
কৃষি শিল্প যে কোনো সমাজ কাঠামোর মূল নিয়ামক শক্তি। আবার ভূমিনির্ভর সামাজিক পরিমণ্ডলে চাষাবাদেই উৎপাদনের নিয়ামক। শুধু ভূমি ঐশ্বর্যেই নয়, বরং সমুদ্র আর নদ-নদী পরিবেষ্টি বাংলাদেশের মৎস্যসম্ভারও সমৃদ্ধ। উৎপাদিত পণ্য দেশের চাহিদা পূরণ করে রপ্তানিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছে। ধন, ধান্যে, পুষ্পে ভরা বাংলাদেশ আপন বৈভবে এগিয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে নতুন উদ্ভাবনী শক্তি আর সক্ষমতায় শিল্পের বিকাশকে যথাসম্ভব এগিয়ে নেওয়া যুগ ও সময়ের দাবি। নতুন যত কিছুই আসুক না কেন ভূমিনির্ভর কৃষিপ্রধান দেশগুলোয় সীমাবদ্ধ জমির সীমানা কখনো বাড়েনি।
উল্টোদিকে বেড়েছে জনসংখ্যার চাপ। জনসংখ্যাবিদ মালথাস সেই ঊনবিংশ শতাব্দীর ক্রান্তিলগ্ন থেকেই আওয়াজ তুলছেন- জনসংখ্যা বাড়ে জ্যামিতিক হারে আর সম্পদ কিংবা উৎপাদন বাড়ে গাণিতিক হারে। এমন কঠিন সত্য বুঝতে মানুষের সময় লেগেছে অনেক। একে তো প্রাকৃতিক দুর্যোগ, তার ওপর ভূমিদস্যুদের অনাকাক্সিক্ষত জোর-জবরদস্তিতে ফসলি জমির ওপর যে অপঘাত সেটা আমাদের শস্যখেতকে নয়ছয় করে দিতে যথেষ্ট। এমন চিত্র ও সংবাদ মাধ্যমে আসতে দেরি হয় না। অঞ্চলভিত্তিক কিছু ক্ষমতাবান শ্রেণির দাপটে কত সরকারি জমি বেদখল হয়ে যাচ্ছে তারও কোনো হিসাব-নিকাশ নেই। তারপরও মাছে-ভাতে বাঙালি প্রবাদটি এখনো হারিয়ে যায়নি।
চলছে বোরো ধানের মৌসুম। মাথার ঘাম পায়ে ফেলে উদয়াস্ত পরিশ্রমে কৃষকরা বিভিন্নরকম ফসল উৎপাদন করে থাকেন। এবার আলুর বাম্পার ফলনে সাধারণ মানুষ উপকৃত হয়েছে, যা এই অঞ্চলের চিরকালের সম্পদ। কিন্তু যাদের কঠিন পরিশ্রমে সাশ্রয়ী আলু আজ গ্রাহককে পরম স্বস্তি দিয়ে যাচ্ছে সেখানে খোদ কৃষকের মাথায় হাত।
কৃষকরা তাদের চাষাবাদের খরচ তুলতেও নাকি এবার হিমশিম অবস্থায় রয়েছেন। তার ওপর বিভিন্ন হাওড় অঞ্চলের কৃষকের দুরবস্থাও লোকচক্ষুর অন্তরালে নেই। হাওড়ের মাঝখানে সড়ক-মহাসড়ক নির্মাণের যে হিড়িক সেখানে কৃষকের কষ্টে উৎপাদিত জমির ফসল বর্ষাকালে পানি জমে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, যা শুধু ফসল ফলানোর ওপরই নয়, বরং চারপাশের পরিবেশ-পরিস্থিতিকেও নাজেহাল করছে। বাংলাদেশে নিত্য-নতুন সড়ক-মহাসড়ক নির্মাণ করা যৌক্তিক হলেও সঠিক পরিকল্পনার অভাবে অনেক সময় নাজেহাল হতে হচ্ছে মানুষকে। দেশের বিভিন্ন হাওড়ের মাঝখানে সড়ক-মহাসড়ক নির্মাণ প্রয়োজনীয় কর্মযোগ সন্দেহ নেই; কিন্তু তার বিপরীত প্রদাহে ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে শস্য-শ্যামল সবুজ বাংলাদেশের উর্বর পলি মাটি। এমনিতেই সময়ের স্রোতে দেশের মাটির উর্বরা শক্তি কমে আসছে, চাষাবাদেও আসছে নানামাত্রিক জটিলতা। তাই ফসলের বীজ বোনা থেকে শেষ অবধি সংশ্লিষ্ট কৃষকদের দুশ্চিন্তায় থাকতে হয়।
কায়িক শ্রম, মজুরি ও ফসল উৎপাদনের ব্যয়ের হিসাব মেলাতে কৃষকের জীবনও যেন এখন স্বস্তিতে কাটছে না। তারা শান্তিতে জীবনযাপন করতে হোঁচট খাচ্ছেন। রাস্তা ও মাটি কেটে পাশে খাল করার কারণে অনেক কৃষকের জমি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, যা তাদের জন্য উন্নয়নের অন্তরায়। আহারের সংস্থানে যদি বিভিন্ন কারণে বিঘ্ন ঘটে তাহলে এক সময় সেই ঘাটতি পূরণ করতে অনেক কৃষককে তাদের শেষ সম্বল জমিটুকুও হারাতে হয়। হারাতে হয় তাদের চাষযোগ্য শস্য-শ্যামল সবুজ খেতের ফসলের সমারোহ। অনেকেই লড়াই-সংগ্রাম করে টিকে থাকলেও দৈনন্দিন অবস্থা খারাপ হতে থাকে। শুধু রাজনীতিবিদই নন, বিত্তবান ভূমি মালিকরাও হরেক কূটকৌশলে কায়দা করে নিজের জমির পরিমাণ বাড়াতে থাকেন, সেটাও কোনোভাবেই চাপা থাকে না। কিন্তু প্রতিকার, প্রতিরোধও সামনে আসে না। ফলে কৃষকদের দৈন্যদশাও কখনো ঘোচে না।
