ঢাকা, বাংলাদেশ   শনিবার ০১ মার্চ ২০২৫, ১৬ ফাল্গুন ১৪৩১

মধ্যপ্রাচ্য ॥ পরাশক্তিগুলোর নতুন যুদ্ধক্ষেত্র

ড. মো. মোরশেদুল আলম

প্রকাশিত: ২১:০৯, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৫

মধ্যপ্রাচ্য ॥ পরাশক্তিগুলোর নতুন যুদ্ধক্ষেত্র

গাজায় যুদ্ধবিরতি চুক্তির দ্বিতীয় পর্যায় শুরু হওয়ার কথা আগামী কয়েকদিনের মধ্যেই। তবে দ্বিতীয় পর্যায়ে প্রবেশের জন্য ইসরাইল ৪টি শর্ত দিয়েছে। যদি এই ৪ শর্ত পূরণ না করা হয়, সেক্ষেত্রে চুক্তির প্রস্তাবিত দ্বিতীয় পর্যায় শুরুর বিষয়টি পুরোপুরি অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়বে বলে জানিয়েছেন ইসরাইলের জ¦ালানিমন্ত্রী এবং যুদ্ধকালীন মন্ত্রিসভার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সদস্য এলি কোহেন। শর্তগুলো হচ্ছে: ক) ৭ অক্টোবর এবং তার আগে যেসব ইসরাইলকে গাজায় বন্দি করা হয়েছিল তাদের সকলকেই মুক্তি দিতে হবে, খ) গাজা উপত্যকা নিয়ন্ত্রণকারী গোষ্ঠী হামাসকে গাজা থেকে বিদায় নিতে হবে, গ) গাজা উপত্যকাকে অবশ্যই সম্পূর্ণ অস্ত্রমুক্ত করতে হবে এবং ঘ) পুরো গাজা এলাকায় ইসরাইলের নিরাপত্তা সংক্রান্ত নিয়ন্ত্রণ থাকবে। ফিলিস্তিনের গাজা ও পশ্চিম তীর, লেবানন ও সিরিয়ার পর মধ্যপ্রাচ্যের আরেক দেশ ইয়েমেনেও বড় ধরনের হামলা চালিয়েছিল ইসরাইল। ইসরাইলের সামরিক বাহিনীর মুখপাত্র দানিয়েল হাগারি বলেন, হুতি বিদ্রোহীদের সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে এ হামলা চালানো হয়েছে। এর মধ্যে রাজধানী সানা, বন্দর ও জ¦ালানি অবকাঠামো রয়েছে। ইয়েমেন ইসরাইলের হামলাকে ‘বিপজ্জনক পরিস্থিতি’ বলে মন্তব্য করেছে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাস। এক বিবৃতিতে হামাস বলেছে, ‘আমরা এই উসকানিকে বিপজ্জনক পরিস্থিতি এবং ফিলিস্তিনি জনগণ, সিরিয়া ও আরব অঞ্চলে চালানো আগ্রাসনের বিস্তার হিসেবেই দেখছি’। হুতি বিদ্রোহীরাও ইসরাইলে পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর দাবি করেছে। হুতি মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি বলেন, তেল আবিবের নিকটে জাফা এলাকায় ‘দুটি সুনির্দিষ্ট ও স্পর্শকাতর সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে’ হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে হামলা চালানো হয়েছে। এদিকে ইরান-ইসরাইলের পাল্টাপাল্টি হামলা ঘিরে উত্তেজনা তুঙ্গে। মধ্যপ্রাচ্যেজুড়ে চলছে যুদ্ধের দামামা। ইরানের তেহরান, খুজিস্তান ও ইলাম প্রদেশের সামরিক স্থাপনাগুলোতে ইসরাইল হামলা চালিয়েছে বলে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী নিশ্চিত করে। হামলা চালানোর পর ইসরাইল তেহরানকে হুঁশিয়ার করে দিয়ে বলেছে, ইরান যদি আবারও প্রতিশোধমূলক হামলা চালায়, তাহলে সেজন্য তাদের চড়া মাসুল দিতে হবে। গত ১ অক্টোবর ইসরাইলকে লক্ষ্য করে ব্যাপক আকারের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা করেছিল ইরান। এর জবাবেই এ হামলা চালিয়েছে বলে ইসরাইলের প্রতিরক্ষা বাহিনী আইডিএফ জানিয়েছে। আইডিএফ আরও বলেছে, এটি পুরোপুরি পরিকল্পিত এবং সুনির্দিষ্ট অভিযান। এ হামলায় তারা ইরাকের মার্কিন নিয়ন্ত্রিত আকাশসীমা ব্যবহার করেছে বলে ইরানের সেনাবাহিনী দাবি করেছে। সামাজিক মাধ্যম এক্সে পাঠানো এক বার্তায় দানিয়েল হাগারি বলেছেন, ইরানে সামরিক লক্ষ্যবস্তুগুলোতে আমরা সুনির্দিষ্ট হামলা চালিয়েছি এবং ইসরাইল রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক হুমকিগুলো নস্যাৎ করে দিয়েছি। ইরান যদি পাল্টা হামলা চালায়, তবে ইসরাইল প্রতিক্রিয়া দেখাতে বাধ্য হবে বলে তিনি হুমকি দিয়েছেন। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, এ হামলা আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘের সনদের চূড়ান্ত লঙ্ঘন। ইরান জানায়, বহিঃশক্তির এই আগ্রাসী হামলার জবাব ইরান দেবেই। নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রক্ষায় ইরানের মানুষের সব ক্ষমতা ব্যবহারে জোর দিয়েছে ইরান। এর পাশাপাশি আঞ্চলিক শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চায় ইরান।
