
মসজিদে নববীর অনেক স্থান পবিত্রতা ও স্বমহিমায় উজ্জ্বল। হজ ও জিয়ারতকারীগণ এসব স্থানে ইবাদত বন্দেগির মাধ্যমে সময় কাটানোর জন্য ব্যাকুল থাকেন। তম্মধ্যে একটি স্থান হলো সুতুনে আবু লুবাবা নামক স্তম্ভ। এর মর্যদা বৃদ্ধি ও পটভূমি হলোÑ হযরত আবু লোবাবা (রা.) ছিলেন মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর অন্যতম সাহাবী। খায়বার যুদ্ধের সময় তিনি একটি ভুল করে ফেলেন। সে সময় চুক্তি ভঙ্গের দরুন মহানবী ইহুদিগোত্র বনু কোরাইযা আক্রমণ করেন। তারা তাদের পূর্বের বন্ধু আবু লোবাবাকে ডেকে পাঠায়। আত্মসমর্পণ করলে পরিণাম কি হবে তার নিকট তারা জানতে চায়। হযরত আবু লোবাবা (রা.) গলদেশে হাতের ইঙ্গিত করে বুঝিয়ে দেন যে, শর্তহীনভাবে আত্মসমর্পণ করলে নির্ঘাত কতল করা হবে। বস্তুত চরমভাবে চুক্তিভঙ্গের পরিণাম বনুকোরাইযার এটাই হতে পারত। আহযাব সমরে তারা কোরাইশদের সঙ্গে হাত মিলিয়েছিল। যার ফলে মুসলিম রাষ্ট্র বিলুপ্তি অনিবার্য হয়ে ওঠে। আল্লাহ যদি বিশেষ অনুগ্রহ না দেখাতেন তাহলে বাঁচার উপায় ছিল না। এমতাবস্থায় মুসলমানদের মনোভাবের কথা প্রতিপক্ষকে বলে দেওয়া নেহায়াত অন্যায় ছিল।
হযরত আবু লোবাবা এ কাজ করে বুঝতে পারলেন যে তিনি ভালো করেননি। তাই তিনি মদীনায় এসে মসজিদে নববীতে ওই স্তম্ভে নিজেকে অপরাধীরূপে রশি দিয়ে বেঁধে ফেলেন। আর বলেন, মহানবী রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজ হাতে তার বন্ধন খুলে দিয়ে তাকে মুক্ত না করলে তিনি এরূপে প্রাণ দিবেন। এদিকে মুসলমানগণ পঁচিশ দিন বনু কোরাইযাকে অবরোধ করে রাখেন। তাদের দুর্গটি মজবুত থাকায় তাদেরকে বশ করা যাচ্ছিল না। হযরত আবু লোবাবার পরামর্শে তারা আরও মজবুত হয়ে যায়। মহানবী রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার এ অপরাধকে সহজভাবে নিলেন না। কারণ জাতীয় স্বার্থের বিরুদ্ধাচারণ করা জঘন্য কাজ। অতঃপর তাকে ক্ষমা করার জন্য আয়াত নাযিল হয়।
ছয় দিন অনাহারে ছিলেন তিনি। ক্ষুধার যাতনায় দাঁড়াতে পারছিলেন না। তখন মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজ হাতে তার বাঁধন খুলে দেন। (আসাহ্হুসসিয়ারঃ ৭৫)। মুসলিম জাতির স্বার্থের বিরুদ্ধে যারা আজ আমেরিকা ও ইসরাইলের সঙ্গে সদ্ভাব দেখাচ্ছেন তাদের জন্য আবু লোবাবার স্তম্ভটি হুঁশিয়ারির প্রতীক বলে জ্ঞান করা আবশ্যক। ঐতিহাসিক নিদর্শন এজন্যই সংরক্ষিত রাখা হয়। কিন্তু ইতিহাস হতে শিক্ষা খুব কমই গ্রহণ করা হয়ে থাকে। মুসলিম বিশ্বের নানা দেশে যারা ইসলামী স্বার্থের বিরুদ্ধে চলেছেন তারাও একটু ভেবে দেখবেন। হজ গমনের ফায়দার মধ্যে এটাও একটি বিশেষ দিক। হযরত আবু লোবাবার স্তম্ভটিকে তাওবার স্তম্ভও বলা হয়।
