ঢাকা, বাংলাদেশ   বৃহস্পতিবার ০৩ এপ্রিল ২০২৫, ২০ চৈত্র ১৪৩১

শুল্কমুক্ত চীনা বাজারে বাংলাদেশ

প্রজ্ঞা দাস

প্রকাশিত: ২০:০২, ২ এপ্রিল ২০২৫

শুল্কমুক্ত চীনা বাজারে বাংলাদেশ

বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য রপ্তানি খাতই মূল চালিকাশক্তি। কিন্তু বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা ও নানামুখী চ্যালেঞ্জের মুখে এই খাতের সম্প্রসারণ বাংলাদেশের জন্য সবসময়ই বড় একটি চ্যালেঞ্জ। এমন প্রেক্ষাপটে চীন কর্তৃক বাংলাদেশি পণ্যের জন্য শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত প্রবেশাধিকার প্রদান নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বিকাশের ধারাবাহিকতায় এক ঐতিহাসিক মাইলফলক। বিশ্ববাণিজ্যের জটিল ও প্রতিযোগিতামূলক কাঠামোর মধ্যে এ ধরনের সুবিধা শুধু রপ্তানির জন্য নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছে না, বরং বাংলাদেশের শিল্প, বিনিয়োগ ও কৌশলগত বাণিজ্য নীতিকে দিচ্ছে নতুন মাত্রা। তবে এই সুবিধা একদিকে যেমন সুযোগ, অন্যদিকে এটি এক কঠিন প্রতিযোগিতারও সূচনা। এই সুযোগকে সঠিকভাবে পরিকল্পিত ও বাস্তবায়িত করতে পারলে, বাংলাদেশ বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে বিপ্লব আনতে পারবে। তবে এই সুযোগকে অবহেলা করা বা অপর্যাপ্তভাবে ব্যবহার করা, আমাদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য বিপর্যয়কর হতে পারে।এটি একটি নতুন বিপ্লবী পরিবর্তনের সম্ভাবনা, যেখানে বাংলাদেশকে তার পূর্ববর্তী সীমাবদ্ধতা ছাড়িয়ে এসে আন্তর্জাতিক বাজারে নিজেদের নতুনভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।
চীন আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য একটি সম্মানজনক গেটওয়ে হতে পারে। চীনের সঙ্গে এই বাণিজ্যিক সম্পর্ক বাংলাদেশের জন্য শুধু একটি শুল্কমুক্ত সুবিধা নয়, বরং একটি নতুন বাণিজ্যিক মানচিত্র, যার দ্বারা সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থানকে দৃঢ় রূপ দেওয়ার এক বিরাট সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। বিশ্বায়নের এই প্রতিযোগিতামূলক যুগে বাণিজ্য কেবল পণ্য রপ্তানির বিষয় নয়, বরং এটি কৌশল, কূটনীতি ও অর্থনৈতিক শক্তির প্রতিফলন। চীন বিশাল একটি বাজার, যেখানে সাশ্রয়ী ও মানসম্পন্ন পণ্যের বিপুল চাহিদা রয়েছে। বাংলাদেশ যদি তার উৎপাদনশীলতা বাড়াতে পারে, তাহলে চীনের এই বাজার শুধু রপ্তানির জন্য নয়, বরং শিল্প খাত সম্প্রসারণেরও এক নতুন সুযোগ তৈরি করবে।
প্রথাগতভাবে বাংলাদেশ রপ্তানিতে তৈরি পোশাকের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু শুল্কমুক্ত সুবিধার ফলে অন্যান্য খাতেও প্রসার ঘটানোর সুযোগ এসেছে। চামড়াজাত পণ্য, কৃষিপণ্য, ফার্মাসিউটিক্যালস, তথ্যপ্রযুক্তি এবং লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং খাতের জন্য চীনের বাজার এখন উন্মুক্ত। বাংলাদেশ যদি এ খাতগুলোতে বিনিয়োগ বাড়াতে পারে, তবে বহুমুখী রপ্তানির মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির ভিত্তি আরও শক্তিশালী হবে। বাংলাদেশের সামনে সুযোগ আছে, কিন্তু চ্যালেঞ্জও কম নয়। শুল্কমুক্ত সুবিধা পাওয়া মানেই প্রতিযোগিতা শেষ হয়ে গেল না, বরং এটি নতুন প্রতিযোগিতার শুরু। চীনের বাজার সহজ নয়। এখানে ভারত, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপিন্স, এমনকি আফ্রিকার দেশগুলোও নিজেদের অবস্থান তৈরি করতে মরিয়া। বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো মান নিয়ন্ত্রণ। চীন একটি অত্যন্ত মাননির্ভর বাজার, যেখানে নিম্নমানের পণ্য দীর্ঘমেয়াদে কোনো অবস্থান তৈরি করতে পারবে না। তাই উৎপাদন পর্যায়ে গুণগত মান নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়াও সরবরাহ চেইনের সীমাবদ্ধতা দূর করতে হবে।