
সেকালের ঈদ উৎসবের আয়োজন স্মৃতিমধুর। গ্রামীণ সংস্কৃতিতে এর আয়োজন চলত মাস ধরে। বাড়িঘর ধোয়া-মোছা,পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা, ভালো খাবারের আয়োজন , নতুন পোশাক-আশাক কেনা ইত্যাদি এ ঈদ উৎসবের অংশ। সুগন্ধযুক্ত চালের গুঁড়ি বা গুঁড়া দিয়ে ফুল পিঠা তৈরি করা হতো, এর আয়োজন চলত সমমনা মহিলাদের উদ্যোগে, পাড়া প্রতিবেশীদের প্রতিদিনের কাজের ফাঁকে, দিনের কিছুটা সময় বেছে নিয়ে, বসার পিঁড়ি জোগাড় করে সবাই একত্রে বসে, পিঠা তৈরি করে সেগুলোতে যার যার পছন্দমতো নকশা করত। খেজুরের কাঁটা ব্যবহার করে এ নকশা করা হতো। অপরূপ নকশা ফুটে উঠত প্রত্যেকটি পিঠায়। যে যত তাড়াতাড়ি পিঠা তৈরি শেষ করতে পারত, তার কৃতিত্ব ছিল বেশি। সে বেশি প্রশংসিত হতো। এই কাজের ফাঁকে ফাঁকে পান-সুপারি খাওয়া হতো। তখন এক আনন্দমুখর পরিবেশ বিরাজ করত। প্রত্যেকটি পিঠাকে সর্ষের তেলে ভেজে দীর্ঘদিন ধরে মাটির হাঁড়িতে রেখে দেওয়া যেত। অবশেষে খাবার হিসেবে এ পিঠা পরিবেশনের জন্য আবার তেলে ভেজে গুড় বা চিনির শিরায় ভিজিয়ে রেখে খাওয়া হতো। এ এক মহাযজ্ঞ বলে বিবেচিত হতো। অনুরূপভাবে একটি টিনের টুকবার মাঝে সারি সারি লাইনে তারকাটার সাহায্যে ছিদ্র করা হতো। এটাতে ‘চালুন’ বা চালোন বলা হতো। চালোনের চারদিকে বাঁশের চটি দিয়ে ফ্রেমে বেঁধে হাতে ধরার ব্যবস্থা করা হতো। দুজন মহিলা এই চালোনের ওপরে সিদ্ধ চালের নরম ভাতের গোলা রেখে, হাতে ডলে বা চাপ দিয়ে ঝুড়ি পিঠা বানাত। দুপুরের রোদে পাটি বিছিয়ে ঝুড়ি পিঠা শুকানোর নিয়ম ছিল। আবার কাঠফাটা রোদে টিনের চালের ওপরেও এসব পিঠা ঝরঝরে করে শুকানো যেত। মাটির হাঁড়িতে এ পিঠা রাখার নিয়ম প্রচলিত ছিল। পরিবেশনের আগে বা ঈদের দিনে গুড়ের শিরায় ঝুড়িপিঠা খেতে খুব মজা হতো। এ রীতি আজও গ্রামগঞ্জে প্রচলিত আছে। অতিথি আপ্যায়নের সময়ও এ পিঠার ওপর চিনির ছিটা দিয়ে পরিবেশন করা যায়।
এছাড়া গ্রাম্য বধূদের জানা আরও নানা ধরনের চালের সেমাই, টেপা সেমাই, ঝিকিমিকি পাতার পিঠার আয়োজন করা হতো সেকালে। কৃষকের বাড়িতে পোলাও বা খিচুড়ির জন্য বিশেষ জাতের ধান উৎপন্ন হতো। চিনিগুঁড়া, কালিজিড়া চাল, আমবোরো, সালিধানের চাল গৃহিণীরা সঞ্চয় করে রাখত। এসব চালের পিঠা-পায়েসও তখন বেশ প্রচলিত ছিল।