এখানে দু’আ চাইলে গুনাহখাতা মাফ হয়ে যায়। খাইবার সমরের অনেক পর ৯ হিজরী সনের রজব মাসে তাবুক সমরে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে মুসলমানগণ গমন করেন। সকলের জন্য তাবুক সমরে যোগদান করার হুকুম ছিল। কোনো কোনো সাহাবী গ্রীষ্মকালের এ যুদ্ধযাত্রাকে ক্লেশদায়ক মনে করে পাশ কেটে থাকেন। আল্লাহ এবং রাসুল (সা.) জিহাদে গমনের এরূপ অনীহা প্রদর্শনকে অপরাধ বলে গণ্য করেন। তাবুক যুদ্ধে যোগদানে ব্যর্থ সাহাবীগণ নিজেদের অপরাধ স্বীকার করেন অকপটে। কেউ কেউ ওই স্তম্ভের সঙ্গে নিজকে শিকল দিয়ে বেঁধে অপরাধী সেজে ক্ষমার জন্য অপেক্ষা করতে থাকেন। পরে তাদেরও আল্লাহ তায়ালা ক্ষমা করে দেন। তাদের ৫০ দিনের সুদীর্ঘ সামাজিক প্রতিরোধের শাস্তি দেয়ার পর ক্ষমা করা হয়। -(বুখারীঃ ৬৩৪/২)। কাজেই যারা মুসলিম জাতির স্বার্থবিরোধী কর্মে লিপ্ত তাদের তাওবা স্তম্ভ হতে শিক্ষা গ্রহণ করা উচিত।
উস্তাআনা-ই-হান্নানা : আল্লাহপাক তাঁর পয়গাম্বরগণকে বিভিন্ন ধরনের মোযেজা দান করেছেন। হযরত ঈসা (আ.)-এর হাতে মৃতকে জীবিত করেছেন। মৃতের দেহে পূর্বে প্রাণ ছিল। কিন্তু নিষ্প্রাণ বস্তুকে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের স্পর্শে জীবিত হয়ে যেতে দেখা গেল। মসজিদ-ই-নবী প্রথমাবস্থায় খেজুর শাখা দ্বারা আবৃত ছিল। খুৎবা পাঠের জন্য মিম্বর ছিল না। একটি কাটা খেজুর স্তম্ভের ওপর ভর দিয়ে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খুৎবা পাঠ করতেন। পরে কাঠের মিম্বর নির্মাণ করা হয়। আর তিনি (সা.) ওই নবনির্মিত মিম্বরে আরোহণ করে খুৎবা দিতে উঠে দাঁড়ান। পূর্বের খেজুর বৃক্ষটিকে বাদ দিয়ে দেন। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এ আচরণে কাঠটি সশব্দে কেঁদে উঠে। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খুৎবা দান মূলতবী রেখে মিম্বর হতে নেমে আসেন। খেজুর কাঠটিকে বুকে চেপে ধরে তাকে শান্ত¦না দেন। শুষ্ক কাঠটিকে লক্ষ্য করে তিনি বলেনÑ তুমি যদি চাও তাহলে তোমাকে আমি সেখানে রোপণ করে দেব পূর্বে তুমি যেখানে ছিলে। তুমি পূর্বে যেরূপ (সবুজ) ছিলে, তদ্রুপ হয়ে থাকবে। আর যদি চাও তাহলে তোমাকে আমি বেহেস্তে রোপণ করব। তুমি বেহেস্তের নহর স্রোতধারা হতে পানি চুষবে। তোমার সজীবতা বৃদ্ধি পাবে। তুমি ফলদান করবে। আর আল্লাহর আউলিয়াগণ তা খাবেন। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে কাঠটি বেহেশতে রোপিত হতে রাজি বলে দু’বার সম্মতি জ্ঞাপন করে।-মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (লোকজনকে) বলেন, বৃক্ষটি আমার হাতে বেহেশতে রোপিত হতে রাজি হয়েছে।-(খাসাইস-ই-কোবরাঃ ৭৫/২)।
