
বিশ্বের সর্বক্ষেত্রে সবচেয়ে প্রভাবশালী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে চার বছর ক্ষমতায় থাকা তথাকথিত উদারনৈতিক ডেমোক্র্যাট পার্টির সরকার রক্ষণশীলদের রিপাবলিকান পার্টির কাছে বড় ব্যবধানে পরাজিত হওয়ার পর অনুমিতভাবেই বৈশ্বিক নানা অঙ্গনে ধীরে ধীরে প্রভাব পড়তে শুরু করেছে, যার আঁচ বাংলাদেশসহ কমবেশি সব দেশই এখন অনুভব করছে। গত ২০ জানুয়ারি রক্ষণশীলদের গুরু ও ধনী ব্যবসায়ীদের অতিপ্রিয় ডোনাল্ড ট্রাম্প আনুষ্ঠানিকভাবে প্রেসিডেন্টের মসনদে বসার এক মাসের মধ্যে চারবার সিদ্ধান্ত, বক্তব্য ও মন্তব্য করে নানা সংকটে জর্জরিত বাংলাদেশের জন্য নতুন এক ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন। এর আগে দেশটির ক্ষমতায় বসার পর এত অল্প সময়ে এতবার বাংলাদেশ প্রসঙ্গ টেনে আনেননি কেউ। ট্রাম্পের এসব সিদ্ধান্ত-বক্তব্য-মন্তব্য এবং মার্কিন নতুন প্রশাসনের নীতি-পরিকল্পনা বাংলাদেশের ওপর ইতিবাচক না নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে যাচ্ছে, তা পুরোপুরি স্পষ্ট না হলেও জ্ঞানাভিজ্ঞ অনেকেই মনে করছেন, অতি রক্ষণশীল ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনে বাংলাদেশ যে সামনের দিনে আরও গুরুত্ব পাবে, সেটি নিশ্চিত। তারা মনে করেন, স্বাধীনতা লাভের অর্ধশতাব্দী পরে এসে সম্পূর্ণ নতুন এক বাস্তবতার মুখে পড়া বাংলাদেশের দিকে ‘আগে মুনাফা ও নিজস্বার্থ’ দর্শনে ঘোর বিশ্বাসী ট্রাম্পের বিশেষ এক দৃষ্টি যে থাকবে, সেটি নির্দ্বিধায় বলা যায়, যার প্রমাণ ঘন ঘন তার বাংলাদেশকে স্মরণ।
এমন এক অবস্থাতেই বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সংরক্ষণবাদী নীতি-পরিকল্পনার নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। বিশ্বব্যাপী এই প্রভাবে আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক সংকটে থাকা বাংলাদেশকে কতটা ক্ষতির মুখে ফেলবে, সেদিকে আলোকপাত করা এখন জরুরি হয়ে পড়েছে। কারণ, যুক্তরাষ্ট্রের কয়েক দশকের ইতিহাসে ডোনাল্ড ট্রাম্প বিশেষ এক চরিত্র। উপরন্তু ইতিবাচক-নেতিবাচক কর্মকাণ্ডে জীবনসমৃদ্ধ ভিন্নধর্মী এই মানুষটির কাছ থেকে মার্কিন নাগরিকরা বিপুল কিছু আশা করছেন। কারণ, দুই দশক ধরে দেশটিকে আবারও পৃথিবীশ্রেষ্ঠ করার ধোঁয়া তুলে ট্রাম্প তাদের স্বপ্ন দেখিয়েছেন, যা এখন বাস্তবায়ন করার সময়। ট্রাম্পের দ্বিতীয় এই জমানায় বিশ্ববাণিজ্যে শুল্ক আরোপের হুমকি-ধমকির পাশাপাশি বাংলাদেশসহ অনেক দেশে বৈদেশিক সহায়তা বন্ধ করে দেওয়া এবং বাংলাদেশের জনগণের কাছে চক্ষশূল প্রতিবেশী দেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ বিষয়ক বক্তব্য এবং নাম প্রকাশ না করা অখ্যাত দুটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বাংলাদেশের