যেমন) চুরি করি, মিথ্যা বলি, আমানতের খিয়ানত করি। আমি ক্রমাগত সংশোধন হওয়ার উদ্দেশ্যে কোন অভ্যাসটি আগেই ত্যাগ করব? হুজুর (স.) তাকে পরামর্শ দিলেন, ‘তুমি সর্বাগ্রে মিথ্যা বলা ছেড়ে দাও।’ লোকটি তাই করলেন। এতে দেখা গেল মিথ্যার আশ্রয় না নিয়ে চুরি ডাকাতি অগাইরা অন্যায় কাজ কোনোটাই করা যায় না। তাই মিথ্যা পরিত্যাগের মাধ্যমে প্রকারান্তরে যেন তার সব খারাপ অভ্যাসই পরিত্যাগ হলো এবং তিনি পরিণত হলেন এক সৎ মানুষে।
এমনিভাবে মিথ্যা শুধু শরীয়তের দৃষ্টিতেই গুনাহ ও খারাপ কাজ বলে পরিগণিত নয়, বরং বিবেকের দৃষ্টিতেও মিথ্যার অবৈধতা ও অপকারিতা খুবই সুস্পষ্ট। এ অসৎ অভ্যাসের প্রচলনে ক্রমাগত ‘আস্থা’ হয় বিদূরিত এবং সমাজের লোকেরা একে অন্যের প্রতি উদ্বিগ্ন ও বিশ্বাসহারা হয়ে পড়ে। সেই বিখ্যাত বাঘের কেচ্ছার মতো। এক রাখাল নাকি প্রায় সময় চিৎকার করতো, ‘আমাকে বাঘে ধরেছে আমাকে বাঘে ধরেছে বলে’। মানুষ তাকে উদ্ধার করার জন্য দৌড়ে যেত। কিন্তু তখন তারা দেখতো আসলে বাঘ টাগ কিচ্ছু নয়, সে এমনিতে মানুষকে ধোঁকা দিয়েছে। প্রতারিত করে একটি হাস্যকর পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। আর যখনই সত্যি সত্যি একদিন তাকে বাঘ আক্রমণ করল, সে চিৎকার করে তাকে বাঁচানোর আহাজারি করছিল, তখন গাঁয়ের কোনো লোকই তড়িঘড়ি তাকে উদ্ধার করতে আসেনি। তাদের পূর্ব থেকে বদ্ধমূল ধারণা হয়েছিল যে, সে এভাবে তো প্রায়ই মিথ্যা বলে থাকে। এজন্যই হয়তো বলা হয়েছে : ‘সত্য মানুষকে নাজাত দেয় আর মিথ্যা দেয় ধ্বংস-।’
সুতরাং যে কোনো সমাজকে সুন্দর ও স্থিতিশীল করতে হলে চাই পারস্পরিক বিশ্বাস ও ভালোবাসা। আর বিশ্বাস ও ভালোবাসার উন্মেষ ঘটানোর জন্য প্রয়োজন মিথ্যাচার, প্রতারণা ও ভ্রান্তি পরিহার করে সত্য ও হক, ন্যায় ও ইনসাফের চর্চা সুনিশ্চিত করা। মনে রাখতে হবে, মিথ্যা মিথ্যাই। তা যত শক্তিশালী হোক না কেন এক সময় তা মিথ্যা হিসেবেই প্রমাণিত হয়ে ডাস্টবিনে নিক্ষিপ্ত হবে। আর সত্য চিরদিন উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর হবে। এটাকে চিরদিন ঢেকে রাখার কোনো সুযোগ নেই। আমরা দেখি, অনেক মহামনীষী তাঁদের জীবদ্দশায় কায়েমী স্বার্থবাদীদের হাতে লাঞ্ছিত হয়েছেন, অপমানিত হয়েছেন, তাদের কালজয়ী অবদান উপেক্ষিত হয়েছে। কিন্তু পরবর্তী যুগ ও জাতি তাদের যথার্থই মূল্যায়ন করেছে। তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতাও প্রকাশ করেছে।
যে সব নবী রাসূলগণ যুগে যুগে চির সত্যের পয়গাম নিয়ে এসেছিলেন, তাঁরা চির অমর হয়েই আছেন। আর, যারা তাদের সঙ্গে দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয়েছে, সত্যটিকে গলা টিপে হত্যা করতে চেয়েছে, ফেরাউন, হামান, নমরুদ, আবুজাহল, আবু লাহাবরাই ধূলিসাৎ হয়েছে। ইতিহাস থেকে এ শিক্ষা নিয়ে আমরা সংযত হই না; শুধু মিথ্যা আশা-নিরাশার ফানুসে উড়ে বেড়াই স্বার্থান্ধ লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে। মিথ্যাচার চরিত্রের এক কলুষিত দিক। মিথ্যাচারী ক্রমেই অন্যের আস্থা ও বিশ্বাস হারায়।
লেখক : অধ্যাপক, টিভি উপস্থাপক ও জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত খতিব
[email protected]