
বাংলাদেশের মানুষের পাখির গানে ঘুম ভাঙে। দিনের আলো ফোটে ফুল ফোটার মতো। মানুষ ব্যস্ত হয়ে পড়ে নানা কাজে। সকাল-দুপুর-বিকেল গড়িয়ে শেষ হয় দিনের আয়ু। ক্লান্ত মানুষ ঘরে ফেরে। হামাগুড়ি দিয়ে সন্ধ্যা নামে। শুরু হয় পাখির কুজন। এই কুজন শুনতে শুনতে গ্রাম-বাংলার কৃষক মাটির পিদিম জ্বেলে খেয়েদেয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। প্রকৃতির এই নিয়ম চলে আসছে যুগ যুগ ধরে। মানুষ প্রকৃতির সন্তান। তাই প্রকৃতির রূপ পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের মন-মানসিকতারও পরিবর্তন হয়। প্রকৃতির কারণেই কখনো মানুষ হয়ে ওঠে বন্ধুবৎসল, কখনো কোমল, কখনো হিংস্র। ভৌগোলিক অবস্থানের ওপর নির্ভর করে মানুষের গঠন, বৈশিষ্ট্য, খাবার-দাবার ও আচার-আচরণ। গরমকালে রাতে ঘুমোতে গেলে যেমন কম্বল লাগে না, ঠিক শীতকালে রাতে কম্বল ছাড়া মানুষের ঘুম হয় না। মানুষ সব সময় জীবনে সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য খোঁজে। খোঁজে আরাম। তেমনি পশুপাখির বেঁচে থাকার তাগিদে এক দেশ থেকে অন্য দেশে উড়াল দেয়। শীতকালের পরিযায়ী পাখির কথাই ধরা যাকÑ হাজার হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে বাঁচার তাগিদে তারা এক দেশ থেকে আরেক দেশে আসে। বাংলাদেশে প্রায় ৬৫০ প্রজাতির পাখি দেখা যায়। এর মধ্যে ৩৫০ প্রজাতির পাখি আবাসিক অর্থাৎ আমাদের আশপাশে সব সময় দেখা যায়। বাকি ৩০০ প্রজাতি পরিযায়ী পাখি আসে একটা নির্দিষ্ট সময়।
এক সময় ধারণা ছিলÑ রাশিয়া ও সাইবেরিয়া থেকে পরিযায়ী পাখি আমাদের অঞ্চলে আসে। কিন্তু বর্তমানে পাখি বিশেষজ্ঞদের ভিন্নমত পাওয়া যাচ্ছে। তাঁরা বলছেন, পরিযায়ী পাখি আসে উত্তর মঙ্গোলিয়া, তিব্বতের একটি অংশ, চীনের কিছু অঞ্চল, রাশিয়া ও সাইবেরিয়ার তুন্দ্রা অঞ্চল থেকে। অর্থাৎ উত্তর মেরু, ইউরোপ ও এশিয়ার কিছু এলাকা ও হিমালয় পর্বতমালার আশপাশের এলাকা থেকে। পাখিগুলো দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে আসে যেখানে তুলনামূলক কম ঠান্ডা পড়ে এবং খাবার পাওয়া যায়। এই পাখিগুলো আবার মার্চের শেষ দিকে যখন বাংলাদেশে গরম পড়তে শুরু করে আর শীতপ্রধান অঞ্চলে বরফ গলা শুরু হয়, তখন দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়ে আগের জায়গায় ফিরে যায়। তবে পাখি বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিযায়ী পাখি শুধু বাংলাদেশে আসে না। বিভিন্ন পরিস্থিতিতে পাখিগুলো বিশ্বের ভিন্ন ভিন্ন অঞ্চলে পরিভ্রমণ করে, যা মূলত তাদের বেঁচে থাকার সংগ্রামেরই অংশ। উল্লেখ্য, পরিযায়ী পাখিগুলোকে অনেকে ‘অতিথি’ পাখি বলে থাকে যা বলা মোটেও সমীচীন নয়। কেননা পাখি বিশেষজ্ঞদের মতে, যে পাখি যখন যে দেশে থাকে তখন সেই দেশের পাখি হিসেবে পরিগণিত হয়।