২০ অক্টোবর সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা জানিয়েছে, ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর বাসভবন লক্ষ্য করে ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটেছে। হামলার সময় তিনি ওই ভবনে ছিলেন না। নেতানিয়াহুর ঘনিষ্ঠ কূটনৈতিক সূত্র ইসরাইলি মিডিয়ায় বলেছে, নেতানিয়াহুকে হত্যা প্রচেষ্টার পেছনে তারা ইরানকে দায়ী বলে মনে করছে এবং এ হামলার প্রতিশোধ নেওয়া হবে। ইসরাইলের ঘনিষ্ঠ মিত্র যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য সংঘাতের বিস্তার না ঘটাতে ইরানের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। ইরানের কয়েকটি সামরিক স্থাপনায় ইসরাইলি সেনারা আগ্রাসী হামলা চালানোর পর নিজের জাতীয় স্বার্থ ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষা করার ক্ষেত্রে তেহরান কোনো সীমারেখা মেনে চলবে না বলে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাইয়্যেদ আব্বাস আরাগচি হুঁশিয়ারি দেন। ইরানের সর্বোচ্চ নেতার অফিসিয়াল ওয়েবসাইটকে প্রদত্ত এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, আমরা একথা সাবেক ইরাকি শাসক সাদ্দাম হোসেনের আট বছরব্যাপী আগ্রাসনের সময় এবং সাম্প্রতিক বছরগুলোর মার্কিন বাহিনীর শত্রুতামূলক পদক্ষেপের বিরুদ্ধে প্রমাণ করেছি। তিনি আরও বলেন, তার দেশ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিশেষ করে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ক্ষেত্রে একথা প্রমাণ করেছে যে, দেশের জনগণকে রক্ষা করার জন্য যে কোনো ধরনের পদক্ষেপ নিতে তেহরান দ্বিধা করে না। ইরান বলছে, তারা আত্মরক্ষার অধিকার রাখে। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান হামলার যথাযথ জবাব দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। ইরানের বিপ্লবী গার্ডের শীর্ষ কমান্ডার হোসেই সালামিও বলেন, ইরানে হামলার জন্য ইসরাইলকে নির্মম পরিণতি ভোগ করতে হবে। ইরানে ইসরাইলের প্রতিশোধমূলক হামলার পর জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠক আহ্বান করা হয়েছে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে পাঠানো এক চিঠিতে ইরানে জাতিসংঘের স্থায়ী মিশন বলেছে, ইসরাইলের কার্যকলাপ ইরানের ‘সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার গুরুতর লঙ্ঘন’ এবং এটি ‘আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘ সনদের একটি সুস্পষ্ট লঙ্ঘন’। তবে ইসরাইলের বিরোধীদলীয় নেতা ইয়ার লাপিদ এ হামলার কঠোর সমালোচনা করেন। তিনি ইরানকে ‘শয়তানের অক্ষের প্রধান’ উল্লেখ করে বলেছেন, ইসরাইলকে এজন্য চড়া মূল্য দিতে হবে। তিনি আরও বলেছেন, ইরানের কৌশলগত ও অর্থনৈতিক স্থাপনায় আঘাত না করে শুধু সামরিক স্থাপনাগুলোতে হামলা প্রতিরক্ষা বাহিনীর খুবই ভুল একটি পদক্ষেপ হয়েছে। উভয়পক্ষের এই পাল্টাপাল্টি হামলার জেরে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা ও যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগের সদর দপ্তর পেন্টাগন ইরানে চালানো ইসরাইলি বিমান হামলার সঙ্গে তারা জড়িয় নয় বলে জানিয়েছে। তবে হামলার পর এ ব্যাপারে মার্কিন প্রেসিডেন্টকে জানানো হয়।
