ঢাকা, বাংলাদেশ   বৃহস্পতিবার ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, ১৫ ফাল্গুন ১৪৩১

বায়ু বিদ্যুৎ খাতের সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ

রাকিব হাসান

প্রকাশিত: ১৭:৩৭, ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৫

বায়ু বিদ্যুৎ খাতের সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ

বাংলাদেশে ক্রমবর্ধমান বিদ্যুৎ চাহিদা মেটাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে। এর মধ্যে বায়ু বিদ্যুৎ অন্যতম সম্ভাবনাময় উৎস। দেশের ভূগোল, উপকূলীয় অঞ্চল ও মৌসুমি বাতাসের প্রভাব বিবেচনায় বায়ু বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য বেশ কিছু সম্ভাবনাময় স্থান রয়েছে। তবুও, নানা চ্যালেঞ্জ ও সীমাবদ্ধতার কারণে এ খাতটি এখনো তেমন বিকশিত হয়নি।
বায়ু বিদ্যুতের সম্ভাবনা: বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল, বিশেষ করে কক্সবাজার, কুয়াকাটা, পটুয়াখালী এবং সেন্টমার্টিন এলাকায় বায়ুর গতি ও ঘনত্ব বায়ু বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য উপযুক্ত। বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ডের তথ্য অনুযায়ী, উপকূলীয় এলাকাগুলিতে বায়ুর গতি ৫-৬ মিটার/ সেকেন্ড, যা বায়ু টারবাইন পরিচালনার জন্য যথেষ্ট। আশার কথা এই যে বাংলাদেশ পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট বোর্ড ও বাংলাদেশ এটোমিক এনার্জি কমিশন বেশকিছু এলাকায় বায়ু গতির পরিমাপ ও সম্ভাব্যতা যাচাই করেছে। কক্সবাজার ও পটুয়াখালীতে পরীক্ষামূলকভাবে কিছু বায়ু টারবাইন স্থাপনও করা হয়েছে।
প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে ৩০০-৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ বায়ু উৎস থেকে উৎপাদন সম্ভব। বিশেষ করে, সাগর উপকূল ও সমুদ্রের কাছাকাছি এলাকা অফশোর উইন্ড ফার্মের জন্য অত্যন্ত সম্ভাবনাময়। যা বাস্তবায়ন করা গেলে বিদ্যুতের সমস্যা অনেকাংশে কমে যাবে।
বর্তমানে বাংলাদেশে বায়ু বিদ্যুৎ উৎপাদন খুবই সীমিত। তবে পরিকল্পনা কিছু পরীক্ষামূলক প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে। যেমন, কুয়াকাটা বায়ু বিদ্যুৎ প্রকল্প: পটুয়াখালী জেলার কুয়াকাটায় ২ মেগাওয়াটের একটি বায়ু বিদ্যুৎ প্রকল্প চালু করা হয়েছে, যা পরীক্ষামূলকভাবে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে। কক্সবাজার উইন্ড ফার্ম : কক্সবাজারে ৩০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন একটি উইন্ড ফার্ম নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে, যা বাস্তবায়িত হলে দেশে বায়ু বিদ্যুৎ উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হবে। যদিও সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে ১০% নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, যার মধ্যে বায়ু বিদ্যুৎ একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হবে।
চ্যালেঞ্জ ও সীমাবদ্ধতা : বাংলাদেশে বায়ু বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা থাকলেও বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। উন্নত প্রযুক্তি এবং দক্ষ টারবাইন সরবরাহের অভাব বায়ু বিদ্যুৎ উৎপাদনে অন্যতম বড় বাধা। অধিকাংশ যন্ত্রাংশ বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়, যা ব্যয়বহুল। উপকূলীয় এলাকায় প্রয়োজনীয় অবকাঠামো (যেমন-সড়ক, ট্রান্সমিশন লাইন) না থাকায় টারবাইন স্থাপন ও রক্ষণাবেক্ষণে সমস্যা হচ্ছে। বাংলাদেশে বায়ু বিদ্যুৎ খাতে প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং অভিজ্ঞ জনবলের অভাব রয়েছে। ফলে এ খাতে গতি আসছে ধীরগতিতে। উপকূলীয় এলাকায় ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের ঝুঁকি থাকায় টারবাইন স্থাপনে অতিরিক্ত সুরক্ষা ব্যবস্থা প্রয়োজন, যা খরচ বাড়ায়।
চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় করণীয় : বায়ু বিদ্যুৎ উৎপাদনে চ্যালেঞ্জ থাকলেও তা অসম্ভব নয়। যথাযথ পরিকল্পনা, সু-কৌশল ও মাঠ পর্যায়ের শ্রমের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা সম্ভব। যেমন, বায়ু বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনাময় স্থান চিহ্নিত করতে আরও ব্যাপক গবেষণা ও সমীক্ষা প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক সংস্থা ও বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে উদারনীতি ও প্রণোদনা ঘোষণা করতে হবে। স্থানীয় পর্যায়ে প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ ও দক্ষ জনবল গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া উচিত। যাতে দেশের অভ্যন্তরে কর্মসংস্থানেরও সুযোগ বাড়বে। উপকূলীয় এলাকায় প্রয়োজনীয় অবকাঠামো (যেমন- সড়ক, ট্রান্সমিশন লাইন) উন্নত করতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। বায়ু টারবাইনগুলোকে ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস থেকে সুরক্ষিত রাখতে আধুনিক প্রযুক্তি ও নকশা ব্যবহারের উদ্যোগ নিতে হবে।
বাংলাদেশে বায়ু বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যাপক সম্ভাবনা থাকলেও এর সঠিক বাস্তবায়নে নীতিগত সহায়তা, আধুনিক প্রযুক্তি ও দক্ষ জনবলের প্রয়োজন। সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগের সমন্বয়ে এ খাতকে আরও সমৃদ্ধ করা সম্ভব। তাই অন্তর্বর্তী সরকারের নীতিনির্ধারকদের কাছে অনুরোধ থাকবে বায়ু বিদ্যুৎ খাতে সুনজর প্রদান করে সঠিক পরিকল্পনা প্রণয়ন করে বায়ু বিদ্যুতের খাতকে বেগবান করা। সঠিক বাস্তবায়ন হলে বায়ু বিদ্যুৎ দেশের জ্বালানি চাহিদা মেটাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে এবং কার্বন নির্গমন কমিয়ে পরিবেশ সুরক্ষায় অবদান রাখবে।
সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা কলেজ

×