বামপন্থিদের বাইডেন প্রশাসনের ২৯ মিলিয়ন অর্থায়নসহ ইত্যাদি বিষয়ে কমবেশি অনেক আলোচনা হয়েছে। তাই এসব নিয়ে চর্বিত চর্বন না করে বর্ণিল চরিত্র্যের অধিকারী ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ কিছু বৈশিষ্ট্যের দিক তুলে ধরা যাক। এতে করে বাংলাদেশের আগামী দিনের সমাজ-রাজনীতি এবং বিশেষত অর্থনীতিতে নয়া মার্কিন নীতি-পরিকল্পনার সম্ভাব্য প্রভাব আঁচ-অনুমান করা সহজ হবে। এর কারণ হচ্ছে, আমরা পছন্দ করি বা না-করি মার্কিন প্রেসিডেন্ট পদটি শুধু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রই নয়, গোটা বিশ্বের জন্যই এক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এ কথা সুবিদিত যে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের জ্ঞানী-গুণী ও মেধাবীদের সর্বোচ্চ পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উন্নয়নে কাজে লাগানো, দেশে দেশে উগ্রপন্থিদের বিরুদ্ধে লড়াই কিংবা উন্নয়ন খাতে সহায়তা করা, আবার অবাধ্য দেশগুলো (মার্কিন নীতিতে রটেন অ্যাপল বা পচা আপেল) শায়েস্তা করতে উগ্র মতাদর্শপন্থিদের অর্থ-অস্ত্র-মন্ত্রণা দেওয়া কিংবা সরকার উৎখাতে ভূমিকা রাখাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিশ্বের অন্যতম বড় পরাশক্তিদের কিছুটা হলেও ভূমিকা থাকে। আর ভূমিকা যদি না-ও থাকে, তবু সবার আগে কারও নাজুক অবস্থায় সর্বোচ্চ ফায়দা লোটা পরাশক্তিদের লিখিত-পড়িত নীতি। এ রকম এক বিশ্ববাস্তবতায় অনেক আগে থেকেই ভুল পথে যাওয়া সমাজতান্ত্রিক মতবাদ দিয়ে পরাশক্তি বনে যাওয়া সোভিয়েত রাশিয়া ১৯৯০-এর দশকে ভেঙ্গে টুকরো টুকরো হয়ে যাওয়ার পর ৩০ বছর ধরে বিশ্বের একচ্ছত্র অধিপতি ও একমাত্র পরাশক্তি হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিজের অবস্থান পাকাপোক্ত করে নিয়েছে। ওসামা বিন লাদেন ও আল-কায়েদার টুইন টাওয়ার হামলার পর বিশ্বের হেন কোনো দেশ নেই, যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চোখ রাঙানির মুখে পড়েনি। বলা যায়, ২০ বছর ধরে দেশটি বিশ্বজুড়ে একটানা দাবড়ে বেরিয়েছে, যার কিছুটা ছেদ পড়ে ২০০৮-০৯ সালে সাব-প্রাইম অর্থনৈতিক মন্দাকালে। এই সময় থেকে দেশটি বিশ্বব্যাপী যুদ্ধ-যুদ্ধ খেলায় সতর্কতা অবলম্বন শুরু করে। আর তখনই খোদ যুক্তরাষ্ট্রের জ্ঞানী-গুণী ও সমরবিদ মহল বলতে শুরু করে, প্রায় দুইশ’ বছর আগে শুরু হওয়া মার্কিন সভ্যতার পতনপ্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে। তাঁরা তত্ত্ব-তথ্য-পরিসংখ্যান দিয়ে দেশটির আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক ব্যবস্থার গভীরে ক্ষয়-লয়ের চিত্র তুলে ধরে দেশটির অবিসংবাদিত পরাশক্তির মর্যাদা হারানোর পক্ষে যথেষ্ট অকাট্য যুক্তি তুলে ধরেন।
