
প্রখর মেধাবী ও বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারের অধিকারী ইউজিসির সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক কাজী শহীদুল্লাহ গত ১৯ মার্চ দুপুর ১টা ১৫ মিনিটে অস্ট্রেলিয়ার ক্যানবেরায় মেয়ের বাসায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন (ইন্না লিল্লাহি ... রাজিউন)। তিনি দীর্ঘদিন ধরে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসার জন্য অস্ট্রেলিয়ায় যাওয়া-আসার মধ্যে ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগ থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তরÑ উভয় পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করে ১৯৭৬ সালে একই বিভাগে লেকচারার হিসেবে যোগদান করে শুরু করেন কর্মজীবন। পরে তিনি ১৯৭৯ সালে ক্যানাডার ব্রিটিশ কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সেকেন্ড মাস্টারস ও ১৯৮৪ সালে ওয়েস্ট অস্ট্রেলিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। কর্মজীবনে তিনি বিভাগের চেয়ারম্যান, কলা অনুষদের টানা তিন মেয়াদের নির্বাচিত ডিন, সিনেট সদস্য, টানা দশ বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সদস্য ছিলেন। তিনি ২০০৯ থেকে ২০১৩ পর্যন্ত জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। দীর্ঘ ৪২ বছরের শিক্ষকতাসহ অন্যান্য দায়িত্ব পালনের পর তিনি ২০১৮ সালে অবসরে যান। অতঃপর অধ্যাপক কাজী শহিদুল্লাহ ২০১৯-২০২৪ পর্যন্ত ইউজিসির ১৩ তম চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
অনুকরণীয় ও ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষটি শিক্ষার্থী-শিক্ষক-সহকর্মীদের কাছে যেমন জনপ্রিয়, তেমনি দক্ষ প্রশাসক, বিশিষ্ট সংগঠক, দেশ ও সমাজ বিনির্মাণের কারিগর ছিলেন। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে মানসম্মত শিক্ষা ও গবেষণার পরিবেশ নিশ্চিতকরণ এবং আর্থিক ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বৃদ্ধির লক্ষ্যে বেশকিছু উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন। তার মৃত্যুতে জাতি একজন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, প্রথিতযশা ইতিহাসবিদ ও অভিভাবককে হারাল, যা পুরো শিক্ষা পরিবারের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি।
সহজ-সরল-সাদাসিধে জীবনযাপনে অভ্যস্ত কাজী শহীদুল্লাহ ছিলেন একজন সৎ, বিনয়ী, সদালাপী ও সজ্জন মানুষ। উচ্চবিত্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করলেও অহংকার কিংবা দম্ভ কোনোদিন তাকে যেমন স্পর্শ করতে পারেনি তেমনি মানুষের সঙ্গেও খারাপ আচরণ করেননি কোনো দিন। যারা কাজী শহিদুল্লাহ চেনেন, তারা বলবেন, তিনি ছিলেন আপদমস্তক একজন ভালো মানুষ। ক্ষমতার বলয়ের মধ্যে থাকা সত্ত্বেও কখনোই সেই পথে হাঁটেননি, বরং শিক্ষকতা পেশাকে সবকিছুর ঊর্ধ্বে তুলে ধরেছেন। সবসময় সাহস, সততা, নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সঙ্গে অর্পিত দায়িত্ব পালনে তৎপর ছিলেন।
