
গাজার মানুষের দুঃখ-দুর্দশার যেন শেষ নেই। দীর্ঘ দেড় বছর পর, এক মুহূর্তের জন্য হলেও ধ্বংসস্তূপের মাঝে একটুখানি স্বস্তির ছোঁয়া এসেছিল। যুদ্ধবিরতির চুক্তির আশা নিয়ে তারা নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখছিল। নতুন জামা পরার, ভালো কিছু খাওয়ার আশায় ছিল। ঈদ তো আর বেশি দূরে নয়! মুয়াজ্জিনের সুমধুর আজানের ধ্বনিতে সেহরির জন্য জেগে উঠত মানুষ, কেউবা ক্ষুধার জ্বালা নিয়েও রোজা রাখত অবিচল বিশ্বাসে। ইফতারে কারও ভাগ্যে জুটত শুকনো রুটি, কেউবা ভাগ্যবান হলে এক টুকরো তরমুজ কিংবা প্রাণ জুড়ানো ঠান্ডা শরবত। এত কষ্টের মাঝেও গাজার শিশুরা হাসছিল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছিল তাদের নিষ্পাপ মুখের কিছু ছবি, যেখানে ঈদের আনন্দের অপেক্ষা ছিল। যুদ্ধের ভয়াবহতাও তাদের স্বপ্ন দেখার সাহস কেড়ে নিতে পারেনি। কিন্তু সেই স্বপ্ন যেন টিকে থাকতেই পারল না! রাতেও সবাই নিশ্চিন্ত মনে ঘুমিয়ে পড়েছিল, কেউ কল্পনাও করেনি যে পরদিন সূর্যোদয় দেখার সৌভাগ্য আর কজনের হবে।
আজানের ধ্বনি শোনার আগেই শুরু হলো বিভীষিকা। ইসরাইলি বাহিনীর নিষ্ঠুর বোমা হামলায় মুহূর্তের মধ্যে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হলো ঘরবাড়ি। নিরীহ মানুষগুলোর দেহ ছিন্নভিন্ন হয়ে উড়ে গেল বাতাসে। মুহূর্তেই কেঁপে উঠল গাজার মাটি, ধুলো আর ধোঁয়ার আস্তরণে ঢাকা পড়ল আশার আলো। চারদিকে শুধু মৃত্যু, ধ্বংস আর আর্তনাদ। কেউ সেহরির জন্য উঠে আরেকজনকে ডাকতে গিয়ে দেখল, সে আর নেই। কারও ছোট্ট শিশু মা-বাবার নিথর দেহ আঁকড়ে ধরে কাঁদছে, কেউবা অর্ধেক শরীর নিয়ে ধুঁকছে মৃত্যুর কোলে। বিস্ফোরণের বিকট শব্দে কানে তালা লেগে যাচ্ছিল, ধোঁয়ার কুণ্ডলীতে পথ হারিয়ে ফেলছিল মানুষ। চারদিকে শুধু স্বজন হারানোর আহাজারি, কান্নার রোল। কেউ কাঁদছে পরিবারের জন্য, কেউ নিঃশব্দে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে। গাজার প্রতিটি কোণ যেন এক ভয়ংকর মৃত্যুপুরীতে পরিণত হলো। অথচ কথা ছিল, ভূমধ্যসাগরের ঢেউ আনন্দে গর্জে উঠবে, জলপাই গাছে ফুটবে নতুন কুঁড়ি, শিশুরা মুক্ত আকাশের নিচে নির্ভয়ে খেলবে। গাজার মানুষ বিভীষিকার দিনগুলো ভুলে যেতে চেয়েছিল। কিন্তু তাদের সেই সুযোগ দেওয়া হলো না। গাজার এই অবর্ণনীয় দুর্দশা থেকে মুক্তি পেতে শুধু নিন্দা ও শোক প্রকাশ করাই যথেষ্ট নয়, বরং কার্যকরী ও দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নিতে হবে। ধনী মুসলিম দেশগুলোকে খাদ্য, ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম পাঠানোর ব্যবস্থা করতে হবে। ত্রাণ পৌঁছানোর জন্য আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সহযোগিতা নিশ্চিত করতে হবে। গাজার আহত ও শরণার্থীদের পুনর্বাসনের জন্য বিশেষ ফান্ড গঠন করতে