
জুলাইয়ের ছাত্র আন্দোলনের গণ-অভ্যুত্থান দেশ ও জাতির জন্য নব আঙ্গিকে সময়ের অভিযাত্রা। লাগাতার যে কোনো শাসন দীর্ঘস্থায়ী বাতাবরণের আবর্তে পড়লে কোনো মঙ্গলযাত্রা দৃশ্যমান হয়ই না। ষোড়শ শতাব্দীতে আধুনিক রাষ্ট্র বিজ্ঞানের জনক ম্যাকিয়াভেলি দৃপ্তকণ্ঠে যে বাণী উচ্চারণ করলেন তা আজও মহিমান্বিত এক বাক্য চয়ন। ‘যে কোনো ক্ষমতা মানুষকে বিকৃত করে চরম ক্ষমতায় মানুষ চরমভাবেই বিকৃত এবং ধিকৃত হতেও সময় লাগে না।’ সেটা স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের জন্যও বহু অপঘাত ও অভিশাপ ডেকে আনে। লাগাতার কোনো অপশাসনই তার যথার্থ জনবান্ধব লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হবেÑ এটাই স্বতঃসিদ্ধ এবং নিয়মের অনুবর্তী। সেটা বিশ^ পরিমণ্ডলে হোক কিংবা পাকভারত উপমহাদেশে শেষ অবধি পাকিস্তান, বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম হয়নি। পাক-ভারত উপমহাদেশে রাজবংশের পর রাজবংশের উত্থান-পতন এ অঞ্চলের এক অবধারিত রাষ্ট্রযন্ত্রের পালাক্রম। ইতিহাসের আলোকে যথা সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হলেও শাসন ব্যবস্থার দুঃসময় পরিস্থিতিকে বেসামাল করে মোড় ঘোরানোর প্রেক্ষাপট ও আর্থ-সামাজিক, রাজনীতির যুগ পরম্পরার বাস্তব দৃশ্যপট তো বটেই। ইতিহাসের ক্রম বিবর্তনের চলমান ধারায় শুধু রাজা বাদশা নন বরং সার্বিক জনগোষ্ঠী ও দীর্ঘশাসন প্রক্রিয়ায় অস্বস্তি আর দুর্ভোগের শিকার হতেও সময় লাগেনি। দিল্লির মসনদ বরাবরই বিভিন্ন রাজবংশ এবং শাসক শ্রেণির পালাক্রমে নবতর আঙ্গিক প্রতিষ্ঠা করাও ইতিহাসের অভিন্ন যাত্রাপথের অনুষঙ্গ। কিন্তু বিজ্ঞ পণ্ডিতরা বলছেন দোর্দণ্ডপ্রতাপ দিল্লির শাসন থেকে আবহমান বাংলা সবসময় মুক্ত, স্বাধীন প্রতিবেশে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো অষ্ট্রিক জাতিগোষ্ঠী।
যারা কখনো কারোর বশ্যতা স্বীকার করা দূরে থাক, শাসনামলের আওতা থেকেও নিরাপদ দূরত্বে শান্তিপ্রিয় জাতি হিসেবে সমৃদ্ধ এক বাতাবরণের অংশীদার। শুধু কি তাই? দীপ্ত অঙ্গীকারে নিজেদের জাতি গোষ্ঠীর সত্তায় বেঁচে থাকারও বলিষ্ঠ এক অভেদ্য অঞ্চল। দিল্লির শাসকবর্গও তেমন মাথা ঘামায়নি বলে সমকালীন লেখক পণ্ডিতদের মতামত স্পষ্ট। সেই অজেয়, উদ্দীপ্ত বাংলা ১৭৫৭ সালে দীর্ঘ রাজবংশের আভিজাত্যে যে আঁচড় বসায় তাও এ অঞ্চলের পরাধীনতার