জাতিসংঘে ইসরাইলের রাষ্ট্রদূত ড্যানি দানন ইরানের এই আবেদন ‘আমাদের ক্ষতি করার আরেকটি রাজনৈতিক চেষ্টা’ বলে উল্লেখ করেন। ইসরাইলের বিরুদ্ধে ইরানের আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের অভিযোগকে ‘হাস্যকর’ বলে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, ইরান তার সহযোগী সংগঠনগুলোর পেছনে লুকাতে পারবে না। কারণ ইরান আমাদের হুমকি ও ক্ষতি করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। আর এর জন্য তাকে চড়ামূল্য দিতে হবে। মধ্যপ্রাচ্যে রাশিয়ার ব্যাপক নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বার্থ বিদ্যমান। ইরানের সঙ্গে রাশিয়ার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকায় ওই অঞ্চলে বৃহত্তর সংঘাতের বিষয়ে রাশিয়া উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। রাশিয়া বলেছে, ইরান ও ইসরাইলের মধ্যে চলামন সংঘাতের ‘বিস্ফোরক সম্প্রসারণ’ ঘটতে পারে। এ সংঘাত নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে বলে রাশিয়া সতর্ক করেছে। সংঘাতের অবসানে উভয়পক্ষকে সংযমের আহ্বান জানিয়েছে রাশিয়া। রাশিয়ার প্রেসডিন্ট ভøাদিমির পুতিন ২২-২৪ অক্টোবর অনুষ্ঠিত ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে বলেছেন, আঞ্চলিক দুটি হেভিওয়েট পক্ষের মধ্যে সৃষ্ট উত্তেজনা মধ্যপ্রাচ্যে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধের রূপ পরিগ্রহ করার ঝুঁকি রয়েছে। রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মারিয়া জাখারোভা বলেছেন, তিনি ওই অঞ্চলে চলমান উত্তেজনার বিস্ফোরক বৃদ্ধি নিয়ে উদ্বিগ্ন। তিনি এক বিবৃতিতে বলেন, ‘আমরা সংশ্লিষ্ট পক্ষকে সংযম প্রদর্শন, সহিংসতার অবসান এবং ঘটনার বিপর্যয়কর পরিস্থিতিতে মোড় নেওয়ায় বাধা দেওয়ার আহ্বান জানাই’। তেহরান সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে গাজায় এবং লেবাননে ইসরাইলের যে যুদ্ধ চলছে তা মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে অনেকদূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে সতর্ক করেছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার ক্ষতিকর প্রভাব শুধু পশ্চিম এশিয়া অঞ্চলেই সীমাবদ্ধ থাকবে না বরং অস্থিরতা ও নিরাপত্তাহীনতা অন্যান্য অঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।
তবে ইরানের ওপর ইসরাইলের হামলাকে জোরালো সমর্থন জানিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জার্মানিসহ পশ্চিমা মিত্ররা। তারা নতুন করে সংঘাত বৃদ্ধি না করার কথা বলেছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন বলেছেন, তিনি আশা করেন এটাই শেষ হামলা। জাতিসংঘে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত লিন্ডা থমাস গ্রিনফিল্ড বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র জাতিসংঘে ইরানকে সতর্ক করেছে যে তারা যদি এ অঞ্চলে ইসরাইল বা মার্কিন কর্মীদের বিরুদ্ধে আর কোনো প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ নেয়, তাহলে করুণ পরিণতি হবে। তিনি আরও বলেন, আমরা আত্মরক্ষায় পদক্ষেপ নিতে দ্বিধা করব না, এতে কোনো বিভ্রান্তি না থাকুক। যুক্তরাষ্ট্র আর উত্তেজনা দেখতে চায় না। আমরা বিশ^াস করি ইসরাইল ও ইরানের মধ্যে সরাসরি গুলি বিনিময়ের সমাপ্তি হওয়া উচিত। