
বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে, বাঙালিদের অধিকারের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন কিছু অবাঙালিও। যদিও তাদের সংখ্যা ছিল কম। তাদের একজন হাফেজ আব্দুস সাত্তার। ইচ্ছা করলে তিনি পাকিস্তানি সৈনাদের পক্ষ হয়ে নিজেকে রক্ষা করতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা না করে বাঙালিদের অধিকারের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। ১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ পাকিস্তানি সৈন্যদের ধরে নিয়ে যাওয়া পর্যন্ত তিনি ছিলেন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ রাজশাহী জেলা কমিটির ট্রেজারার। হাফেজ আব্দুস সাত্তার ভারতের উত্তর প্রদেশের গাজীপুর সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান ছিলেন। তিনি ছিলেন সর্বভারতীয় রাজনৈতিক দল কংগ্রেসের গাজীপুর কমিটির সাধারণ সম্পাদক। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে পড়ায় তৎকালীন সোফেদা সংস্থার নজরদারিতে পড়ে যান। এ কারণে চলে আসেন সীমান্তের এপারে পূর্ব বাংলার রাজশাহী শহরের গণকপাড়ার বিশিষ্ট ব্যবসায়ী বাবা হাজী নূর মোহাম্মাদের কাছে। অল্প সময়ে তিনি তার চারিত্রিক গুণাবলির মাধ্যমে এ এলাকায় রাজনৈতিক নেতাকর্মী এবং সকলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলেন। হাফেজ আব্দুস সাত্তার ভালো মানুষ হিসেবে সর্বমহলে পেয়ে যান পরিচিতি। সম্পৃক্ত হয়ে যান ব্যবসার পাশাপাশি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে। তিনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে ছিলেন আপোসহীন নেতা।
’৬০ ও ৭০’র দশকে চলতে থাকা পাকিস্তানি স্বৈরশাসকদের ষড়যন্ত্র মেনে নিতে পারেননি তিনি। ১৯৭১ সালের ১ মার্চ থেকে দেশের পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠতে থাকলে অবাঙালি হয়েও তিনি অবস্থান নেন বাঙালিদের পক্ষে। ভূমিকা রাখেন অসহযোগ আন্দোলনে। এ কারণে বাঙালিবিদ্বেষীর কাছে হয়ে যান শত্রু। ২৩ মার্চ পাকিস্তান দিবসে রাজশাহী ভুবন মোহন পার্কে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা তুলতে নিষিদ্ধ পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি (এমএল) নেতা শহীদ ফেরদোস দৌলা খাঁন বাবলু ও অন্যদের সহযোগিতা করেন। ২৫ মার্চ বিকেলে ভুবন মোহন পার্কে ক্রীড়া সংগঠকদের সভা ও সন্ধ্যায় শিল্পীদের অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার জন্য স্বাধীনতাকামীদের অনুপ্রাণিত করেন। ২৫ মার্চ মধ্য রাতে এবং তার পরে পাকিস্তানি সৈন্যদের হত্যাকাণ্ড এবং রাজশাহী পুলিশ লাইন ইস্ট পাকিস্তানি রাইফেলস (ইপিআর) আনসার ক্যাম্পের পতন হলে সকলের মধ্যে ঐক্য বজায় রাখতে অগ্রণী ভূমিকা রাখেন। ২৭ মার্চ দুপুরে জোহরের নামাজের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। তখন পাকিস্তানি সৈন্যরা তার গণকপাড়ার (আইএফআইসি ব্যাংক) বাড়িটি ঘিরে ফেলে। জোর করে তার বাড়ির ভিতরে ঢুকতে গেলে তার বড় ছেলে ইমতিয়াজ তাদের বাধা দিলে সৃষ্টি হয় বিবাদ। পাকিস্তানি সেনারা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করতে থাকলে শহীদ হাফেজ আব্দুস সাত্তার সেখানে এলে পাকিস্তানি সৈনারা তাকে অফিসারের সঙ্গে কথা বলার অজুহাতে গাড়িতে তুলে নেয়। পাকিস্তানি সৈন্যরা তার বড় ছেলে ইমতিয়াজকেও গাড়িতে তুলতে গেলে গাড়িতে থাকা পাকিস্তান সেনাবাহিনীর এক অফিসার তাকে সেখান থেকে সরিয়ে দেয়। বড় ছেলে ইমতিয়াজ ও ছোট ছেলে মুন্নাসহ পরিবারের সকলে রক্ষা পেলেও শহীদ হাফেজ আব্দুস সাত্তার আর ফিরে আসেনি। পারিবারিকভাবে অনেক চেষ্টা করেও তার কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।
অবাঙালি হয়েও স্বাধীনতার জন্য শহীদ হলেন অবাঙালি নেতা হাফেজ আব্দুস সাত্তার। ফলে, পরিবারটি হয়ে পড়ে অসহায়। অবাঙালিরা তাদের বাঙালিদের পক্ষ অভিযোগ দিয়ে হত্যা করার জন্য খুঁজতে থাকে। তিনি ফিরে না এলে পরিবারটি এখানে সেখানে আশ্রয় নেয়। স্বাধীনতার প্রত্যাশায় অন্য শহীদ পরিবারদের মতো এ পরিবারটিও অপেক্ষা করতে থাকে। দেশ স্বাধীনের পর কতিপয় তথাকথিত স্বার্থান্বেষী মহল মুক্তিযুদ্ধে অবদান রাখা পরিবারটিকে অবাঙালি আখ্যা দিয়ে নানা হয়রানি ও বিপদে ফেলে। সরকারের উচ্চমহল বিষয়টি জেনে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে তাদের রক্ষা করে। পরিবারটি নিজেদের চেষ্টায় উঠে দাঁড়ায়। দুঃখজনক হলো, বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য অবাঙালি নেতা শহীদ হাফেজ আব্দুস সাত্তরের অবদানকে এত বছরে কেউ মূল্যায়ন করেনি।
লেখক : সাংবাদিক