সূতিকাগার। বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজদ্দৌলা তখন মসনদে আসীন। পলাশীর রণক্ষেত্রে তারই সেনাপতি মীরজাফরের বিশ^াসঘাতকতায় যে উদ্দীপ্ত স্বাধীন বাংলার সূর্যাস্ত সেটাই ইতিহাসের অবশ্যম্ভাবী চিরস্থায়ী দুর্ভাগ্য। পরাধীনতার গ্লানির আবর্তে পড়ে বাংলার যে স্বাধীন সূর্য অস্তমিত হয় তা আর কখনো উদিত হয়নি। বরং উপনিবেশিক শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হয়ে ভারত-পাকিস্তান নামে যে দুটো দেশ মানচিত্রে নিজেদের জায়গা করে নেয় সেখানে ইংরেজ শাসনের হরেক দুঃসময়ও জনগোষ্ঠীর যাপিত জীবন ও কর্মযোগকে আলাদা খাতে বইয়ে দিল। ইংরেজ শাসন থেকে মুক্তি পাবার অসম অনাকাক্সিক্ষত নব্য স্বাধীনতা উপমহাদেশের আপামর জনগোষ্ঠীর জীবনকে শান্তি স্বস্তিতে থাকতেই দেয়নি। ১৯৪৭ সালের দেশ বিভাজনের ফলশ্রুতিতে ১৯৪৮ সালে উর্দুকেই পাকিস্তানের একমাত্র ভাষা করার যে আদেশ জারি হয় তার বিরুদ্ধে ক্ষেপে উঠলেন আপামর বীর বাঙালি। যাদের মাতৃভাষার প্রতি নিবেদন, অহঙ্কার চিরস্থায়ী এক স্বজাত্যবোধ। সেখানে তেমন সমৃদ্ধ ভাষার ওপর অযাচিত অপঘাত বাঙালিরা মেনেই নেয়নি। তাই পাকিস্তান সৃষ্টির ৪-৫ বছরের মধ্যেই বীর বাঙালি আপোসহীন এক রক্তাক্ত বিপ্লবের মুখোমুখি হয়। শুধু তাই নয়, অকাতরে মূল্যবান জীবনকেও শত্রুর সঙ্গে মুখোমুখি দাঁড় করায়। মায়ের ভাষা সুরক্ষিত রাখতে এমন রক্তঝরা প্লাবন আর কোনো জাতির ইতিহাসে আছে কিনা তা অজানাই। তাই ভাষা সংস্কৃতির লড়াইয়েও বীর বাঙালিরা তুলনাহীন। ফেব্রুয়ারির ভাষা সংগ্রামের পালাবদলে আমরা এখন স্বাধীনতার মার্চ মাসের পরম সন্ধিক্ষণে। তবে আমরা আমাদের মাতৃভাষাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি আদায়ে সর্বোত্তম চেষ্টা চালিয়ে যাই। ভাষার প্রশ্নে যে কোনো আপোসহীনতায় মাত্র ২৪ বছরের শাসন-শোষণে একটি স্বাধীন মাতৃভূমির স্বপ্নও ছিল আষ্টেপৃষ্ঠে জড়ানো। তাই ১৯৭১-এর স্বাধীনতার যুদ্ধও বীর বাঙালি আর এক দুঃসাহসিক যাত্রাপথের পরম অভিলাষ। সেই স্বপ্ন ঘেরা চিরস্থায়ী বরণের বরমাল্যে মহিমান্বিত মার্চও আমাদের জাতীয় ইতিহাসের স্বর্ণ অধ্যায়ে পরিণত, আবর্তিত। আমাদের স্বাধীনতা সূর্য উদিত হবার পরম শুভক্ষণে নানামাত্রিক ঘটনা পরম্পরায় লাগাতার শাসন ব্যবস্থা কুক্ষিগত করার প্রক্রিয়াও টিকতে না পারা ধারাবাহিক ইতিহাসের পরম্পরা বলাই যায়। গত শতাব্দীর আশির দশকে এরশাদের লাগাতার দুঃশাসনে ৯০-এর গণ-অভ্যুত্থান