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা সদর দপ্তর পেন্টাগনের মুখপাত্র প্যাট্রিক রাইডার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এ পোস্টে লিখেছেন, মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী লয়েড অস্টিন ইসরাইলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্টের সঙ্গে কথা বলেছেন। ইসরাইলের নিরাপত্তা ও আত্মরক্ষার অধিকার নিশ্চিত করার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দৃঢ় অঙ্গীকারের কথা তিনি পুনর্ব্যক্ত করেছেন। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার বলেছেন, আমি স্পষ্ট করে বলতে চাই, ইরানের আগ্রাসন থেকে নিজেদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার অধিকার ইসরাইলের আছে। একইরকমভাবে আমি স্পষ্ট করে বলছি, আমাদের নতুন করে আঞ্চলিক উত্তেজনা এড়ানো প্রয়োজন। সংযম দেখানোর জন্য সব পক্ষকে আহ্বান জানিয়ে বলেন, ইরানের পাল্টা জবাব দেওয়া উচিত হবে না। জার্মানির চ্যান্সেলর ওলাফ শলৎজ বলেন, হামলায় ইসরাইলের বেসামরিক হতাহতের ঘটনা এড়াতে চেষ্টা করেছে। দেশটি ইরানের আগের হামলার জবাব দিয়েছে, তার মানে এ উত্তেজনা আর বৃদ্ধি না করার সুযোগ আছে। একই সঙ্গে তিনি ইরানকে উত্তেজনা বৃদ্ধি না করতে সতর্ক করেন। ইউরোপীয় ইউনিয়ন উত্তেজনা এড়াতে সকল পক্ষকে সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছে। তবে এ হামলাকে ‘আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন’ বলে জানিয়েছে মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ভারত, জাপান প্রভৃতি দেশ। সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, ইরাকসহ বিভিন্ন দেশ ইরানে ইসরাইলের হামলার সমালোচনা করেছে। ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরাইলের অবৈধ দখল এখনো মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের মূল কারণ বলে ইন্দোনেশিয়া মনে করে। দ্বিরাষ্ট্র সমাধানের কাঠামোর মধ্যে ফিলিস্তিনের একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাই এই অঞ্চলে শান্তি ফিরিয়ে আনার একমাত্র উপায় বলে জাকার্তা মনে করে। একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের ওপর ইহুদিবাদী ইসরাইলি সরকারের হামলা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। দায়মুক্তির সঙ্গে ইসরাইলের ক্রমাগত হামলা মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করেছে এবং মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যতে স্থিতিশীলতাকে প্রভাবিত করতে থাকবে। যা এ অঞ্চলকে বৃহত্তর সংঘর্ষের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাবে।
মধ্যপ্রাচ্য ঘিরে চলমান পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের উপসাগরীয় অঞ্চলের আরব মিত্রদের স্নায়ুচাপ পড়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। কারণ হলো ইসরাইলের হামলার যথাযথ জবাব দেওয়ার কথা বলছে ইরান। ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সশস্ত্র সংগঠন হামাস ইরানের বিরুদ্ধে ইসরাইলি হামলার নিন্দা জানিয়েছে। একই সঙ্গে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, এ হামলা মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও হুমকির মুখে ফেলেছে। ইসরাইলের সমালোচনা করে ইরাক বলেছে, দেশটি আঞ্চলিকভাবে আগ্রাসী নীতি চালিয়ে যাচ্ছে এবং সংঘাতের বিস্তার ঘটাচ্ছে। আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরানের ভেতর ইসরাইল হামলা করে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে। এ ছাড়া হামলার যুদ্ধ আরও বেড়ে যাওয়ার উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। সেন্টার ফর মিডলইস্ট