ময়মনসিংহ ও রংপুর এলাকায় মুরগির মাংসের ভুনার সঙ্গে ঈদের দিনে চালের গুঁড়ার রুটি খাওয়ার রীতি প্রচলিত ছিল। খিচুড়ির সঙ্গে খাওয়া হতো গরুর মাংসের রেজালা। পোলাও খাওয়ার জন্য মুরগির কোরমা করত বিত্তশালী পরিবার। রাতের আহারের জন্য থাকত সকালের রান্না করা কাঁচা সেমাইয়ের ক্ষীর, পিঠার কিছু রেখে দেওয়া অংশ ও দুপুরের ভোজের অংশ। সারাদিন থাকত আত্মীয়স্বজন ও পাড়া প্রতিবেশীর সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ ও খাওয়া-দাওয়া। দরিদ্রদের মাঝে এসব খাবার বিলিয়ে দেওয়া ধর্মীয় চিন্তার অংশ ছিল। কাউকে অভুক্ত রাখা হতো না। সকলের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাত ও কুশল বিনিময় করাই ছিল ঈদের দিনে বেড়ানোর আসল উদ্দেশ্য। সমবয়সীদের সঙ্গে হাসিমুখে খোশগল্প করার অফুরান সময়ের দিন ছিল তখনকার ঈদের দিন।
প্রতিঘরে বা প্রত্যেক পরিবারে প্রায় সবার ঈদ উপলক্ষে নতুন কাপড় পরিধান করা তখনকার দিনেও প্রচলিত রীতি ছিল। কৃষক পরিবারে সারাদেশে লুঙ্গি-তহবন-ফতুয়া বা আলীগড়ি পায়জামা-পাঞ্জাবি পরা হতো। কৃষাণীর জন্য বরাদ্দ থাকত উন্নতমানের শাড়ি। ছেলেমেয়েদের জন্য পায়জামা-পাঞ্জাবি, ঘাঘরা, গারারা-কুর্তা। দরিদ্র জনগোষ্ঠী জাকাতের মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের শাড়ি, লুঙ্গি, জামা ইত্যাদি সংগ্রহ করত। সেগুলোই পরে তারা সবাই ঈদের আনন্দে নতুন পোশাকে সেজে সবার সামনে হাজির হতো। মেয়েদের জন্য চুলের ফিতা, বেলোয়াড়ি চুড়ি জোগাড় করা হতো। জুতা, সেন্ডেল তো ব্যবহারের জন্য পাওয়া যেতই।
ঈদ মানে খুশি। সেই খুশিতে সবাই শরিক হয়ে জীবনের স্বাদ আর অনাবিল আনন্দ লাভ করত সাধারণ জনগণ। আনন্দ করার এ সংস্কৃতি কালের প্রবাহে আজ নতুন রূপে রূপায়িত হয়েছে। ঈদের দিনে সেকালে ভোরেই পুকুরে ডুব দিয়ে ঝাঁকে ঝাঁকে ছেলেমেয়ে আগে গোসল সেরে নিত। বয়স্করা বাড়িতে সুগন্ধী সাবান মাখিয়ে কুয়োর পানিতে গোসল করতেন এবং তা করতেন খুব সকালবেলা। ঘরের কাজ-কর্ম শেষ করে মহিলারা দ্রুত গোসল সেরে নিতেন। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাবার হাত ধরে বা বয়স্কদের সঙ্গে নতুন কাপড় ও সুগন্ধি বা আতর মেখে ঈদগাহে হেঁটে যাওয়া ছিল সেকালের রেওয়াজ। রোজার ঈদের নামাজ আদায়ের আগে ‘ফিতরা’ আদায় করা প্রতি পরিবারের ওপর তাগিদ ছিল। এটা রোজাদারের জন্য আদায় করা ধর্মীয় বিধান। জাকাতও আদায় করা হতো। কিশোরগঞ্জের ‘শোলাকিয়া’ ঈদগাহে দূরদূরান্ত থেকে বহু মানুষ দলে দলে ঈদের নামাজ আদায় করতে অতীতের মতো আজও আসেন। ময়মনসিংহের