সব সময় বাংলাদেশে কমবেশি পরিযায়ী পাখির বিচরণ থাকলেও ২৯০ প্রজাতির পাখির দেখা মেলে শীতকালে। সিলেটের হাওর-বাঁওড়, বিভিন্ন জলাশয়ে পাখিগুলোর কলকাকলিতে মুখরিত হয়ে ওঠে। অধিকাংশ পাখি দেখা যায় বঙ্গোপসাগরের কোলঘেঁষে ও মেঘনা নদীসহ বিভিন্ন নদীর মোহনায় জেগে ওঠা কাদাচরে। এ চরগুলোর অবস্থানÑ ভোলা, নোয়াখালী, পটুয়াখারী, বরগুনা, চট্টগ্রাম, কক্সবাজারসহ আশপাশের অঞ্চলে। শীতকালে উপকূলীয় চরাঞ্চলে যে পাখিগুলো দেখা যায় সেগুলো হলোÑ পাতি চকাচকি, খয়রা চকাচকি, পিয়ং হাঁস, মেটে জিরিয়া, পাতি লালপা, পাতি সবুজপা, টেরেক বাটান, জুলফি পানচিল, চাচমঠুঁটো বাটান, কাসপিয়ান পানচিল, পানকৌড়ি, কালালেজ জৌরালি, উত্তুরে লেঞ্জাহাঁস, ইউরেশিও সিঁথিহাঁস ইত্যাদি। তবে সব পাখি সব চরে বিচরণ করে না। যেমনÑ হাতিয়ার দমারচরে মহাবিপন্ন দেশি-গাঙচষা পাখির একমাত্র আবাসস্থল। এ চরে মাঝে মাঝে মহাবিপন্ন চাচমঠুঁটো বাটানের দেখাও মেলে। এ ছাড়া কালামাথা কাস্তেচরা, ইউরেশিয় চামচঠুঁটিও দেখা যায়।
পরিযায়ী জলচর পাখির একটি বড় অংশ দেখা যায় কক্সবাজারের মহেশখালীর সোনাদিয়া দ্বীপসহ আশপাশের ছোট ছোট দ্বীপে। এ দ্বীপেও প্রায় ৪০ থেকে ৫০ প্রজাতির পাখি দেখা যায়। এর মধ্যে মহাবিপন্ন চামচঠুঁটো বাটান পাখিও রয়েছে। চামচঠুঁটো বাটানের জন্য এ দ্বীপ আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত। পাখি গবেষকদের মতে, পৃথিবীতে চামচঠুঁটো বাটান পাখি আছে প্রায় ২০০। এর মধ্যে সোনাদিয়ার সৈকত এলাকায় পৃথিবীর প্রায় ১০ শতাংশ চামচঠুঁটো বাটান পাখি বসবাস করে। সোনাদিয়া দ্বীপসহ উপকূলের অনেক চরেই এমন অনেক বিপন্ন বা মহাবিপন্ন পাখির বসবাস রয়েছে। বিপন্ন এ পাখির তালিকায় আছেÑ নর্ডম্যান সবুজপা, কালামাথা কাস্তেচরা, এশিয় ডাউইচার, কালালেজ জৌরালি, ইউরেশিয় গুলিন্দা, বড় নট, দেশী গাঙচষা ইত্যাদি।
উপকূলের পাশাপাশি শীতে আসা পরিযায়ী জলচর পাখিগুলোর আরেকটি বড় অংশ বসবাস করে সিলেটের হাওরাঞ্চলে। এর মধ্যে মৌলভীবাজার ও সুনামগঞ্জের হাকালুকি হাওর, হাইল হাওর, বাইক্কাবিল, টাঙ্গুয়ার হাওর অন্যতম। এসব হাওরে ছোট-বড় অনেক বিল আছে। শীতে এসব বিলের পানি কম থাকে বলে পরিযায়ী পাখিগুলোর জন্য বসবাস ও খাবারের উপযোগী থাকে। হাওরের বিলে যেসব পরিযায়ী পাখি সচারচর দেখা যায় তার মধ্যে আছেÑ ছোট ডুবুরি, বড় খোঁপাডুবুরি, বড় পানকৌড়ি, ছোট পানকৌড়ি, দেশী কানিবক, ধুপনি বক, লালচে বক, বড় বগা, ছোট বগা, মাঝলা বগা, গো বগা, এশিয় শামখোল, কালামাথা কাস্তেচরা, পাতি শরালি, মেটে রাজহাঁস, খয়রা চকাচকি, পাতি