ঢাকা, বাংলাদেশ   শুক্রবার ০৪ এপ্রিল ২০২৫, ২১ চৈত্র ১৪৩১

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বনাম তরুণ প্রজন্মের মানসিক স্বাস্থ্য

সামিহা তাসনিম

প্রকাশিত: ১৮:১৩, ২ এপ্রিল ২০২৫

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বনাম তরুণ প্রজন্মের মানসিক স্বাস্থ্য

শুধু বিনোদনের জন্য ব্যবহৃত সামাজিক মাধ্যমগুলো বর্তমানে সকল ক্ষেত্রে ব্যবহৃত প্রয়োজনীয় মাধ্যম হয়ে উঠেছে। ঘুম থেকে উঠেই বাবাকে খবরের কাগজ পড়তে দেখে আসা তরুণরা এখন ঘুম থেকে উঠে খবরের কাগজ দেখে ফেসবুকের গণমাধ্যমে। স্কুল, কলেজ, অফিসের মতো প্রতিটি প্রতিষ্ঠান যেনো দুটি বিশ্বে বিভক্ত: অফলাইন এবং অনলাইন। যদিও অনলাইন জগৎই মূখ্য প্ল্যাটফর্মে পরিণত হচ্ছে। শিক্ষার্থীরা আজকাল স্কুলে নোটিস বোর্ড থেকে বেশি যেমনÑ অনলাইন নোটিস গ্রুপগুলোর ওপরই বেশি নির্ভরশীল। তেমনি অফিসের যে কোনো মিটিংয়ের জন্য জুম কল সবার পছন্দের তালিকায় আগে স্থান পায়। সময় সাশ্রয় থেকে শুরু করে কর্মসংস্থানের সুযোগ, শিক্ষার্থীদের নিজেদের পছন্দের শিক্ষকের ক্লাস করার সুযোগ পর্যন্ত, আজকের তরুণরা অগণিত সুযোগের সদ্ব্যবহার করছে! আবার বিনোদনের জন্যও সকলে এখন সামাজিক মাধ্যমকেই বেশি বেছে নেয়। অনলাইন গেম থেকে শুরু করে সিনেমা, সিরিজ সবই এক একটি বিনোদনের মাধ্যম। কারোর দৈনন্দিন জীবনযাত্রা প্রতিনিয়ত দেখাও এখন বিনোদনের অন্য একটি অন্যতম ফরম্যাট হয়ে গিয়েছে। ইউটিউবিং, ট্রাভেল ভøগিং, ফুড ভøগিং, ডেইলি লাইফস্টাইল বর্তমান প্রজন্মের বেশ সুপরিচিত কিছু কর্মক্ষেত্র। বিনোদন জগতের পাশাপাশি, সামাজিক মাধ্যমে নিজের জীবনের মুহূর্তগুলো বন্ধুবান্ধব, পরিবার ও অন্য সবার সঙ্গে শেয়ার করাও এখন বিনোদনের অংশই বলা যায়। তবে এ ধরনের বিনোদনের অন্যতম নেতিবাচক দিক হলো এটি বর্তমান প্রজন্মের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলে। কারোর সফল ক্যারিয়ার কিংবা ত্রুটিহীন জীবনযাত্রা অথবা নিখুঁত পারিবারিক সম্পর্ক নিয়ে অনেকের অধিক আগ্রহ ও চিন্তা-ভাবনা এক সময়ে আসক্তিতে পরিণত হয়। ফলে সৃষ্টি হয় ক্রমাগত অন্যের সঙ্গে নিজের সফলতা-ব্যর্থতা তুলনা করার মনোভাব। পরবর্তীতে জীবন নিয়ে সন্তুষ্ট না থাকতে পারাসহ পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতিকে সবকিছুর দায়ী করার প্রবণতা তাদের হীনম্মন্যতা ও বিষণ্নতার দিতে ঠেলে দেয়। এর থেকেই মানসিক স্বাস্থ্যের জটিলতার সূচনা ঘটে। একটি অনুসন্ধানী রিপোর্ট অনুযায়ী, যেসব শিশু কিশোর-কিশোরী সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করে না তাদের তুলনায় এমন শিশু কিশোর-কিশোরীরা যারা সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করে তারা বেশি উৎকণ্ঠা, উদ্বেগ এবং বিষণ্নতায় ভুগতে থাকে।
ইদানীং কোনো কিছুতেই মনোযোগ বা মনোনিবেশ করতে না পারা, দীর্ঘসময় পড়াশোনা বা কোনো কাজ না করতে পারা তরুণদের দৈনন্দিন জীবনের অন্যতম সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। যার পেছনে প্রধান কারণও সামাজিক মাধ্যমগুলোর প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি ও দিনরাত ব্যবহার করার প্রবণতা। এই আসক্তির কারণে আমরা ভুলে যাই অনলাইন জগৎ সম্পূর্ণ বাস্তব নয়। অন্যের জীবন ধারার সঙ্গে নিজের তুলনা থেকে আরও ভালো করার যে অসুস্থ প্রতিযোগিতা, তা ক্রমাগত মানসিক চাপকে বিষণ্নতা, হতাশার দিকে ঠেলে দেয়। যা মানসিকভাবে শিশু-কিশোরদের সম্পূর্ণ অসুস্থ করে দেয়। আমাদের মনে রাখা উচিত সোশ্যাল মিডিয়ার শুধু সুপরিচিত ব্যক্তিরাই নয়, বরং সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশ করা সমস্ত কিছুই জীবনের একটি ক্ষুদ্রতম অংশ, পুরো জীবন নয়। প্রত্যেকের জীবনের যেমন সফলতার গল্প রয়েছে। তেমনই ব্যর্থতার গল্পও রয়েছে। হয়তো অনলাইন জগতের চাকচিক্যে সেগুলো আড়ালেই রয়ে যায়। তবে এই অনলাইন জীবন সম্পূর্ণরূপে এড়ানোর কোনো উপায় নেই। জীবনের প্রতিটি দিক দিয়েই এটি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সামাজিক মাধ্যমগুলোর ইতিবাচক দিকগুলোকে যেভাবে গ্রহণ করতে হবে, ঠিক সেভাবেই এর প্রতি আসক্তি থেকেও নিজেদের নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। যেমনÑ ভার্চুয়াল লাইফের এই অসুস্থ প্রতিযোগিতার অংশ হওয়া যাবে না। ব্যর্থতাকেও সফলতার মতোই সাধারণ করতে হবে অনলাইন অফলাইন দুই জায়গায়ই। সবশেষে সৌন্দর্য, সফলতা ও সম্পর্ককে কোনো সামাজিক মাধ্যমের মাপকাঠি দিয়ে মাপা যাবে না। মনে রাখতে হবে প্রত্যেকেই আলাদা। তাই তাদের জীবনে চলার পথ ও আলাদা। বাস্তবে সৌন্দর্য যে ত্রুটিহীন না তা যেন ভার্চুয়াল লাইফের চাকচিক্যকের আড়ালে না রয়ে যায়। তাই বর্তমান প্রজন্মের সুস্থ ও সুদূর ভবিষ্যতের জন্য মানসিক স্বাস্থ্যকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার পাশাপাশি সামাজিক মাধ্যমগুলোর নেতিবাচক দিকগুলোকে বিশেষভাবে এড়িয়ে চলার কোনো বিকল্প নেই।

শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

 

×