উত্তরে শেরপুরের উত্তর সীমান্তেও একটি ঐতিহাসিক ঈদগাহ রয়েছে। একালের মতো সেকালের বড় বড় শহরগুলোতেও ঈদগাহ-মাঠ ছিল। ঈদের বড় জামাত সেসব ঈদগাহ-মাঠে অনুষ্ঠিত হতো। ঢাকার বুকে মুঘল যুগের ঈদগাহ মাঠ ধানমন্ডিতে আজও বিদ্যমান আছে। সিলেট, রাজশাহী, বগুড়া এলাকার গ্রামাঞ্চলে স্থায়ী ঈদগাহ-মাঠ বিদ্যমান ছিল। সেসব ঈদগাহ-মাঠে বিশেষ ব্যবস্থায় পর্দা দিয়ে মহিলাদের জন্য ঈদের নামাজ আদায়ের ব্যবস্থা করা হতো। যেমন আজও হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খেলার মাঠে। এফ এইচ হলের মাঠেও এরূপ জামাতের প্রচলন আছে। মোহাম্মদপুরের একটি মসজিদে বর্তমানে এরূপ ব্যবস্থা হয়। ঢাকার অদূরে গাজীপুরের এক গ্রামে বিরাটদিঘীর পাড়ে স্থায়ী ঈদগাহ-মাঠ বিদ্যমান ছিল। সেখানে একসময় ঈদের জামাত শুরু হওয়ার আগে সারা বছরের জাকাত ও ফিতরা-ইমাম সাহেবের হেফাজতে জমা করার বিধান ছিল। এ গ্রামের জনগণের মাঝে ‘ফসলি জাকাত’ দেওয়ারও রীতি আছে। সে গ্রামের মসজিদ সংলগ্ন গৃহের প্রশস্ত দ্বিতল মাদ্রাসা-কক্ষে মহিলাদের জুমা ও ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয় আজও।
শৈশবে পুরান ঢাকার শহুরে আবহে বড় হয়েছি বলে আমাদের ঈদের আনন্দ ছিল একটু ভিন্ন রকম। ঈদের চাঁদ দেখা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মসজিদের হাকিদার ‘আগামীকাল ঈদ’ এ বার্তা সারা পাড়া ও মহল্লায় এলান করে দিতেন। কিশোর-কিশোরীরা আনন্দে হৈ-হুল্লোড় করে পাড়া মাতিয়ে তুলত। পুকুরে কিশোরীদের গোসল করার প্রচলন ছিল। আজ সে নিয়ম প্রচলিত নেই। ঈদের দিনে পুরানো রঙ করা কাপড় ফিতার মতো করে কেটে চুল বাঁধার রীতি ছিল। এই ফিতা ‘নবক’ নামে পরিচিত ছিল। নতুন জুতা, সেন্ডেল পায়ে দিয়ে নতুন কাপড় পরে সেজে-গুজে কিশোর-কিশোরীরা পথে হেঁটে হেঁটে ঈদগাহে সমবেত হতো। এ স্থানটি আনন্দের মূল লক্ষ্য ছিল। বৃষ্টির দিনে মহল্লার মসজিদ প্রাঙ্গণে ঈদের জামাত হতো। নামাজ শেষ করে বাড়ি ফিরে খোরমা, সেমাই দিয়ে নাস্তা করার রেওয়াজ ছিল। দুপুর বেলা বাড়িতে রান্না করা পোলাও-কোরমা আনন্দের সঙ্গে খাওয়াই ছিল নিয়ম। এ সময় বন্ধু, আত্মীয়-প্রতিবেশীদেরও আপ্যায়ন করা হতো। বাড়িতে বাড়িতে মুরব্বিদের পা ছুঁয়ে সালাম করা হতো। সালামের বদলে ঈদী বা সালামি দেওয়া হতো। নতুন জামাই শ্বশুর-শাশুড়িকে সালাম করতে আসত, সালামি পেত কাঁচা টাকা। এই টাকার মূল্য ছিল অনেক। বড় রাস্তার পাশে ঈদীতে পাওয়া টাকা দিয়ে খেলনা কেনা যেত। ঈদের পরের দিন চকবাজারে ও আজিমপুরে বড় মেলা হতো। এসব মেলায় চড়কিতে ওঠা যেত, মাটির ও কাঠের খেলনা কেনা যেত। ধনী-দরিদ্র সবার মাঝে আনন্দ বিরাজ করত। গৃহস্থালি বস্তুও কেনা যেত মেলা থেকে।