হবে। গাজায় উন্নতমানের হাসপাতাল নির্মাণ ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক পাঠানোর ব্যবস্থা করা জরুরি। ধ্বংস হওয়া ঘরবাড়ি পুনর্নিমাণে আন্তর্জাতিকভাবে অর্থ সংগ্রহ করা দরকার। শিশুদের শিক্ষা ও মানসিক পুনর্বাসনের জন্য দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। মুসলিম দেশগুলোকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে কঠোর কূটনৈতিক অবস্থান নিতে হবে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে গাজার পক্ষে শক্তিশালী দাবি তুলে ধরতে হবে। আন্তর্জাতিক আদালতে ইসরাইলের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের মামলা করতে হবে। ইসরাইলে অস্ত্র সরবরাহ বন্ধের জন্য বৈশ্বিক চাপ প্রয়োগ করতে হবে। বিশ্বজুড়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে, যাতে ইসরাইলের বর্বরতা উন্মোচিত হয়। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মাধ্যমে গাজায় সহায়তা পাঠাতে হবে। গাজার জনগণের জন্য অর্থ ও ত্রাণ সংগ্রহে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে। এছাড়া, মুসলিম বিশ্বকে নিজেদের অভ্যন্তরীণ বিভেদ ভুলে গিয়ে একটি সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে, যাতে ফিলিস্তিনিরা তাদের ন্যায্য অধিকার ফিরে পায়।
শুধু ফেসবুক-টুইটারে পোস্ট দিয়ে প্রতিবাদ জানানো যথেষ্ট নয়; বরং বিশ্ব নেতাদের চাপে রাখতে হবে, যেন তারা ইসরাইলের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়। মুসলিম বিশ্ব যদি ঐক্যবদ্ধ হয়, তাহলে নিঃসন্দেহে ইসরাইলকে এই বর্বরতা বন্ধ করতে বাধ্য করা যাবে। শুধু মুসলিম দেশ নয়, যেকোনো বিবেকবান মানুষকে এখন গাজার পাশে দাঁড়াতে হবে। আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় গাজার বাস্তব চিত্র তুলে ধরতে হবে, যাতে বিশ্ববাসী ইসরাইলের আগ্রাসন সম্পর্কে সঠিক তথ্য জানতে পারে। গাজার শিশুরা যখন ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে, যখন তারা বাবা-মায়ের নিথর দেহের সামনে দাঁড়িয়ে বোঝার চেষ্টা করে মৃত্যু কী, তখন আমাদের নীরব থাকা উচিত নয়। একদিন হয়তো ইতিহাসের পাতায় লেখা থাকবে, আমরা মানবতার পক্ষে দাঁড়াতে ব্যর্থ হয়েছিলাম। গাজার মানুষ শুধু বেঁচে থাকার জন্য লড়াই করছে না, তারা শান্তি চায়, স্বাভাবিক জীবন চায়। যুদ্ধ নয়, শিশুরা মুক্ত আকাশের নিচে হাসতে চায়, খেলতে চায়। তাদের অধিকার ফিরিয়ে দিতে হলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে শক্তিশালী ভূমিকা রাখতে হবে। মানবতার পক্ষে দাঁড়ানোর এখনই সময়। এখন সময় এসেছে শুধু দুঃখ প্রকাশ নয়, বরং বাস্তব পদক্ষেপ নেওয়ার। কার্যকর উদ্যোগের মাধ্যমে গাজাকে রক্ষা করার।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]