ইমাম বোখারী (রা.) আলোচ্য খেজুর কাণ্ডে নবী বিরহে বিচলিত হওয়ার হাল-হকিকত বর্ণনা করতে গিয়ে হযরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) এর বরাতের হাদিসে উল্লেখ করেনÑ প্রস্তুত হওয়ার পর এক জুমায় মহানবী সাল্লল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মিম্বরে আরোহণ করলেন। তিনি যে খেজুর কাঠের নিকট দাঁড়িয়ে খুৎবা পাঠ করতেন তখন ওটি উচ্চস্বরে চিৎকার দিয়ে উঠল। মনে হচ্ছিল ফেটে পড়বে। এ অবস্থা দেখে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মিম্বর হতে নেমে এসে খেজুর কাঠটিকে জড়িয়ে ধরেন। ক্রন্দনরত বালককে চুপ করাতে গেলে যেরূপ হেঁচকি মেরে কাঁদতে থাকে খেজুর কাঠটি অনুরূপভাবে হেঁচকি মেরে কাঁদতে থাকে। (বুখারী ২৮১/১)।
কিছুদিন নবী (সা.)-এর সঙ্গ পেয়ে মরা খেজুর বৃক্ষ জিন্দা হয়ে গেল। নবী-প্রেম মৃত অন্তরে জীবনী শক্তির সঞ্চার করতে সক্ষমÑ হাদিসটি এ তত্ত্ব প্রমাণ করে। এখানে হাজির হয়ে প্রতিটি মুসলমান নবী-প্রেমের অলৌকিক ঘটনা প্রত্যক্ষ করবে। আর আপন অন্তরে কতটুকু নবী-প্রেম বিরাজ করছে তা আঁচ করে দেখবে। একজন মুসলমানের নিকট এটাই আশা করা যায়। এক বর্ণনায় এসেছে খেজুর কাঠটি এত জোরে চিৎকার করছিল যে, তা শুনে সাহাবাগণ এসে জড় হয়ে যান। আর কাঠটির এ অবস্থা দেখে তাঁরাও কেঁদে ফেলেন। হযরত মুত্তালিব ইবনে আবু অদ্দাআ বলেন, খেজুর বৃক্ষটিকে কি বলব? রাসুল-ই-খোদা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে বস্তুকেই ত্যাগ করেছেন, নবী বিরহে সে বস্তুই বিচলিত হয়ে উঠেছে। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনÑ ‘যার হাতে আমার জীবন, তার কসম করে বলছি, আমি যদি বৃক্ষটি জড়িয়ে না ধরতাম, কিয়ামত পর্যন্ত বৃক্ষটি রাসুল-বিরহে এরূপেই কাঁদতে থাকত।’-(খাসাইস্-ই-কোবরাঃ ৭২/২) হযরত হাসান বসরী উস্তুআনা-ই-হান্নানা- এর বর্ণনার হাদীস শুনলে কাঁদা আরম্ভ করে দিতেন। তিনি বলতেন, একটি শুকনা কাষ্ঠ যদি নবী-বিরহে কাঁদতে পারে তাহলে মানুষের এর চেয়ে বেশি অশ্রুপাত করা উচিত। (মঈনুল হুজ্জাজ ৩৩৬)।
মুসলমান মারা গেলে দাফন-কাফন করা হয়। বৃক্ষের মধ্যে হান্নানা বৃক্ষটিকে অতঃপর ওই স্থানেই মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কবর খুঁড়ে দাফন করে রাখেন। বর্তমানে ওই স্থানে হান্নানা স্তম্ভ নামে নিদর্শন স্বরূপ একটি স্তম্ভ নির্মাণ করা হয়েছে। বুঝে আসে না, নবী-প্রেম কি জীবনহীন জড় পদার্থকেও সঞ্জীবিত করে মাননীয় স্তরে নিয়ে আসে? এ প্রেমের কেমন রহস্য?
লেখক : অধ্যাপক, টিভি উপস্থাপক ও জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত খতিব
[email protected]