পুনরায় জাতিকে নতুন পথের সন্ধান দেয়। তারপর পালাক্রমে সাংবিধানিক ধারা অনুযায়ী ১৯৯১, ৯৬, ২০০১, ২০০৮ পর্যন্ত শাসনামল ছিল ধারাবাহিক নির্বাচন প্রক্রিয়ার বিধিসম্মত যাত্রা। কিন্তু ২০০৯ সালের পর থেকে ২০১৪-এর অপসংস্কৃতি যেভাবে নির্বাচনের শ^াসরোধ করে সেটাও ২০২৪ পর্যন্ত এক লাগাতার অভিঘাত ও অপঘাতের চরম দুঃশাসন। তাই ২০২৪-এর জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানও ছিল একচেটিয়া শাসন-অপশাসনের দুরন্ত পালাক্রমের অপসংস্কার, অপরাজনীতির চরম দাপট, অদূরদর্শিতার ক্ষত-বিক্ষত আঁচড়। যা কোনোভাবেই টিকে থাকার সুসংবদ্ধ ধারাক্রমে ছিলই না। পদে পদে হোঁচট খাওয়া, অত্যাচার, নিপীড়ন, শক্তিময়তার চরম আস্ফালন। এমন অসহনীয় তাণ্ডবে দেশের মূল কাঠামোর ভিত নড়ে ওঠাও পরিবর্তিত সময়ের নতুন আহ্বান। সমাজ ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা তাদের অভিন্ন মতের রূপরেখায় ধারণা দেন পুরনো সমাজের গভীরতম কাঠামোর নতুন আঙ্গিকের আধুনিক বীজ বপন নব সৃষ্টির পরম দ্যোতনা। সেই বিশ^ সৃষ্টির ঊষালগ্ন থেকেই। আমাদের বাংলাদেশও বিভিন্ন দুর্যোগপূর্ণ সময়ে নব সৃষ্টির আন্দোলনে হরেক ঝঞ্ঝা, বিক্ষুব্ধ প্রতিবেশ অতিক্রম করে লাগাতার দুঃশাসনের পরিসমাপ্তি ঘটায়। শুধু তাই নয়, একচ্ছত্র আধিপত্যের বিরুদ্ধেও বিদ্রোহী সত্তায় উদ্বেলিত হয়ে সম্মুখ সময়কে আলিঙ্গন করতে অকুণ্ঠিত থেকেছে। সর্বশেষ বিদায়ী শাসকের লাগাতার ১৬ বছরের দুঃশাসনে যথার্থ নির্বাচন প্রক্রিয়া শুধু অসাংবিধানিকই নয়, মুখ থুবড়েও পড়েছিল। আর এক দুঃসাহসিক নবজাগরণের আধুনিক তরুণ প্রজন্ম যেন পরিত্রাণের বার্তা নিয়ে সারা জাতির মুক্তির নিশানায় সংঘবদ্ধ আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ে। যা অনৈতিক, পুরনো জরাজীর্ণ রাষ্ট্র ব্যবস্থার সমূলে দমকা হাওয়ায় সব যেন ভেঙেচুরে নাড়িয়ে দিল। ঘূণে ধরা শাসনের জমাটবদ্ধ অপসংস্কার কোনোভাবেই আর মাথা তুলতে না পারাও সময়কে নতুন আঙ্গিকে অভিনন্দন জানানো। সমূলে উৎখাত হবার দুরবস্থায় পুরনো অপশক্তি। যা উদীয়মান আধুনিক প্রজন্মের নবদ্যুতির নতুন প্রভাতের সূর্যোদয় তো বটে। তবে দেশ জাতি এখনো নিজেদের শঙ্কামুক্ত করতে আরও সাবধান সচেতনতায় এগিয়ে যাওয়া উদ্ভূত পরিস্থিতির অনিবার্যতা। যার জন্য প্রয়োজন একটি অবাধ, সুষ্ঠু, অংশগ্রহণমূলক জাতীয় নির্বাচন যা এই মুহূর্তে দেশের জন্য জরুরি ও অনিবার্য।