
চলতি বছর ১৩ মার্চ যশোরের একটি রাষ্ট্রায়ত্ত মুরগির খামারে শনাক্ত হয়েছে বার্ড ফ্লু। সাত বছর পর শনাক্তকৃত ভাইরাসটির নাম এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা টাইপ-এ। খামারে এই ফ্লু-এর প্রাদুর্ভাবে তিন হাজার ৯৭৮টি মুরগির মধ্যে এক হাজার ৯০০টি মারা গেছে। ফ্লু যেন ছড়িয়ে না পড়ে, সেজন্য বাকি মুরগি মেরে ফেলা হয়েছে। যশোরসহ সারাদেশের খামারিদের মাঝে উদ্বেগ বেড়েছে এতে। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা যশোরের খামারটি পরিদর্শন করে কীভাবে বাংলাদেশে ফ্লুটি এসেছে তার বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করেছেন। অপরদিকে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় বলছে, বার্ড ফ্লু বিস্তার রোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা পরিস্থিতির নিবিড় পর্যবেক্ষণ করছেন। রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক বলেছেন, যশোরে মুরগির খামারে বার্ড ফ্লু শনাক্তের বিষয়টি তারা জানেন না।
ওয়ার্ল্ড অর্গানাইজেশন ফর অ্যানিমাল হেলথের বরাত দিয়ে রয়টার্স বলেছে, ২০০৭ সালের মার্চে বাংলাদেশে প্রথম বার্ড ফ্লু দেখা দেয়। ওই সময় প্রায় ৩৭০টি খামার বন্ধ হয়ে যায় এবং ১০ লাখেরও বেশি মুরগি মেরে ফেলা হয় ফ্লুর কারণে। আর্থিকভাবে পোল্ট্রি শিল্প ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ২০১৩ সালে আবারও বার্ড ফ্লুর প্রাদুর্ভাব ঘটে। তবে সেবছর বড় কোনো ক্ষতি হয়নি। ২০১৭ সালের শেষের দিকে আবারও বেশ কিছু এলাকায় বার্ড ফ্লু দেখা দেয়। সে বছর প্রায় ৫০ লাখ মুরগি মেরে ফেলা হয় এবং অনেক খামার বন্ধ হয়ে যায়। বেশ কিছু খামারি ক্ষতিগ্রস্ত হন। সর্বশেষ, ২০১৮ সালে বাংলাদেশে বার্ড ফ্লু শনাক্ত হয়। বাংলাদেশে মানুষের শরীরে সর্বপ্রথম ২০০৮ সালের মে মাসে বার্ড ফ্লু সংক্রমণ ধরা পড়ে। আন্তর্জাতিক এ গণমাধ্যম আরও বলছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বব্যাপী বার্ড ফ্লু ছড়িয়ে পড়ায় কয়েক মিলিয়ন হাঁস-মুরগি মারা গেছে। দেখা দিয়েছে ডিম ও মাংসের সংকট। ইউরোপ জুড়েও এর সংক্রমণ দেখা দিয়েছে। চীনে বার্ড ফ্লু সংক্রমণে মানুষের মৃত্যুও ঘটেছে। যার পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বিশ্বের সব দেশকে অতি সতর্কতা অবলম্বনের জরুরি বার্তা দিয়েছে। কোথাও এটি ধরা পরলেই তা তাদের জানানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
দেশের প্রান্তিক খামারিরা বহু বছর থেকেই নানা কারণে বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের মুখে আছে। সরকার যদি বার্ড ফ্লুর বিস্তার রোধে যথাযথ পদক্ষেপ না নেয়, তবে দেশের সম্ভাবনাময় পোল্ট্রি খাত বিপর্যয়ের মুখে পড়বে। আরও খামার বন্ধ হয়ে যাবে। খামারিদের আর্থিক ক্ষতি আশঙ্কাজনকভাবে বাড়বে। বার্ড ফ্লুর নতুন প্রাদুর্ভাবে দেশের অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। পোল্ট্রি শিল্প বাঁচাতে, স্থানীয় প্রশাসনকে কঠোর নজরদারি প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যাতে কোনো অসাধু ব্যবসায়ী রোগাক্রান্ত মুরগি বাজারে বিক্রি করতে না পারে।
আশঙ্কার বিষয় হলো, নিকট অতীতে মানুষের শরীরেও বার্ড ফ্লু শনাক্ত হয়েছে। প্রাণী এবং মানবকুল কেউই নিরাপদ নয় এ থেকে। সেক্ষেত্রে স্বাস্থ্যঝুঁকি কমাতে কঠোর নজরদারির সঙ্গে সচেতনতাও বাড়াতে হবে। ত্বরিত গবেষণা এবং টিকাদান কর্মসূচি চালু করা প্রয়োজন। বাংলাদেশ পোল্ট্রি অ্যাসোসিয়েশন সরকারের কাছে একটি বিশেষ টাস্কফোর্স গঠনের দাবি জানিয়েছে আক্রান্ত অঞ্চলগুলো দ্রুত চিহ্নিত করে রোগ প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য। জরুরি পরিস্থিতিতে খামারিদের জন্য বিশেষ আর্থিক প্রণোদনা দেওয়াও জরুরি।