ঢাকা, বাংলাদেশ   শুক্রবার ০৪ এপ্রিল ২০২৫, ২১ চৈত্র ১৪৩১

বৃদ্ধাশ্রমের ঈদ : একাকিত্ব, বিষণ্নতা ও মানবিকতার আহ্বান!

মুহাম্মাদ রিফাত হোসেন

প্রকাশিত: ১৭:৩৮, ৩ এপ্রিল ২০২৫

বৃদ্ধাশ্রমের ঈদ : একাকিত্ব, বিষণ্নতা ও মানবিকতার আহ্বান!

ঈদ হলো মুসলিম সমাজে সবচেয়ে আনন্দের, অপেক্ষার এবং সবার মধ্যে ভালোবাসার বন্ধন সৃষ্টি করার দিন। ঈদ আসে সুখের বার্তা নিয়ে। ঈদ এমন একটি সময় যখন পুরো পরিবার একত্রিত হয়, আনন্দে মেতে ওঠে এবং পরস্পরের সঙ্গে ভালো সময় কাটায়। কিন্তু এই সময়টা কিছু মানুষের জন্য একেবারেই আলাদা। বিশেষত বৃদ্ধাশ্রমে অবস্থানকারী প্রবীণদের জন্য ঈদ আসে একাকিত্ব, বিষণ্নতা ও শোকের অনুভূতির সঙ্গে। যাদের জীবনের সোনালি সময়গুলো ছিল পরিবারের সঙ্গে, তাদের সেই প্রিয়জনদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ঈদ কাটাতে হয়।
ঈদ মানেই পরিবার, বন্ধু-বান্ধব এবং প্রিয়জনদের সঙ্গে সময় কাটানো। তবে বৃদ্ধাশ্রমে থাকা প্রবীণদের জন্য ঈদ আসে একাকিত্বের বেদনাকে আরও তীব্র করে। বৃদ্ধাশ্রমে বসবাসকারী প্রবীণদের জন্য ঈদ একটি মনব্যথার দিন হয়ে দাঁড়ায়। তারা সবাই নিজেদের পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন এবং তাদের মাঝে ঈদের আনন্দের অনুভূতি প্রায়ই অনুপস্থিত। ঈদের দিন যখন পরিবারের সদস্যরা একত্রিত হয়ে খুশি ও আনন্দে মেতে ওঠে, তখন বৃদ্ধাশ্রমের প্রবীণরা প্রিয়জনদের অভাব অনুভব করেন। তাদের চোখে থাকে দীর্ঘদিনের স্মৃতি, যখন তারা পরিবারের সঙ্গে ঈদ উদযাপন করতেন। তবে বর্তমানে তাদের সেই সম্পর্কগুলো অদৃশ্য এবং ঈদ তাদের কাছে একাকিত্বের প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়।
 পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে তারা যখন একটি অন্যরকম পরিবেশে ঈদ কাটান, তখন তাদের মনে ঘোরাফেরা করে একের পর এক প্রশ্ন: ‘আমার সন্তানরা কোথায়?’, ‘কেন তারা ঈদে আমার সঙ্গে থাকতে আসেনি?’Ñ এ ধরনের প্রশ্নগুলোর কোনো উত্তর থাকে না। এমন পরিস্থিতিতে বৃদ্ধাশ্রমের প্রায় সব প্রবীণই অনুভব করেন, তারা সমাজের একটি অবাঞ্ছিত অংশে পরিণত হয়েছেন। তাদের একাকিত্বের অনুভূতি আরও তীব্র হয়ে ওঠে। ঈদের দিন তাদের কাছে শুধু একটা আরেকটি সাধারণ দিন হয়ে দাঁড়ায়।
বৃদ্ধাশ্রমের ঈদ কেবল একাকিত্বের দিন নয়, এটি বিষণ্নতার দিনও। এই বিশেষ দিনে তারা শোকে পোড়েন, যেহেতু তারা নিজেদের পরিবার থেকে দূরে। অনেক প্রবীণ, যারা একসময় পরিবারের সঙ্গে ঈদ উদযাপন করতেন, আজ তাদের জীবন একটি একঘেয়ে অধ্যায়ে পরিণত হয়েছে। ঈদ উদযাপন করার কোনো উৎসাহ বা আনন্দ তারা আর অনুভব করেন না। তাদের চোখে তখন থাকে শুধু শূন্যতা, আর মনে এক কঠিন অভিমান। এ ছাড়া এমন অনেক প্রবীণ রয়েছেন যারা শারীরিকভাবে অসুস্থ বা বিধবা এবং তাদের পরিবারের সদস্যরা তাদের ঈদে সঙ্গ দেওয়ার জন্য আসে না। এ কারণে তাদের অনুভূতি আরও জটিল এবং বিষণ্ন হয়ে ওঠে।