এখন শহীদুল্লাহ স্যারের সঙ্গে আমার কিছু ব্যক্তিগত স্মৃতির কথা উল্লেখ করতে চাই। ইউজিসির সদস্য হিসেবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আদেশ প্রাপ্তির পর আমি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অবমুক্ত হয়ে করোনাকালীন ২ সেপ্টেম্বর ২০২০ ইউজিসিতে যোগদান করি। যোগদানের পরদিন আমিসহ অন্য নিয়োগপ্রাপ্ত সদস্য অধ্যাপক বিশ্বজিৎ চন্দ শহীদুল্লাহ স্যারের সঙ্গে দেখা করতে তার ধানমন্ডির বাসায় যাই। স্যার আমাদের ভাবির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। স্যারের দুই ছেলে ও এক মেয়ে সবাই অস্ট্রেলিয়ায় বসবাস করেন। এটাই ছিল স্যারের সঙ্গে আমার প্রথম সাক্ষাৎ। পরিচয় পর্ব শেষ হওয়ার পর ভাবিকে কোথায় দেখেছিলাম তা মনে মনে চিন্তা করছিলাম। সেই সময় ভাবি বলে উঠলেন, আমার বড় বোনকে দক্ষিণ চট্টগ্রামের জমিদার আহমদ কবির মিয়ার ছেলে নূর মিয়ার সঙ্গে বিয়ে দেওয়া হয়েছে। নূর মিয়া ছিলেন আমার আত্মীয়। সেই সুবাদে স্যার হেসে বলে উঠলেন, তাহের সাহেব আপনি আমার আত্মীয় হয়ে গেলেন। ইতোমধ্যে ইউজিসি সচিব মহোদয়কে নির্দেশ দিলেন, আমাকে অর্থ ও জনসংযোগ ডিভিশনের দায়িত্ব অর্পণ করার জন্য। স্যারের দিকনির্দেশনা ও তত্ত্বাবধানে উক্ত দুটো ডিভিশনের দায়িত্ব পালনে আমি সর্বোচ্চ সততা, নিষ্ঠা, আন্তরিকতার সঙ্গে চেষ্টা করেছি। বিশ্ববিদ্যালয়ে আর্থিক ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার জন্য স্যারের নেতৃত্বে আমি মনিটরিং ব্যবস্থাকে জোরদার করি। এমনকি ইউজিসিতে অনেক নতুন নীতিমালা প্রণয়ন ও আগের নীতিমালাগুলো সংশোধন করা হয়। আমার পরম সৌভাগ্য হয়েছিল স্যারের সান্নিধ্যে ও দিক নির্দেশনায় কাজ করার জন্য।
ইউজিসির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব শেষ হওয়ার পরও স্যার ও পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে আমার যোগাযোগ অব্যাহত ছিল। সর্বশেষ ৩ মার্চ আমার মেয়ে ওয়াসিফা তাবাসসুম এই বছর ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ থেকে অনার্সসহ এমবিবিএস পাস করার সংবাদটি জানানোর পর স্যার ভীষণ খুশি হয়েছিলেন এবং মেয়ের জন্য দোয়া করেছিলেন, আগামীতে সে যেন একজন ভালো ডাক্তার হয়ে দেশ ও জনগণের সেবা করতে পারে।
এটা সত্য যে, জন্ম-মৃত্যু নির্ধারিত। জাগতিক নিয়ম মেনে বর্ণিল এই পৃথিবী থেকে একদিন সবাইকে চলে যেতে হবে না ফেরার দেশে। অধ্যাপক কাজী শহীদুল্লাহ অত্যন্ত সৌভাগ্যবান এজন্য যে, তিনি পবিত্র রমজান মাসে মহান সৃষ্টিকর্তার ডাকে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে না ফেরার দেশে চলে গেছেন। রেখে গেছেন তার অগণিত শিক্ষার্থী-সহকর্মী-সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা, যাদের হৃদয়ে তিনি বেঁচে থাকবেন অনন্তকাল। আমরা স্যারের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা ও শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জ্ঞাপন করছি। এ শোক পরিবারের সদস্যরা যাতে বইতে পারে সেজন্য মহান সৃষ্টিকর্তার কাছে দোয়া করছি। একই সঙ্গে মহান সৃষ্টিকর্তার কাছে দোয়া ও প্রার্থনা করছি, পরম করুণাময় যেন অধ্যাপক কাজী শহিদুল্লাহকে জান্নাতুল ফেরদৌস দান করেন।
লেখক : অধ্যাপক, ম্যানেজমেন্ট বিভাগ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়