ঢাকা, বাংলাদেশ   মঙ্গলবার ০১ এপ্রিল ২০২৫, ১৭ চৈত্র ১৪৩১

ঈদযাত্রায় সতর্কতা

প্রকাশিত: ২০:০০, ২৮ মার্চ ২০২৫

ঈদযাত্রায় সতর্কতা

ইসলাম ধর্মাবলম্বী-দের জন্য সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব হচ্ছে পবিত্র ঈদুল ফিতর। ঈদ মানে আনন্দ ও খুশি। সেই আনন্দ ভাগাভাগি করতে পরিবারের পাশে থাকতে চান সবাই। নাড়ির টানে বাড়ি ফেরেন সকলেই। যারা দূরে থাকেন তারাও শহর-নগর ছেড়ে শিকড়ের টানে পরিবারের কাছে ছুটে যান। এটি আবহমানকাল থেকে একটি চিরায়ত দৃশ্য। অন্তত বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এমনটাই হয়ে থাকে সবসময়। এ দেশের মানুষের আবেগ, ভালোবাসা, টান এসবের ক্ষেত্রে কোনো ছাড় নাই। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে ইচ্ছা করলেই এই বাড়ি ফেরা কিংবা পরিবারের কাছে ফেরাটা স্বস্তির সাথে হয় না সব সময়। ঈদপূর্ব যাত্রায় সড়ক, রেল, নৌ ও আকাশপথে চলাচল নির্বিঘ্ন থাকে না। বিশেষ করে সড়কপথে যাতায়াতে চরম ভোগান্তির শিকার হতে সাধারণ মানুষকে। দেশের চারটি প্রধান মহাসড়কে এখনো শৃঙ্খলা ফেরেনি। সড়ক দুর্ঘটনা এখনো নিয়মিত বিষয়। গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে ট্রাফিক পুলিশরাও দায়িত্ব পালনে হিমশিম খান। সেক্ষেত্রে ঈদযাত্রায় যান চলাচল স্বাভাবিক রাখা তাদের পক্ষে আরও কঠিন।
প্রতিবারের মতো এবারের ঈদেও যাত্রীদের বড় অংশ যানবাহনের সংকটে পড়তে পারেন। এর সঙ্গে যোগ হবে পথের ভোগান্তি ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি। এর সবচেয়ে বড় কারণ হচ্ছে মহাসড়কগুলো এই ভার বহন করার জন্য যথেষ্ট প্রস্তুত নয়। ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন করতে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর প্রতিবছরই মহাসড়কগুলো চলাচলের উপযোগী করার নির্দেশ দেয়, ব্যবস্থা নিয়ে থাকে। কিন্তু এসব আদৌ কতটা বাস্তবায়ন হয় সেটাই বড় প্রশ্ন। তাছাড়া ঈদের সময় অতিরিক্ত মুনাফা লাভের আশায় ফিটনেসবিহীন গাড়িগুলো হাইওয়েতে চলাচল করে। সঙ্গে যোগ হয় অতিরিক্ত গাড়ির চাপ। যার ফলে সৃষ্টি হয় বড় ধরনের যানজট। এতে ঘর ফেরা মানুষের ভোগান্তি ওঠে চরমে। ঈদে যানজটে নাকাল হয়ে ৬ ঘণ্টার পথ ১০-১২ ঘণ্টায় পৌঁছায় যাত্রীরা। অনেক ক্ষেত্রে একদিনও লেগে যায় বড় কোনো দুর্ঘটনা হলে। তা ছাড়া ঈদযাত্রায় প্রতি বছরই দুর্ঘটনা লেগেই থাকে। কত-শত প্রাণ যে সড়কে হারায়, সেটার হিসাব নেই।
