
সম্প্রতি প্রতিবেশী রাষ্ট্র মিয়ানমারে সংঘটিত প্রলয়ংকরী ভূমিকম্প বাংলাদেশের জন্য বয়ে এনেছে এক অশনি সংকেত। ক্রমশ ভূমিকম্পপ্রবণ হয়ে উঠছে বাংলাদেশ। মাঝেমধ্যেই ছোট ও মাঝারি মাত্রার ভূকম্পনে কেঁপে উঠছে দেশ। এসব ভূমিকম্পে তেমন ক্ষয়ক্ষতি না হলেও সামনে বড় মাত্রার ভূমিকম্পে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, সাম্প্রতিককালে একটির পর একটি স্বল্পমাত্রার ভূকম্পনের আঘাত ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে বড় ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে রয়েছে বাংলাদেশ। কোনো পূর্বাভাসের ব্যবস্থা না থাকায় মানুষের উদ্বেগও বাড়ছে। গত ১০ দিনে চার দফা ছোট থেকে মাঝারি আকারের যে ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে, প্রায় প্রতিটিরই উৎপত্তিস্থল ছিল দেশের সীমানার ভেতর বা আশপাশে। গত ৫ মার্চ বুধবারও রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা কেঁপে ওঠে ভূমিকম্পে। বেলা ১১টা ৩৬ মিনিটে এ ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্যমতে, মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পটির রিখটার স্কেলে মাত্রা ছিল ৫.৬। ভূমিকম্পে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো ক্ষতির তথ্য মেলেনি। যুক্তরাষ্ট্রের জিওলজিক্যাল সার্ভে (ইউএসজিএস) জানিয়েছে, ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ভারতের মণিপুরের রাজধানী ইম্ফলের ইয়ারিপক এলাকা। ভূমিকম্পটির গভীরতা ভূপৃষ্ঠ থেকে ১০ কিলোমিটার।
ভূমিকম্প নিয়ে তাত্ত্বিক আলোচনা
ভূমিকম্প সাধারণ অর্থে ভূমির কম্পনকে বোঝায়, যা ভূতত্ত্ব বা জিওলজি বিষয়ের অন্তর্গত বিশেষত বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে পাঠপঠনে ও গবেষণায়। এই বিষয়টির একটি টিকনিক্যাল রূপ রয়েছে যা সাধারণের কাছে একটি আতঙ্কের বিষয় হিসাবেই বেশি পরিচিত, যা আমাদের সমাজ জীবনকে অনেক ভাবনার মধ্যে আরও একটি ভাবনায় সংযোজিত করে থাকে। সর্বশেষ বৈজ্ঞানিক ভিত্তি অনুযায়ী, ভূমিকম্প হয় প্লেট টেকটোনিকের (চষধঃব ঞবপঃড়হরপ) সংঘর্ষের ফলে। পাশাপাশি দুটি মহাদেশীয় প্লেটের সীমান্ত অঞ্চলে যে প্রবল পীড়নের (ঝঃৎবংং/ঙঢ়ঢ়ৎবংংরড়হ) সৃষ্টি হয়, সেই পীড়ন যখন বড়সড় চ্যুতির (ঋধঁষ) সৃষ্টি করে এবং তার অন্তর্নিহিত শক্তি বের করে দেয়, তখন ভূমিকম্পের সৃষ্টি হয়। ভূপৃষ্ঠে বা ভূপৃষ্ঠের কাছাকাছি গভীরতায় বড় মাত্রার বিস্ফোরণ ঘটলে মৃদু থেকে মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পের উৎপত্তি হতে পারে। আগ্নেয়গিরির বিস্ফোরণ ও অগ্ন্যুৎপাতের সময়ও ভূমিকম্প সংঘটিত হয়। প্রায় এক ডজন ছোট-বড় অংশ নিয়ে ভূত্বক গঠিত। এই অংশগুলোকে প্লে¬ট টেকটনিক (চষধঃব ঞবপঃড়হরপ) বলে। এই প্লেটগুলো নিচের অশক্ত ম্যান্টলের ওপর ভাসতে থাকে এবং প্লেটগুলো একে অপরের সঙ্গে ঘষা খেতে থাকে। কখনো একটি প্লেট অপরটির ওপরে উঠে যায় কিংবা নিচে চলে যায়, যাকে অধোগামী অঞ্চল (ঝঁনফঁপঃরড়হ তড়হব) বলে। কোথাও আবার একে অপর থেকে দূরে সরে যায়, যাকে অপসারী অঞ্চল (ঝঢ়ৎবধফরহম তড়হব) বলে। কোনো স্থানে অতিরিক্ত খনিজ (গ্যাস, তেল ইত্যাদি) উত্তোলনের কারণে শিলার স্থিতিস্থাপকতা নষ্ট হয়ে ধ্বংসের সৃষ্টি হয়ে ভূমিকম্প দেখা দিতে পারে। ১৯৮৯ সালে অস্ট্রেলিয়ায় খনিজ উত্তোলনের কারণে নিউক্যাসল ভূমিকম্প এর উৎকৃষ্ট উদাহরণ। প্রাকৃতিকভাবেই কার্বন চক্রের প্রভাবে ভূমিকম্প হয়ে থাকে। বাংলাদেশেও এর ব্যত্যয় হয় না।
ভূমিকম্প নিয়ে গবেষণা
আবহাওয়া অধিদপ্তরের ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ ও গবেষণাকেন্দ্রের হিসাব অনুযায়ী, ২০১৭ সালে বাংলাদেশে এবং কাছাকাছি এলাকায় ২৮টি ভূমিকম্প হয়। ২০২৩ সালে এর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৪১টি এবং গত বছর ২০২৪ সালে দেশে ও আশপাশে ৫৩টি ভূমিকম্প হয়েছে। এটি ছিল আট বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মেহেদী আহমেদ আনসারী বলেন, ছোট ও মাঝারি ভূকম্পনে বড় শক্তি বের হওয়ার একটা প্রবণতার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। তার মানে, যে কোনো সময় একটি বড় ভূমিকম্প সংঘটিত হতে পারে। ৭ মাত্রার ভূমিকম্পগুলো ফেরত আসার একটি সময় হয়ে গেছে। তবে এই বড় ভূমিকম্প কবে হবে, সেটা নির্দিষ্ট করে বলা যায় না। গত বছর হওয়া ‘আরবান রেজিলিয়েন্স প্রজেক্ট : রাজউক অংশ’ শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় পরিচালিত এক গবেষণায় বলা হয়েছে, ঢাকায় ৭ মাত্রার ভূমিকম্প হলে রাজধানীর ৪০ শতাংশ বাড়িঘর ধ্বংস হয়ে যেতে পারে।
মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএসের তথ্যমতে, বাংলাদেশ ভূকম্পনের সক্রিয় এলাকায় অবস্থিত। দুর্যোগ সূচক অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী ভূমিকম্পের জন্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ২০টি শহরের মধ্যে রয়েছে ঢাকা। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ছোটখাটো কম্পন দেশের আরও শক্তিশালী ভূমিকম্পের আশঙ্কা নির্দেশ করে। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পর্যবেক্ষণাগারে ২০০৬ সালের জানুয়ারি থেকে ২০০৯ সালের মে মাসের মধ্যে ৪ মাত্রার ওপরে মোট ৮৬টি ভূমিকম্প রেকর্ড করা হয়েছে। এই ছোটখাটো কম্পনগুলো ভারী ভূমিকম্পের সম্ভাবনা নির্দেশ করে। বাংলাদেশ মূলত ভারত ও মিয়ানমারের ভূ-অভ্যন্তরের দুটি ভূ-চ্যুতির (ঋধঁষঃ খরহবং) প্রভাবে আন্দোলিত হয়। উল্লেখ্য, ভৌগোলিকভাবে বাংলাদেশ মূলত ভারতীয়, ইউরেশীয় ও মিয়ানমারের টেকটোনিক প্লেটের মধ্যে অবস্থান করছে। ভারতীয় ও ইউরেশীয় প্লেট দুটি দীর্ঘদিন যাবত হিমালয়ের পাদদেশে আটকা পড়ে আছে। অপেক্ষা করছে বড় ধরনের নড়াচড়া বা বড় ধরনের ভূকম্পনের। বাংলাদেশে আটটি ভূতাত্ত্বিক চ্যুতি এলাকা (ঋধঁষঃ তড়হব) সচল অবস্থায় রয়েছে। বৃহত্তর সিলেটের পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে অবস্থিত হালুয়াঘাট