মার্কিন যুুত্তরাষ্ট্রের নির্মোহ পণ্ডিতদের এমন মতবাদ হাজিরের কিছুদিন পরেই বংশগতভাবে আবাসন টাইকুন ডোনাল্ড ট্রাম্প মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হৃতমর্যাদা ফিরিয়ে আনার প্রচারণা দিয়েই তাঁর রাজনৈতিক জীবন শুরু করেন। এর অনেক আগে ১৯৮০-এর দশক থেকে মাঝেমধ্যে প্রকাশ্যে প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতার কথা তিনি বলছিলেন। কিন্তু তার এসব কথা তখন গণমাধ্যমে ব্যাপক প্রচারণার কৌশল হিসেবে খারিজ করা হতো। অনেকে আবার ঠাট্টা-তামাশাও করত। উল্লেখ্য, ১৯৯০ সালে যখন মার্কিন অর্থনীতি মন্দার সম্মুখীন হয়, তখন ট্রাম্পের অনেক ব্যবসা চরম ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ৫ বিলিয়ন ডলারের ঋণ পরিশোধে তিনি সমস্যায় পড়েন, যার মধ্যে প্রায় ৯০০ মিলিয়ন ডলারই তিনি ব্যক্তিগতভাবে নিশ্চিত করেছিলেন। একসময় একটি পুনর্গঠন চুক্তির অধীনে ট্রাম্প কয়েকটি ব্যাংকের সঙ্গে সমঝোতায় আসতে বাধ্য হন। এর ফলে তিনি তার এয়ারলাইনস ব্যবসা হারান, যা ইউএস এয়ারওয়েজ অধিগ্রহণ করে। এর কিছুদিন আগে ২০১৮ সালে দ্য নিউইয়র্ক টাইমস একটি দীর্ঘ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করে, যেখানে দেখানো হয় যে ট্রাম্পের বাবা ফ্রেড ট্রাম্প নিয়মিতভাবে বিশাল কয়েকশ’ মিলিয়ন ডলারে তার সন্তানদের কাছে হস্তান্তর করেছিলেন কর, সিকিউরিটিজ এবং রিয়েল এস্টেট জালিয়াতির মাধ্যমে। আর এসব মিলিয়েই তিনি ২০২০ সালে জো বাইডেনের কাছে পরাজিত হন এবং মাতৃভূমিকে আবারও শ্রেষ্ঠ করার স্বপ্নে আপাতত বিরতি টানেন। তবে নির্বাচনে হেরে নিজের সমর্থকদের তিনি কংগ্রেসের বৈঠক চলাকালীন ক্যাপিটাল বিল্ডিং আক্রমণে উসকে দেন। ট্রাম্পের বিরুদ্ধে জালিয়াতি, ধর্ষণ থেকে শুরু করে রাষ্ট্রবিরোধী কত যে মামলা হয়েছে, তা হিসাব করাও কষ্টকর। তবে বারবারই আদালত তাকে নানা দোষে দোষী সাব্যস্ত করলেও শাস্তি স্থগিত করে দিয়েছে। এই ডোনাল্ড ট্রাম্পই ভূমিধস বিজয় নিয়ে ২০২৪ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে দ্বিতীয় মেয়াদে মসনদে বসেছেন এবং ইঙ্গিত দিয়েছেন ইতিহাস সৃষ্টি করে ২০২৮ সালেও তিনি প্রেসিডেন্ট হবেন।
ইতিহাসের অমোঘ নিয়মে ক্ষয়িষ্ণু হলেও এখনো সব দিক দিয়ে বিশ্বে সর্বাধিক ক্ষমতাধর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যার মসনদে আবারও বসেছেন এমন বিচিত্র এক ব্যক্তিত্ব, যিনি যুক্তরাষ্ট্রকে আবারও শ্রেষ্ঠত্বের আসনে বসানোর পণ করেছেন। বিশ্ব ইতিহাসে পড়ন্ত শক্তির পুনরুত্থানের নজির না থাকলেও ট্রাম্প বিশ্ব অর্থনীতিতে উৎকণ্ঠায় ফেলে দিয়েছেন। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের জন্য ট্রাম্পের নতুন করে পাওয়া জমানা কী প্রভাব বয়ে আনে, সেদিকে অনেকে দৃষ্টি রাখছেন। এর মধ্যে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, বাংলাদেশের নেতৃত্বে আছেন দেশের একমাত্র নোবেল পুরস্কারজয়ী অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস, যার সঙ্গে ট্রাম্পের বিরোধী পক্ষ ডেমোক্র্যাট পার্টির ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক সর্বজনবিদিত। ফলে কেউ কেউ বলছেন, ট্রাম্প বাংলাদেশকে এখন থেকে নজরে দেখবেন। তবে দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রীয় নীতি-চরিত্র ও ট্রাম্পের সংরক্ষণবাদী মতাদর্শের বিশ্লেষণ করে অনুমান করা যায়, ট্রাম্প বাংলাদেশের পেছনে তার টাকা ব্যয় করা কমিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানির প্রধান বাজারকেও এক ধাক্কা দিতে পারেন। এক্ষেত্রে তাকে রুখতে পারে কেবল বাংলাদেশের ঐতিহাসিক এক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট। এই প্রেক্ষাপটে যদি তার দেশের সুদূরপ্রসারী ফায়দা বেশি হয়, তাহলে ট্রাম্প হয়তো ক্ষান্ত হবেন। এমন আশঙ্কার কারণ হচ্ছে, প্রেসিডেন্ট হয়েই ট্রাম্পের ফ্যাশন শিল্পে বিপ্লব আনার নীতি ঘোষণা। ঐতিহাসিক এক ভাষণে ক্ষমতায় বসার দ্বিতীয় দিনই অর্থাৎ ২২ জানুয়ারি ট্রাম্প ১৫০ বছর আগে তার দেশে উচ্ছিষ্ট ঘোষিত ফ্যাশন, পোশাক ও টেক্সটাইল শিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করার লক্ষ্যে বিস্তৃত এক নীতিমালা ঘোষণা করেছেন, যা উৎপাদন, টেকসই ও পোশাক খাতের শ্রমনীতিতে বড় পরিবর্তন আনতে পারে। ট্রাম্প বলেন, ‘অনেক আগে আমেরিকার ফ্যাশন শিল্পকে বিদেশে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং অবমূল্যায়ন করা হয়েছে। আজ আমরা নতুন অধ্যায়ের সূচনা করছি, যেখানে আমেরিকান সৃজনশীলতা ও কারুকাজ আবারও বিশ্ব নেতৃত্ব দেবে।’ নীতিমালা ঘোষণায় তিনি বিদেশ থেকে আমদানি কমাতে ‘মেড ইন আমেরিকা’ কর ছাড়, এক বিলিয়ন ডলারের টেকসই ফ্যাশন তহবিল, গার্মেন্টস শ্রমিকদের জন্য অধিক সুরক্ষাসংবলিত কঠোর শ্রমনীতি-অধিক মজুরি-উন্নত কর্মপরিবেশ নিশ্চয়তা, দক্ষতা উন্নয়ন ও শিক্ষানবিসদের জন্য বিশেষ ফেডারেল তহবিল বরাদ্দ করেন। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, তিনি বিশেষ কিছু দেশের টেক্সটাইল ও পোশাক পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপের কথা জানিয়েছেন, যা হবে অন্যায় বাণিজ্য ও দুর্বল পরিবেশগত মানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার যুক্তিতে। এতে দেশটিতে আমদানি পোশাকের দাম বাড়বে, বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে বড় পরিবর্তন আসবে। এ ছাড়াও তিনি দেশীয় উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক ও টেক্সটাইল উৎপাদনকারী যে কোনো