তাছাড়া, চীনা ক্রেতাদের চাহিদা বোঝা ও তাদের সঙ্গে কার্যকর বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে তোলা জরুরি। চীনা ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিতি না থাকলে এবং বাজার গবেষণায় বিনিয়োগ না করলে বাংলাদেশের পণ্য প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারবে না। এই সুবিধাকে পুরোপুরি কাজে লাগাতে হলে কেবল রপ্তানি বৃদ্ধির দিকে মনোযোগ দিলেই চলবে না, বরং একটি দীর্ঘমেয়াদি কৌশল গ্রহণ করতে হবে। নীতি ও পরিকল্পনার উন্নয়নে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকারকে রপ্তানি পরিকল্পনায় নতুন মাত্রা যোগ করতে হবে। চীনে কোন কোন পণ্য রপ্তানি করা হবে এবং কীভাবে তা বাজারজাত করা হবে, সে বিষয়ে সুস্পষ্ট পরিকল্পনা নিতে হবে। বিনিয়োগ আকর্ষণ ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করতে হবে। বাংলাদেশের শিল্প উৎপাদন ব্যবস্থা আরও উন্নত করতে হবে, যাতে প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকা যায়। এক্ষেত্রে বাজার গবেষণা ও ব্র্যান্ডিং খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাই চীনের বাজারে প্রবেশ করতে হলে পণ্যের ব্র্যান্ডিং ও বাজার গবেষণায় গুরুত্ব দিতে হবে। বাজার গবেষণার জন্য তরুণ প্রজন্মকে উৎসাহিত করার পরিকল্পনা হাতে নেওয়া যেতে পারে। তারা নিত্যনতুন গবেষণার মাধ্যমে নতুন নতুন বাজার ব্যবস্থাপনার প্রযুক্তি এবং পন্থা উদ্ভাবন করবে। এতে দেশের রপ্তানি বাণিজ্য আরও সামনের দিকে এগিয়ে যাবে। পাশাপাশি ব্যান্ডিং ক্ষেত্রেও ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের মাধ্যমে বিশ্বমানের ব্র্যান্ডিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। তবে সবচেয়ে বড় বিষয় হলো অবকাঠামো ও পরিবহন সুবিধা উন্নয়ন করা। পরিবহন সুবিধার দুর্বল অবস্থা এক্ষেত্রে বাঁধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।তাই বন্দর, সড়ক যোগাযোগ, শিপিং ও লজিস্টিক ব্যবস্থার উন্নয়ন করা না হলে, শুল্কমুক্ত সুবিধার আসল সুফল পাওয়া যাবে না। এর পাশাপাশি অবশ্যই কৌশলগত কূটনীতি অতীব জরুরি।
চীনের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক জোরদার করা এবং বাণিজ্য সম্প্রসারণের জন্য কূটনৈতিক পর্যায়ে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে হবে। বাণিজ্য ক্ষেত্রে সুফল এর জন্য সুসম্পর্ক বজায় রাখা একটি আবশ্যিক করণীয়। বাংলাদেশের শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার এক নতুন পথের রেখাপাত করেছে। কিন্তু সেই পথের দিগন্ত কোথায় মিলিয়ে যাবে, তা নির্ধারণ করবে কৌশল, সময় এবং দূরদৃষ্টি। একটি সুযোগ তখনই পূর্ণতা পায়, যখন তা স্রেফ ব্যবহৃত হয় না, বরং পুনর্নির্মাণ করা হয়। চীনের বিশাল বাণিজ্যিক নকশায় বাংলাদেশের উপস্থিতি শুধুই একটি ক্ষুদ্র রেখা নয়; এটি হতে পারে এক অদৃশ্য অক্ষ, যার ওপর নির্ভর করবে ভবিষ্যৎ বাণিজ্যের বিন্যাস। শক্তিশালী অর্থনীতির আসল পরিচয় শুধু তার উৎপাদন ক্ষমতায় নয়, বরং তার সৃজনশীল অভিযোজনের দক্ষতায়। বাজার কখনো শূন্য থাকে না, সেখানে স্থান তৈরি করতে হয়। বাংলাদেশ এই সুবিধাকে কীভাবে ব্যবহার করবে, সেটাই নির্ধারণ করবে আমাদের বাণিজ্যের প্রকৃত গতিপথ। যার অনুকম্পায় বাংলাদেশের শিল্প ও বাণিজ্য এক নতুন গতিশীলতায় প্রবাহিত হতে পারে। কেবল উৎপাদন নয়, উৎপাদনের দর্শন, কেবল রপ্তানি নয়, রপ্তানির শৃঙ্খলা এই মৌলিক পার্থক্যই নির্ধারণ করবে বাংলাদেশ এই নতুন পথে যাত্রী, নাকি দিকনির্দেশক! যদি এই সুযোগের সঠিক ব্যবহারের ও রপ্তানি ব্যবস্থাপনার আমূল পরিবর্তন আনতে পারে, তাহলেই বাংলাদেশ বিশ্ব বাণিজ্যের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে। দেশের অর্থনীতিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তনের মাধ্যমে সাধিত হবে উন্নয়ন।

×