বিশ্বায়নের যুগে ঈদের উৎসব ভিন্ন স্বাদ পৌঁছায় মুসলমানের ঘরে ঘরে। পুরানো দিনের চালের গুঁড়া দিয়ে করা সেমাইয়ের বদলে আজকাল বাজার থেকে সবাই কিনে আনে লাচ্ছা সেমাই, মেশিনে গড়া সেমাই। বড় বড় কোম্পানি এসব সেমাইয়ের ব্যবসা করছে। গুঁড়া দুধ, কনডেনস্ড মিল্ক সহজেই বাজারে পাওয়া যায়। এগুলো ব্যবহার করে মিষ্টি জাতীয় জর্দা ফিরনি পায়েস রান্না করা হয়। তবে খোরমা, খেজুর, কিসমিস, বাদাম, কেশোনাট ইত্যাদিও ব্যবহার হয়। ঘিয়ে ভাজা পরাটা, রুটি, খাসি, গরুর ভুনা মাংস ছাড়া খিচুুড়ি-পোলাও রান্না করা হয়। এর সঙ্গে আরও থাকে কোরমা।
ঈদের দিনের উৎসবকে সার্থক করে তোলার আয়োজন এবং পাড়া-প্রতিবেশী, বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় জিতে যাওয়ার উৎসাহে গৃহিণীদের মাঝে কেনাকাটা সাড়া জাগায়। বাজার-হাট সরগরম হয়ে ওঠে। সেকালে একজন একপ্রস্থ নতুন কাপড় নিয়েই খুশি থাকত। আজকের দিনে নানা সেটের বাহুল্য ছাড়া ঈদ যেন পূর্ণতা পায় না। ঘরে রান্না করা খাবারে পরিতৃপ্ত থাকে না মানুষ। রেস্টুরেন্টে বেশি খরচের অনুষ্ঠানাদির আয়োজন করে তৃপ্তি পেতে চায়। সামর্থের পার্থক্য অনুযায়ী নারীদের সাজ-সজ্জার জন্য রকমারি ইমিটেশন প্রসাধনী কেনা অপরিহার্য হয়ে ওঠে। অনেকে পর্যটন কেন্দ্রে বা বিদেশে পাড়ি দিয়েও ঈদ উদ্যাপন করেন। অল্পে তুষ্ট হওয়ার দিন ক্রমে হারিয়ে যাচ্ছে বলেই মনে হয়!
তবে শহর ছেড়ে গ্রামে আত্মীয়-স্বজনদের সান্নিধ্যে গিয়ে ঈদ উদ্যাপন করারও হুজুগ আছে এখন। ফলে যাতায়াত ব্যবস্থার ওপর খুব চাপ পড়ে। দুর্ঘটনাও ঘটে অনেক। এ ধরনের পাল্টাপাল্টি (কমপিটিটিভ) চাওয়া-পাওয়ার যুগে মানুষের মাঝে ‘ঈদ মানে নির্মল আনন্দ’ পাওয়ার অনুভূতিটাও যেন হারিয়ে যাচ্ছে। সমান সমান বাহ্যিক পাওয়ার রেওয়াজ সমাজে অস্থিরতার সৃষ্টি করছে। আসলে মানুষ ধনী-দরিদ্রদের মাঝে সমতার ভিত্তিতে তৃপ্তি পেতে চায়। আসুন, আমরা অল্পে তুষ্ট থাকতে অভ্যস্ত হই। সুখী থাকি। সবার প্রতি সবার সমান শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা অটুট থাকুক।
লেখক : সাবেক চেয়ারম্যান ও অধ্যাপক ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়