স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের সিনিয়র রিসার্চ ফেলো আবাস আসলানি এ প্রসঙ্গে বলেন, এটা ইঙ্গিত করছে যে, যুক্তরাষ্ট্র এ অঞ্চলে আরেকটি সর্বাত্মক যুদ্ধ এড়াতে ইসরাইলকে বিরত থাকতে বলছে। তেহরানের প্রতিক্রিয়া দেখে মনে হচ্ছে, ভয়াবহ ও গুরুত্বপূর্ণ কোনো প্রতিক্রিয়া আসতে পারে। যেমন ইসরাইলের বিরুদ্ধে সরাসরি কোনো হামলা। ইরান যে কোনো ধরনের পদক্ষেপ নিতে পারে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি বলেছেন, কীভাবে ইসরাইলের নিকট ইরানের শক্তি প্রদর্শন করা যায়, সেই বিষয়টি ইরানি কর্মকর্তাদের নির্ধারণ করা উচিত। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বাঘাই বলেছেন, ইহুদিবাদী ইসরাইলকে একটি সুনির্দিষ্ট এবং কার্যকর জবাব দেওয়ার জন্য উপলব্ধ সব ধরনের সরঞ্জামের ব্যবহার করবে ইরান। যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ^বিদ্যালয়ের সিনিয়র রাজনৈতিক গবেষক এবং র‌্যান্ডের সেন্টার ফর মিডলইস্ট পাবলিক পলিসির সাবেক পরিচালক ডালিয়া দাসা কায়ে বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে যা আমরা জানি, সেটি যদি সীমিত রাখা যায় তবে এটিই হবে সেরা পরিস্থিতি। কারণ ইসরাইল তাদের আক্রমণ ইরানি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে সীমাবদ্ধ রেখেছে, পারমাণবিক বা তেল অবকাঠামোতে আঘাত করেনি। তিনি আরও বলেন, ইসরাইলের এই সীমিত আক্রমণ ইরানের জন্য পাল্টা প্রতিশোধ না নেওয়ার একটি সুযোগ তৈরি করেছে। তবে ইসরাইল এবং ইরান এখন সরাসরি এবং প্রকাশ্য সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েছে, যা আগের অবস্থা থেকে একেবারেই আলাদা।
এদিকে লেবানন ও হিজবুল্লাহর সঙ্গে ২৭ নভেম্বর ইসরাইল যুদ্ধবিরতি চুক্তি করেছিল। ঠিক একই দিনে সিরিয়ার ইদলিব থেকে বাশার আল-আসাদ সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে বিদ্রোহী গোষ্ঠী হায়াত তাহরির আল-শাম (এইচটিএস)। মধ্যপ্রাচ্যের সর্বশেষ যুদ্ধের মধ্য দিয়ে সিরিয়ায় আসাদ পরিবারের ৫৩ বছরের শাসনের অবসান হয়েছে। বিদ্রোহীদের মাত্র ১২ দিনের বিদ্যুদ্বেগে অগ্রাভিযানের মুখে বাশারের সামরিক বাহিনীর অবিশ^াস্য পরাজয় পশ্চিমা বিশ^সহ আন্তর্জাতিক সব মহলকে বিস্মিত করেছে। সিরিয়ায় বাশার আল-সরকারের পতন মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোকে প্রভাবিত করবে এটাই স্বাভাবিক। অব্যাহত এ উত্তেজনা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার ওপর এর প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। ইসরাইল ও ইরানের মধ্যে চলমান সংঘাত যুদ্ধে রূপ নিলে বিশে^র পরাশক্তিধর দেশগুলোও এতে জড়িয়ে পড়বে। এতে করে পুরো মধ্যপ্রাচ্যই পরাশক্তিগুলোর লড়াইয়ের নতুন এক ক্ষেত্র হয়ে উঠবে।
আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষকদের শঙ্কা, এভাবে পাল্টাপাল্টি হামলা চলতে থাকলে শেষমেশ তা অনিয়ন্ত্রিত ও ভয়াবহ এক পরিণতি বয়ে আনবে মধ্যপ্রাচ্যের জন্য। পুরো অঞ্চলে দাবানলের বেগে যুদ্ধের স্ফুলিঙ্গ ছড়িয়ে পড়বে। যতক্ষণ পর্যন্ত না গাজা এবং বৃহত্তর ফিলিস্তিন সমস্যার সমাধান হচ্ছে, যে কোনো সময় আরও বড় কোনো যুদ্ধ শুরু হয়ে যেতে পারে ইরান-ইসরাইলের মধ্যে। আর তার ধাক্কা সরাসরি মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে লাগবে। মধ্যপ্রাচ্যে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার জন্য আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিকভাবে সমন্বিত প্রচেষ্টা চালানোর কোনো বিকল্প নেই।

লেখক : শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

×