ঢাকা, বাংলাদেশ   বৃহস্পতিবার ০৩ এপ্রিল ২০২৫, ২০ চৈত্র ১৪৩১

মিয়ানমারে ভূমিকম্প

প্রকাশিত: ১৯:৫৬, ২ এপ্রিল ২০২৫

মিয়ানমারে ভূমিকম্প

বাংলাদেশের প্রতিবেশী রাষ্ট্র মিয়ানমারে গত শুক্রবার দুপুরে শক্তিশালী ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। মিয়ানমারের পাশাপাশি ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে থাইল্যান্ডেও। একই সঙ্গে দক্ষিণ-পশ্চিম চীন, ভারত, ভিয়েতনাম, লাউস, কম্বোডিয়া ও বাংলাদেশেও অনুভূত হয়েছে ভূকম্পন। মিয়ানমারের জান্তা সরকারের হিসাব অনুযায়ী সে দেশে প্রায় দুই হাজার লোক নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন হাজারের বেশি। থাইল্যান্ডে শতাধিক মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। দুই দেশেই ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছে বহু মানুষ। যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএসের তথ্যমতে, মিয়ানমারের কেন্দ্রীয় অঞ্চলে ৭ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্পটি হয় দুপুর ১২টা ৫০ মিনিটে। এর ১২ মিনিট পর ৬ দশমিক ৪ মাত্রার আরও একটি পরাঘাত বা আফটার শক অনুভূত হয়। ভূমিকম্পে মিয়ানমারের রাজধানী নেপিডোসহ ছয়টি অঞ্চলে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে আন্তর্জাতিক সংস্থার কাছে সহায়তার আহ্বান জানিয়েছে জান্তা সরকার, যাতে সাড়া দিয়েছে জাতিসংঘ। বাংলাদেশও প্রেরণ করেছে বিভিন্ন ত্রাণসামগ্রী।
থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাঙ্ককেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ৩৩ তলার একটি নির্মাণাধীন ভবন সম্পূর্ণ ধসে পড়েছে, যার নিচে অন্তত ১১৭ জন শ্রমিক চাপা পড়েছে। ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞদের মতে, ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল মিয়ানমারের মান্দালয়ের সাগাইং শহরের কাছাকাছি। সাগাইং নামে একটি চ্যুতিও আছে, যেটি ভারতের অরুণাচল প্রদেশ থেকে আন্দামান সাগর পর্যন্ত বিস্তৃত। ভূমিকম্পটি হয়েছে ‘ইন্দো-বার্মা সাব-ডাকশন জোনের’ মধ্যে। বাংলাদেশের পূর্বে অবস্থিত এটি সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ ও মেঘনা নদী থেকে পূর্বে ভারতের মনিপুর-মিজোরাম পর্যন্ত বিস্তৃত। আরও একটি ডাউকি চ্যুতি রয়েছে হিমালয়ের পাদদেশে। এর ওপর বাংলাদেশের অবস্থান বিধায় আমাদেরও রয়েছে ভূমিকম্পের সমূহ ঝুঁকি। ডাউকি চ্যুতি পূর্ব-পশ্চিমে প্রায় ৩শ’ কিলোমিটার বিস্তৃত। ১৮৯৭ সালে ডাউকি ফল্টে ৮ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছিল। ওই ভূমিকম্পে ঢাকার আহসান মঞ্জিলসহ অন্তত দশটি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বাংলাদেশে এর আগে চট্টগ্রাম ও খাগড়াছড়িতে সর্বোচ্চ ৫ দশমিক ৬ মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছিল। অবশ্য সবচেয়ে বেশি ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে রয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রামের তিনটি জেলা ও সিলেটের জৈন্তাপুর এলাকা। টাঙ্গাইলের মধুপুর চ্যুতিও অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। রাজউকের মতে, উক্ত চ্যুতি রেখায় ৬ দশমিক ৯ মাত্রার ভূমিকম্প হলে ঢাকায় ৮ লাখ ৫ হাজার ভবন ধসে পড়তে পারে। ওই সমীক্ষায় আরও বলা হয়েছে, দিনের বেলা এই মাত্রার ভূমিকম্প হলে ২ লাখ ১০ হাজার মানুষ মারা যাবে। সে অবস্থায় রাতের ভয়াবহ অবস্থা সহজেই অনুমেয়। অথচ ভূমিকম্প মোকাবিলায় আমাদের কোনো প্রস্তুতি নেই বললেই চলে। এমনকি ফায়ার সার্ভিসেরও নয়। ভূমিকম্প সহনশীল ভবন ও মার্কেট তৈরি তো দূরের কথা ভূমিকম্প মোকাবিলায় কোনো প্রশিক্ষণেরও ব্যবস্থা নেই।
বাংলাদেশের অন্তত ১৩টি এলাকা রয়েছে ভূমিকম্পের সমূহ ঝুঁকিতে। সর্বাধিক তীব্র ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে রয়েছে তিন পার্বত্য জেলা ও সিলেটের জৈন্তাপুর। এসব এলাকা ঢাকা থেকে ১০০ কিলোমিটার দূরে হলেও আত্মপ্রসাদের অবকাশ নেই। কেননা, এসব স্থানে ৭ থেকে ৮ মাত্রার ভূমিকম্প হলে এর আঘাত এসে লাগবে ঢাকাতেও। বাস্তবে ঢাকার বহুতল ভবন ও সুপার মার্কেটগুলো ভূমিকম্প সহনীয় করে গড়ে তোলা হয়নি। অগ্নিনির্বাপণের পর্যাপ্ত ব্যবস্থাও নেই ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের। ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলাসহ উদ্ধার তৎপরতার সরঞ্জাম এবং যন্ত্রপাতি প্রায় নেই বললেই চলে। এসব বিষয় বিবেচনায় রেখে ভূমিকম্প ঝুঁকি মোকাবিলায় যতটুকু করণীয়, সেসব সংগ্রহে জরুরি ভিত্তিতে অগ্রাধিকার দিতে হবে। এর জন্য জরুরি উদ্যোগ ও অর্থ বরাদ্দ করাও বাঞ্ছনীয় এখন থেকেই। সর্বোপরি ভূমিকম্প মোকাবিলায় স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রণয়ন করে পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করতে হবে।

×