কোম্পানিকে বড় অঙ্কের কর ছাড়ের ঘোষণা দেন। ট্রাম্পের ওই ঘোষণার সঙ্গে এক মাসের মধ্যে চারবার বাংলাদেশকে স্মরণ করার যোগসূত্র আছে বলে অনেকে মনে করছেন। তাদের মতে, ট্রাম্প পোশাক রপ্তানিকারী কিছু দেশ বলতে চীন, বাংলাদেশ, ভিয়েতনাম ও ভারতকে বুঝিয়েছেন। তবে বাংলাদেশের মধ্যে অনেকে মনে করেন, বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধানের প্রভাব ও ভাবমূর্তি হয়তো বাংলাদেশকে এ যাত্রায় কিছুটা হলেও রক্ষা করতে পারে। এমনটা যদি হয়ও, তারপরও রপ্তানি স্থিতিশীল থাকার নিশ্চয়তার বিনিময়ে বাণিজ্য সম্পর্কের ক্ষেত্রে ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ মতবাদ দ্বিপক্ষীয় চুক্তিগুলোর ওপর কঠোর নজরে রাখবে। এর আরেকটি অর্থ হচ্ছে, ট্রাম্প ক্রমাগত নতুন করে শুল্ক-নিষেধাজ্ঞার হুমকি দেবেন এবং ফাঁকে ফাঁকে কিছু না-কিছু অবশ্যই হাতিয়ে-বাগিয়ে নেবেন। কেননা, উত্তরাধিকার সূত্রে কথার ফুলঝুড়ি দিয়ে মুনাফা করতে শেখা ট্রাম্পের রক্তে রক্তে মুনাফা চিন্তার স্রোত চলে বলে তার ঘনিষ্ঠরা মনে করেন। তা ছাড়া তিনি নিজেই বলেছেন, জীবৎকালে কোনো কিছুই কাউকে তিনি মুফতে দেননি।
পরিশেষে বলে রাখা ভালো, অতীতে দেখা গেছে যে, রাষ্ট্র পরিচালনার রাজনৈতিক দর্শনে ট্রাম্পের কাছে অন্য দেশের মানবাধিকারের কোনো মূল্য নেই, অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থই তিনি সর্বাগ্রে অগ্রাধিকার দেন। এজন্য তিনি সরাসরি হস্তক্ষেপ করে অর্থ ব্যয়ে একদম নারাজ। এটি সত্যি হলে, বাংলাদেশে মাসছয়েক আগে ঘটে যাওয়া চরম মানবাধিকার লঙ্ঘন ট্রাম্পকে সম্ভবত খুব একটা নাড়া দেবে না। যার প্রমাণ পাওয়া যায় বাংলাদেশে নামসর্বস্ব দুটি প্রতিষ্ঠানে ‘গণতন্ত্র ও বামপন্থি’সংশ্লিষ্ট কাজে তার দেশের ২৯ মিলিয়ন ডলার ব্যয়ের ইঙ্গিতপূর্ণ কটাক্ষের মাধ্যমে। ট্রাম্পের এই কটাক্ষ বাংলাদেশের জন্য যত না বেশি অবমাননাকর, তার চেয়ে বেশি অবমাননাকর খোদ ট্রাম্পের প্রিয় দেশের জন্যে। কারণ, বিশ্বের সবচেয়ে কঠিন সব শর্ত ও পরীক্ষায় উতরে গেলেই কেবল বাইরের কোনো দেশের কোনো প্রতিষ্ঠান মার্কিন তহবিল পেতে পারে। দীর্ঘ প্রক্রিয়া ও যাচাই-বাছাই শেষে যে প্রতিষ্ঠানই সহায়তা তহবিল নামে ডলার পাক না কেন, ওই টাকাও অর্ধেকই প্রকল্প চলার সময়ই দেশটির পরামর্শকরা নিজ দেশে ফেরত নিয়ে যান। এসব তহবিল প্রকৃত অর্থে আইওয়াশ এবং অন্য দেশকে নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখার কৌশল। এমন এক অবস্থায় বাংলাদেশের এখন উচিত হবে, মার্কিন সভ্যতার (আসলে অসভ্যতা!) অত্যাচার থেকে মুক্তি পেতে উদগ্রীব অনেক দেশের মতো বাংলাদেশকেও দ্বিপক্ষীয় চিন্তায় আগে নিজের স্বার্থটাই দেখতে হবে।
লেখক : অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়