চকাচকি, তিলিহাঁস, পিয়াং হাঁস, সিঁথিহাঁস, ফুলুরি হাঁস, উত্তুরে খুন্তেহাঁস, উত্তুরে ল্যাঞ্জাহাঁস, গিরিয়া হাঁস, পাতি ভূতিহাঁস, টিকিহাঁস, মরচেরঙ ভূতিহাঁস, কোড়া, ধলাবুক ডাহুক, বেগুনি কালেম, পাতিকুট, নেউ পিপি, দল পিপি, কালাপাখ ঠেঙ্গি, মেটেমাথা টিটি, হট টিটি, উত্তুরে টিটি, ছোট নথজিরিয়া, ছোট ধুলজিরিয়া, ছোট বাবুবাটান, পাতি চ্যাগা, ল্যাঞ্জা চ্যাগা, কালালেজ জৌরালি, তিলা লালপা, পাতি লালপা, পাতি সবুজপা, বিল বাটান, বন বাটান, পাতি বাটান, লাল নুড়িবাটান, গুলিন্দা বাটান, খয়রামাথা গাঙচিল, কালামাথা গাঙচিলসহ বিভিন্ন প্রজাতির পাখি। সুন্দরবনের বিভিন্ন অংশে প্রায় ৮০ থেকে ১০০ প্রজাতির পরিযায়ী পাখি দেখা যায়। এর মধ্যে অনেক বিপন্ন ও মহাবিপন্ন পাখি আছে। অন্যদিকে উপকূল, হাওর ও সুন্দরবনের পাশাপাশি রাজশাহীর পদ্মার চরাঞ্চলেও অনেক প্রজাতির পরিযায়ী পাখির দেখা মেলে।
পাখি বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে শীতের সময় জলাশয়গুলোতে পানি কমে গেলে কচিপাতা, শামুক, ঝিনুকসহ কিছু খাবার এসব পাখির প্রিয়। সে কারণে শীতকালে বাংলাদেশের জলাশয়গুলো হয়ে ওঠে তাদের খাবারের উপযোগী স্থান। বাংলাদেশ ছাড়া ভারতেরও কিছু এলাকায় পরিযায়ী পাখিগুলোকে স্বল্পকালীন আবাস গড়ে তুলতে দেখা যায়। আবার নেপালের দু’একটি অঞ্চলেও পরিযায়ী পাখি অল্প হলেও দেখা যায়। এক দশক আগেও যে সংখ্যক পাখি বাংলাদেশে আসত এখন তার সংখ্যা অনেক কমে গেছে। এর কারণ হলোÑ দ্রুত জলাশয় ভরাট হয়ে জনবসতি গড়ে ওঠা, আইন থাকার পরও পাখি শিকারিদের দৌরাত্ম্য, রাসায়নিক সার ও কীটনাশক প্রয়োগের ফলে অনেক কীট-পতঙ্গ মরে যাওয়ায় পরিযায়ী পাখিগুলোর আগের মতো খাবার না পাওয়া, শব্দদূষণ বেশি হওয়ায় পাখিগুলো নিরিবিলি পারিবেশ না পাওয়া ইত্যাদি। যদিও পরিযায়ী পাখিগুলো নিরাপদে বাংলাদেশে অবস্থান করতে পারে সেজন্য বেশকিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে সরকার। অভয়ারণ্য তৈরি হয়েছে, আইনের কঠোর প্রয়োগ বেড়েছে। তৃণমূলে বেড়েছে সচেতনতা।
পাখি প্রকৃতির অলংকার। এদের বিষ্ঠায় জমির উর্বরাশক্তি বৃদ্ধি পায়। ক্ষতিকর কীট-পতঙ্গ খেয়ে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে। কিন্তু জলাশয়গুলো ছোট হয়ে আসা, ঝোপঝাড় ও উঁচু বৃক্ষ কমে যাওয়া, পাখি শিকারিদের উৎপাত বেড়ে যাওয়া, খাবার কমে যাওয়া ইত্যাদি কারণে পরিযায়ী পাখির সংখ্যা দিন দিন কমে আসছে। পাখি প্রকৃতিতে টিকে থাকার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিয়ে সরকারি-বেসরকারি ও ব্যক্তি উদ্যোগে গ্রহণ করতে হবে কার্যকর পদক্ষেপ। তবেই প্রকৃতিতে টিকে থাকবে পাখি।
লেখক : প্রকৃতিবিষয়ক লেখক