যাদের হাড়ভাঙা পরিশ্রমে আমাদের প্রতিদিনের আহারের সংস্থান হয় তারা কোন যাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছেন ভাবা মুশকিল। আমরা অনেকেই খুব কম সময়ই ভাবি তাদের বিষয়ে। তারপরও দেশের যুগ-যুগান্তরের কৃষিসম্ভার এই বাংলার প্রকৃতির অবদান। সেখানে প্রকৃতির কোলের ছায়ায় বড় হওয়া সন্তানের জীবনযাপনে বৈচিত্র্যপূর্ণ এক ভিন্নমাত্রার অবস্থান।
দেশের বিভিন্ন চরাঞ্চলে কার্পাস তুলা উৎপাদন হয়। সেসবের বাম্পার ফলনের যে ইতিবৃত্ত তাও অঞ্চলভিক্তিক এক অনন্য অবদান। তুলা মূলত পরিবেশ সহায়ক আঁশালো একটি ফসল। এবার আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় তুলার বাম্পার ফলন হয়েছে। ফলে খোদ কৃষকের মুখে তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠেছে। তবে তথ্যপ্রযুক্তির পরম সন্ধিক্ষণে তুলার চাষেও থাকে অনবচ্ছেদ সম্পৃক্ততা। এবার নাকি কম বিনিয়োগে অনেক বেশি লাভবান হয়েছেন তুলা চাষিরা। তবে নিত্য-নতুন প্রযুক্তির উদ্ভাবন যখন এই চাষাাবাদে যুক্ত হয় তখন অধিক উৎপাদনে সংশ্লিষ্ট কৃষকরা আনন্দে আত্মহারা হয়ে উঠেন।
আমাদের নিত্যব্যবহার্য বহু জিনিসে তুলা ব্যবহার ঐতিহ্যিক হলেও আধুনিকতার নির্মাল্যে তার দাম কম নয়। আসলে উর্বর পলি মাটির শাশ্বত বঙ্গভূমি কতভাবেই তার কোলে লালিত মানুষের জীবন পরিপূর্ণতায় ভরিয়ে দিয়েছে তাও এক অনন্য বরমাল্য।
রমজানে এবার বাজারদর সহনশীল পর্যায়ে রয়েছে। পবিত্র রমজান মাসে আমরা প্রয়োজনীয় নিত্যপণ্যের ঘাটতি সেভাবে দেখিনি। বাজার পরিস্থিতিও ছিল সাধারণ মানুষের আয়ত্তে। তবে যারা দিন-রাত অক্লান্ত পরিশ্রমে বাজারের পরিবেশ-পরিস্থিতিকে স্থিতিশীল রাখছেন তাদের জীবনের কাহিনী আমরা কজনইবা জানি। মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের দাম যদি অত্যধিক বৃদ্ধি পায় তা হলে অতি সাধারণ শ্রেণি থেকে মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্ত
সকলকেই কমবেশি দুর্ভোগ পোহাতে হয়।
সমাজের অভ্যন্তরে গড়ে ওঠা কিছু অসাধু ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের কারণে বাজারে দেখা দেয় অস্থিরতা। এই মুহূর্তে দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল হলেও চালের দামে স্বস্তি থাকছে না। চালের দাম বিভিন্ন সময় বেড়ে যাওয়া মানুষকে অস্থিরতায় ভোগাচ্ছে। রমজানের কিছু আগে আবারও তেল নিয়ে তেলেসমাতি দেখা গেছে। এতে স্বল্প আয়ের মানুষ নাজেহাল অবস্থায় পৌঁছায়। তবে তেল উধাও হলে পরবর্তীতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নানা পদক্ষেপে তা স্বস্তিদায়কভাবে বাজারে ফিরে এসেছে। দামও সেভাবে বাড়ানো হয়নি। রমজান মাসে তেল হলো সবচেয়ে প্রয়োজনীয় পণ্য। ছোলা, পেঁয়াজু, বেগুনি- এসব না হলে ইফতারই জমে না। রমজানে আর এক দরকারি খাদ্যপণ্য টমেটো, শসা। এসবের দামও সহনীয় ছিল।
বাংলাদেশের ভূমি উর্বরা শক্তিতে কৃষকদের নানা পণ্য উৎপাদনে সহায়তা করে আজও কোলের সন্তানদের প্রতিদিনের জীবনকে মাছে-ভাতে বাঙালিয়ানায় ভরিয়ে রেখেছে। এবার রমজানে দ্রব্যমূল্য অনেকটাই সহনীয় পর্যায়ে ছিল। পাশাপাশি সাধারণ মানুষের হাতের নাগালে পৌঁছেছে পর্যাপ্ত পণ্য। কৃষি সম্পদে সমৃদ্ধ বাংলা তার চিরায়ত নির্মাল্যে বাঙালি জনগোষ্ঠীকে যেন চিরস্থায়ী বৈভবে ভরপুর রাখে- এই প্রত্যাশা।
লেখক : সাংবাদিক