বৃদ্ধাশ্রমগুলোতে সাধারণত ঈদ উপলক্ষে কিছু আয়োজন করা হয়। বিশেষ খাবারের ব্যবস্থা, নতুন জামাকাপড় দেওয়া, কিছু সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। তবে এসব আয়োজন প্রবীণদের আসল ঈদ আনন্দকে পূর্ণভাবে ফিরিয়ে দিতে পারে না। কারণ তারা জানেন যে, এই আয়োজনগুলো শুধু সেবামূলক। এখানে কোনো আন্তরিকতা বা পরিবারের কাছ থেকে পাওয়া ভালোবাসা নেই। তারা জানেন, যতই বিশেষ কিছু আয়োজন হোক, তাদের কাছে আসল আনন্দের উৎস হলো পরিবারের সান্নিধ্য এবং প্রিয়জনদের সঙ্গে ঈদ কাটানো। কিন্তু যখন সেই অভাব থাকে, তখন এসব আয়োজন কেবল শূন্যতার অনুভূতিকে আরও গভীর করে তোলে।আমরা যারা সমাজের অন্যান্য অংশে বাস করি, তাদের ওপর একটি বড় দায়িত্ব বর্তায়, বিশেষত ঈদের মতো দিনগুলোতে। পরিবার ও প্রিয়জনদের কাছ থেকে দূরে থাকা প্রবীণরা আমাদেরই সমাজের অংশ। তারা আমাদেরই পূর্বসূরি, যারা আজকের সমাজ গড়তে অবদান রেখেছেন। অনেক সময় আমরা ভুলে যাই যে, তারা দীর্ঘ সময় ধরে আমাদের সমাজে অবদান রেখেছেন। আর এখন তারা বৃদ্ধ বয়সে একাকিত্বের শিকার হচ্ছেন। বিশেষ করে ঈদের মতো গুরুত্বপূর্ণ সময়গুলোতে, সমাজের প্রত্যেকের উচিত তাদের পাশে দাঁড়ানো, তাদের সঙ্গে সময় কাটানো এবং তাদের অনুভূতিকে সম্মান জানানো। বৃদ্ধাশ্রমে বসবাসকারী এসব প্রবীণদের প্রতি যদি আমরা আরও মনোযোগী হতে পারি, যদি ঈদের সময় তাদের পাশে দাঁড়াতে পারি, তাদের সঙ্গে কিছু সময় কাটাতে পারি, তবে হয়তো আমরা তাদের হৃদয়ে একটু সুখ এবং শান্তি ফিরিয়ে আনতে পারব।
বৃদ্ধাশ্রমে থাকা প্রবীণদের ঈদের দিনটি অর্থপূর্ণ করতে আমাদের সহানুভূতি এবং ভালোবাসা প্রয়োজন। ঈদের সময় তাদের ভুলে যাওয়া কোনোভাবেই শোভনীয় নয়। আমাদের উচিত তাদের সঙ্গে সময় কাটানো, তাদের অনুভূতিগুলো শোনা এবং তাদের কাছে ঈদের কিছু আনন্দ নিয়ে যাওয়া। কখনো কখনো একটি ছোট ফোন কল বা শুভেচ্ছা বার্তা অনেক বড় পরিবর্তন এনে দিতে পারে। বৃদ্ধাশ্রমের প্রবীণরা আমাদের শেকড়, আমাদের অতীত। তাদের প্রতি সহানুভূতির মাধ্যমে আমরা আমাদের মানবিকতা এবং সামাজিক দায়িত্ব পূর্ণ করতে পারি।
বৃদ্ধাশ্রমে বসবাসকারী প্রবীণদের জন্য ঈদ আসলে একাকিত্ব, বিষণ্নতা এবং শূন্যতার দিন হয়ে দাঁড়ায়। আমরা যদি তাদের পাশে দাঁড়াতে পারি, যদি তাদের আমাদের ভালোবাসা এবং সহানুভূতির মাধ্যমে ঈদের আনন্দ দিতে পারি, তবে তাদের ঈদও হয়ে উঠতে পারে পূর্ণাঙ্গ ও অর্থপূর্ণ। ঈদ আমাদের সবার জন্য, তবে বিশেষভাবে তাদের জন্য যারা একা, যারা আমাদের সান্নিধ্য ও ভালোবাসার জন্য অপেক্ষা করছেন। অতএব, আসুন আমরা সবাই একত্রিত হয়ে ঈদের এই মহান সুযোগটি কাজে লাগাই এবং বৃদ্ধাশ্রমে থাকা প্রবীণদের পাশে দাঁড়িয়ে তাদের ঈদকে স্মরণীয় করে তুলতে সাহায্য করি।

শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ,
 জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা
[email protected]

×