আকাশপথে ভ্রমণের সক্ষমতা বেশির ভাগের নেই। যাদের আছে তারা হয়তো নির্বিঘ্নে যাতায়াত করবেন। কিন্তু পানিপথে আর সড়কপথে মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে গাদাগাদি করে গন্তব্যে পৌঁছাবার এই চেষ্টা এ দেশের মানুষের আর কতকাল করে যেতে হবে সেটাই প্রশ্ন। ঈদযাত্রায় প্রশাসনের অব্যবস্থাপনা, সড়কের বেহাল দশা, দীর্ঘ যানজট, টিকিট কালোবাজারি, নিয়ন্ত্রণহীন ভাড়া বৃদ্ধি, ছিনতাই-ডাকাতি ও চাঁদাবাজি, জালনোট, সড়ক ও নৌপথে দুর্ঘটনা এবং শ্রমিক অসন্তোষের কারণে সড়ক অবরোধসহ বিভিন্ন ঘটনায় জনদুর্ভোগ যখন চরমে ওঠে, তখন ঘরমুখো মানুষের মনে চরম হতাশা জন্ম নেয়। অতীতের ঘটনা থেকে প্রমাণিত, দেশের কোনো পথই ঘরমুখো মানুষের ঈদযাত্রার জন্য স্বস্তিদায়ক নয়। সড়কপথ, নৌপথ, রেলপথ ঈদের আগে সবখানেই পোহাতে হয় ভোগান্তি। এবার রেলের টিকিট নিয়েও শুরু হয়েছে বড় ভোগান্তি। এ ছাড়া ঈদযাত্রায় মৃত্যুর মিছিল তো আছেই। সড়ক দুর্ঘটনা ছাড়াও ঈদে ঘরে ফেরা যাত্রীদের ক্ষতি করতে বিভিন্ন চক্র ওৎ পেতে থাকে। অনেক ক্ষেত্রে এসব চক্রের সঙ্গে পরিবহন কর্মচারিদের যোগসাজশও থাকে। পৃথিবীর অন্যান্য দেশে উৎসব-পার্বণে যাত্রী ও ক্রেতাকে বিশেষ ছাড় দেওয়া হলেও আমাদের দেশে হয় উল্টো। প্রায় সব পরিবহনেই টিকেটের দাম বাড়ানো হয়। যাত্রীর কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা হয়, যা সত্যি দুঃখজনক।
ঈদ উপলক্ষে স্বাভাবিক অবস্থার চেয়ে যে কয়েকগুণ বেশি মানুষ চলাচল করে, তাদের নিরাপত্তা নিয়ে কর্তৃপক্ষ আদৌ কতটা গুরুত্ব দেয় সেটা নিয়েও প্রশ্ন আছে। ঈদের আগে কিছু ট্রেনের বগি বাড়িয়ে, সড়কে লোক-দেখানো কাজ করেই তারা দায়িত্ব শেষ করে দেয়। ফলে ঈদযাত্রায় সাধারণ মানুষ শুধু দুর্ভোগেরই শিকার হয় না, বহু পরিবারে ঈদের আনন্দ পরিণত হয় বিষাদেও। প্রকৃতপক্ষে ঈদের সময় বর্ধিত বিপুলসংখ্যক যাত্রীর চলাচল সামাল দিতে প্রয়োজন টেকসই ও কার্যকর পদক্ষেপ। এরূপ পদক্ষেপ কখনো দেখেনি দেশের মানুষ। ভবিষ্যতে দেখবে বলেও বিশ্বাস করতে পারছে না। এরপরও সাধারণ মানুষ চায় তাদের ঈদযাত্রা যেন নির্বিঘ্ন হয়। স্বস্তিতে, নিরাপদে মানুষ আপনজনের কাছে ফিরতে চান। ঈদ শেষে আবার স্বস্তিতে কর্মক্ষেত্রে ফিরে আসতেও চান। এই নিশ্চয়তা তাদের এখনো দিতে পারছে না সরকার ও প্রশাসন। এটাই বড় পরিতাপের! পরিশেষে বলতে চাই, ঈদের আনন্দ হোক সবার জন্য। প্রশাসনের নিকট প্রত্যাশা, ঈদের আনন্দ যেন বিষাদে রূপ না নেয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। এ ছাড়াও আমাদের সবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে নিজেদেরও সচেতন হতে হবে। মনে রাখতে হবে, জনসচেতনতাই পারে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে।

আজহার মাহমুদ
খুলশী-১, চট্টগ্রাম

×