চ্যুতির ডাউকী চ্যুতি অংশ ও শাহজীবাজার চ্যুতি (আংশিক ডাউকি চ্যুতি) উল্লেখযোগ্য। যুক্তরাষ্ট্রের কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েক জন শিক্ষকের গবেষণায় তথ্য বলছে, সাম্প্রতিককালে বড় মাত্রার ভূমিকম্প না হলেও ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে সমূহ ঝুঁকিতে রয়েছে বাংলাদেশ। ইউএসজিএস জানিয়েছে, ভূমিকম্পের উৎপত্তি ছিলো মিয়ানমারের মাওলাইকে। এর মাত্রা ছিল ৫ দশমিক ৪। ভূমিকম্পের কেন্দ্রে এর গভীরতা ছিল ১০ কিলোমিটার। দেশের ১৩টি এলাকা ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে রয়েছে। ভূগর্ভস্থ ফাটল বা চ্যুতি থাকার কারণে ঐ কম্পন হতে পারে। সবচেয়ে তীব্র ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে রয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রামের তিনটি জেলা, সিলেটের জৈন্তাপুর এলাকা ও ঢাকার টাঙ্গাইল জেলা। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় উঠে এসেছে, টাঙ্গাইলের মধুপুর ফল্টে ৬.৯ মাত্রার ভূমিকম্প হলে ঢাকার ৮ লাখ ৬৪ হাজার ৬১৯টি থেকে ১৩ লাখ ৯১ হাজার ৬৮৫টি ভবন ধসে বা ভেঙে পড়বে, যা মোট ভবনের ৪০.২৮ থেকে ৬৪.৮৩ শতাংশ। যদি সিলেট লাইনমেন্টে ৭.১ মাত্রার ভূমিকম্প হয়, তাহলে ঢাকার ৪০ হাজার ৯৩৫টি থেকে ৩ লাখ ১৪ হাজার ৭৪২টি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হবে। যা মোট ভবন সংখ্যার ১.৯১ থেকে ১৪.৬৬ শতাংশ। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ রাজউকের আরবান রেজিলিয়েন্স প্রজেক্টের অধীনে পরিচালিত গবেষণায় এ তথ্য উঠে আসে, যা তুলে ধরেন রাজউকের প্রধান প্রকৌশলী এবং প্রকল্পের পরিচালক আবদুল লতিফ হেলালী। তিনি জানান, রাজউক এলাকার অধীনে ঢাকায় ২১ লাখ ৪৭ হাজার ২১৯টি ভবন রয়েছে, যার মধ্যে পাকা ভবন ৫ লাখ ১৩ হাজার ৫০৭টি। ৩ হাজার ২৫২টি (পাকা) ভবনের ওপর জরিপ পরিচালনা করা হয়। এগুলোর মধ্যে অতি-ঝুঁকিতে থাকা ৪২টি ভবন সম্পূর্ণ ভেঙে ফেলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। রাজউকের প্রধান প্রকৌশলী সতর্ক করে বলেন, মধুপুর ফল্টে যদি সকালের দিকে ৬.৯ মাত্রার ভূমিকম্প হয়, তাহলে ঢাকায় ২ লাখ ১০ হাজার থেকে ৩ লাখ ১০ হাজার মানুষ নিহত হবে। দুপুরে হলে ২ লাখ ৭০ হাজার থেকে ৪ লাখ এবং রাতে হলে ৩ লাখ ২০ হাজার থেকে ৫ লাখ মানুষ নিহত হবে। এদিকে, দেশের ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজধানীর ১০০ থেকে ২০০ কিলোমিটার দূরে সাত থেকে আট মাত্রার ভূমিকম্প হলে তীব্র কম্পন অনুভূত হতে পারে, যা এই শহরের দুর্বল ভবনগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। ঢাকার সম্প্রসারিত বা নতুন নতুন আবাসিক এলাকার মাটি নরম ও দুর্বল। এ ধরনের মাটিতে ইমারত নির্মাণ বিধিমালা না মেনে বহুতল ভবন হলে তা মাঝারি মাত্রার কম্পনেই ভেঙে পড়ার আশঙ্কা থাকে। লালমাটির এলাকায় যেসব এক থেকে তিনতলা ভবন নির্মিত হয়েছে, সেগুলোর ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে কম। ভূমিকম্পে মানুষের মৃত্যুর ৯০ শতাংশই হয় ভবন ধসে। বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এবং ভূমিকম্প গবেষক অধ্যাপক সৈয়দ হুমায়ুন আখতার গণমাধ্যমকে বলেন, বাংলাদেশের ভেতরে ১৩টি ভূগর্ভস্থ চ্যুতি রয়েছে। তবে এর সব কটি ঢাকা থেকে বেশ দূরে। কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রাম ও সিলেটে মাঝারি থেকে তীব্র ভূমিকম্প হলে ঢাকায় অনেক ভবন ভেঙে পড়তে পারে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের একজন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক বলেন, পার্বত্য সীমান্ত আর সিলেট অঞ্চলের ভূ-অভ্যন্তরে ৮ মাত্রার ভূমিকম্প সৃষ্টির মতো শক্তি সঞ্চিত হয়ে আছে। যেখানে ভূমিকম্প হলে সিলেট, চট্টগ্রাম, ঢাকা, ময়মনসিংহসহ জনবহুল শহরগুলোতে বড় বিপর্যয় নেমে আসতে পারে। ভূমিকম্পের সম্ভাব্য ঝুঁকি প্রশমনে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ ও সামাজিক সচেতনতা গড়ে তোলার ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, ঢাকা শহরে ৭ মাত্রার বেশি ভূমিকম্প হলে ৭২ হাজার ভবন তাৎক্ষণিকভাবে ধসে পড়বে। এতে ব্যাপক প্রাণহানি ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটবে। বিশেষজ্ঞরা ভূমিকম্পের সংখ্যা বেড়ে যাওয়া এবং বড় ভূমিকম্পের আশঙ্কা বেড়ে গেলেও তাকে মোকাবিলায় যথাযথ প্রস্তুতির অভাব আছে বলেই মনে করেন।
সরকার কর্তৃক গৃহীত কার্যক্রম
ভূমিকম্পের সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি কমানোর জন্য সরকার কর্তৃক ইতোমধ্যে বেশ কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় কর্তৃক ভূমিকম্পসহ সব দুর্যোগের সময় সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের করণীয় নির্ধারণ করে ‘দুর্যোগবিষয়ক স্থায়ী আদেশাবলি, ২০১৯ (ঝঃধহফরহম ঙৎফবৎং ড়হ উরংধংঃবৎ, ২০১৯)’ প্রণয়ন করা হয়েছে। এর অধীন দুর্যোগকালীন কার কী করণীয়, তা নিরূপণ করা হয়েছে। উক্ত নীতিমালার অধীন প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কাউন্সিল (ঘউগঈ) গঠন করা হয়েছে। উক্ত স্থায়ী আদেশাবলির অধীন মাঠপর্যায়ে ইউনিয়ন পরিষদের ওয়ার্ড পর্যন্ত অংশীজনের করণীয় নির্ধারণ করা হয়েছে এবং সে মোতাবেক কার্যক্রম চলমান রয়েছে। অধিকন্তু, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স, সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগের সমন্বয়ে জরুরি প্রতিক্রিয়া সংস্থাগুলোর জন্য জাতীয় কন্টিনজেন্সি প্ল্যান প্রস্তুত করা হয়েছে। তাছাড়া, বাংলাদেশ জাতীয় বিল্ডিং কোড (ইঘইঈ) অনুমোদন লাভ করেছে। ইতোমধ্যে ভূমিকম্প-পরবর্তী অনুসন্ধান ও উদ্ধার সরঞ্জাম ক্রয়পূর্বক সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কাছে হস্থান্তরের সিদ্ধান্ত হয়েছে। ভূমিকম্পের সম্ভাব্য ঝুঁকি প্রশমনে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ ও সামাজিক সচেতনতা গড়ে তোলা প্রয়োজন। ঢাকা শহরে ৭ মাত্রার বেশি ভূমিকম্প হলে ৭২ হাজার ভবন তাৎক্ষণিকভাবে ধসে পড়বে। এতে ব্যাপক প্রাণহানি ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটবে। বিশেষজ্ঞরা ভূমিকম্পের সংখ্যা বেড়ে যাওয়া এবং বড় ভূমিকম্পের আশঙ্কা বেড়ে গেলেও তাকে মোকাবিলায় যথাযথ প্রস্তুতির অভাব আছে বলেই মনে করেন। এখনো ভূমিকম্পের প্রস্তুতি ভূমিকম্প-পরবর্তী সম্ভাব্য উদ্ধার প্রস্তুতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ও সীমিত।
ভূমিকম্পের ক্ষতি নিরসনে কতিপয় বিবেচ্য
বিশেষজ্ঞরা অভিমত ব্যক্ত করেছেন, ভূমিকম্পের উৎসস্থল চিহ্নিত করা গেলে সেসব এলাকার ভবনগুলো ভূমিকম্প সহনশীল করে নির্মাণ করার নির্দেশ দেওয়াসহ সঙ্গে ফায়ার সার্ভিস, স্বেচ্ছাসেবক সংগঠনগুলোর লোকবল ও পর্যাপ্ত উদ্ধার যন্ত্রপাতি প্রস্তুত রাখার আগাম ব্যবস্থা করা যাবে। বড় ভূমিকম্পে ক্ষয়ক্ষতির নিরসনে বাড়ি নির্মাণের ক্ষেত্রে বিল্ডিং কোড মেনে চলতে হবে। যেমনÑ উচ্চতা ও লোডের হিসাব অনুযায়ী শক্ত ভিত দেওয়া, রিইনফোর্সড কংক্রিট ব্যবহার, এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়ি নিরাপদ দূরত্বে বাড়ি নির্মাণ, গ্যাস ও বিদ্যুৎ লাইন নিরাপদভাবে স্থাপন, নরম মাটি কিংবা গর্ততে ভবন নির্মাণ না করা, ঝুঁকিপূর্ণ ভবন সংস্কার কিংবা ভেঙে ফেলা ইত্যাদি। ভূমিকম্পের কোনো আগাম পূর্বাভাস পাওয়া যায় না, যা অন্যান্য প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের বেলায় সম্ভব হয়। তাই জনগণকে সম্পৃক্ত করে জনসচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে সীমিত সম্পদ ও ক্ষমতার আওতার মধ্যেই এ দুর্যোগ মোকাবিলার প্রস্তুতি সম্ভব। ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে পরিকল্পিত নগরায়ণ জরুরি। ঘনবসতিপূর্ণ ঢাকা শহরে ভূমিকম্প হলে মানবিক মহাবিপর্যয় ঘটবে, যা সহজেই অনুমেয়। ২০১৫ সালে নেপালে ভয়াবহ ভূমিকম্পের পর দেশে ‘ন্যাশনাল ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার’ স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও সেটি এখনো বাস্তবায়ন হয়নি। এর আগে বাংলাদেশে ফায়ার সার্ভিসের উদ্যোগে ভূমিকম্প মহড়া হলেও সেটি আর অব্যাহত নেই। এমনকি ন্যাশনাল ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেম (এনডিএমআইএস) নামে যে ওয়েবসাইট নির্মাণের সিদ্ধান্ত হয়েছিল, সেটিও হয়নি। এমন উদাসীনতার পরেও দেশটাকে সঠিকভাবে এগিয়ে নিতে হবে সরকারকেই। এজন্য প্রশাসনের সক্রিয় ভূমিক্রা জরুরি। প্রস্তাবিত ডিটেইল্ড এরিয়া প্ল্যান (ড্যাপ) যেন সঠিকভাবে বাস্তবায়ন হয়, সেটি নিশ্চিত করতে হবে। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) যথাযথ অনুমোদন নিয়ে স্থাপনা নির্মাণ হতে হবে। সঙ্গে সঙ্গে নাগরিক শিক্ষা ও মহড়াÑউভয়ই অত্যন্ত জরুরি।
লেখক : অধ্যাপক (অর্থনীতি), ও সাবেক ডিন (ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদ) ও সিন্ডিকেট সদস্য, সিটি ইউনিভার্সিটি, ঢাকা