
ছবি: সংগৃহীত।
সম্প্রতি একটি বেসরকারি টেলিভিশনের টকশোতে আলোচিত শিক্ষক ও বিশ্লেষক আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল মন্তব্য করেন, “আগে মত প্রকাশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে যে হামলা হতো, তা করত সরকার বা সরকারি দলের ক্যাডাররা। এখন সেই ভূমিকা পালন করছে জনগণেরই একটি অংশ।”
টকশোর উপস্থাপক প্রশ্ন করেন, “আপনি বলছেন, এখন ফ্রিলি কথা বলা যায়। অথচ অনেকেই মনে করেন, আগের ভয়ভীতির পরিবেশ এখনো আছে—শুধু রূপ বদলেছে। আগে হয়তো বিএনপি-জামায়াত বলে ট্যাগ দেওয়া হতো, এখন হয়তো বলা হয় ‘ভারতের দালাল’, ‘ফ্যাসিস্ট’, কিংবা ‘তোসামোদকারী’। পার্থক্যটা কোথায়?”
আসিফ নজরুল উত্তর দেন, “পার্থক্যটা হলো—আগে আক্রমণকারী ছিল রাষ্ট্রের অংশ, এখন সেই জায়গাটা দখল করেছে জনগণের একাংশ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আজকাল ভয়ংকর ট্রল, ব্যক্তিগত আক্রমণ, গালাগাল আর হুমকি-ধামকির পরিবেশ তৈরি হয়েছে। কারো বাড়িতে আগুন দেওয়া, অফিসে হামলার হুমকি, রাস্তায় মারধরের ভয়—এগুলো এখন বাস্তবতা।”
তিনি বলেন, “আমি নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, গত চার মাসে আমার বিরুদ্ধে ১৭টি ভিডিও বানানো হয়েছে। যেসব কথাবার্তা সেখানে বলা হয়েছে, তা ভাবনারও বাইরে। বলা হয়েছে আমি ২০০ কোটি টাকা নিয়েছি, দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত। অথচ এসবের বিরুদ্ধে আমি কোনো মামলা করিনি, কাউকে গ্রেফতার করতে বলিনি।”
তিনি আরও বলেন, “আজকের এই হুমকিদাতা গোষ্ঠীটি সরাসরি সরকারের সমর্থক না হলেও, তারা সরকারের সমালোচনার বিরুদ্ধে দাঁড়াচ্ছে। এতে একটি ‘ধারণা’ তৈরি হচ্ছে যে, সরকার বা তার আশপাশের কোনো গোষ্ঠী তাদের প্রশ্রয় দিচ্ছে।”
আসিফ নজরুল বলেন, “এই যে নতুন রাজনৈতিক গোষ্ঠী বা বয়ান তৈরি হচ্ছে, অনেকেই মনে করেন সেগুলোর পেছনে সরকারি মদদ রয়েছে। একসময় যে ক্যাডাররা সরাসরি দমন করত, এখন সেই ভূমিকা নিচ্ছে বিভিন্ন জনসমষ্টি—যারা একে অপরকে বলছে ‘নাস্তিক’, ‘ভারতের দালাল’, ‘তৌহিদ জনতা’, ইত্যাদি।”
তিনি স্বীকার করেন, “সরকার যদি এই হুমকিগুলো দমন করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে সেটিও সমালোচনার জায়গা। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে সরকারের আরও সক্রিয় হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু সরকারের মদদ আছে কিনা, সে বিষয়ে আমার কাছে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ নেই।”
টকশোর শেষাংশে তিনি বলেন, “আমরা যেভাবে রক্ত দিয়ে এই সমাজ গড়েছি, এখন এই সমাজে এমন ভয় ও সহিংসতা কেন থাকবে—সেটাই স্বাভাবিক মানুষের প্রশ্ন। আইনশৃঙ্খলার কার্ভ ওঠানামা করে, কখনো পরিস্থিতি খুব খারাপ হয়, কখনো সহনীয়। তবে বাস্তবতা হলো, অপরাধের পরিসংখ্যান বলছে—সব ক্ষেত্রে অপরাধ বাড়েনি, বরং কিছু ক্ষেত্রে কমেছে।”
তবে তার মতে, “যন্ত্রণা এখন বেশি অনুভূত হয়, কারণ মানুষ প্রত্যাশার জায়গা থেকে এখন আরও বেশি শঙ্কিত।”
আইন উপদেষ্টা আরও বলেন, “আপনি যখন লোয়ার টায়ার আনতে যান, তখন দেখা যায় তারা ১৫-২০ বছর যাবত বঞ্চিত। তারা যত ভালো অফিসারই হোক, এত বছর ধরে তারা ওএসডি বা চাকরিচ্যুত ছিলেন। এখন যখন আমি তাদের বড় পোস্টে বসাই, তখন তো পুলিশের মূলস্রোতের সঙ্গে তাদের কোনো সংযোগ থাকে না।”
তিনি আরও বলেন, “তাদের মধ্যে অনেকে আবার গোপালগঞ্জের পুলিশ, ছাত্রলীগের পুলিশ—এমন নানা ধরণের পরিচয়ে পরিচিত। মাঝে মাঝে দেখি, সবাই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে সমালোচনা করেন। অথচ এটি যে কতটা কঠিন দায়িত্ব, সেটা বলা কঠিন।”
নুসরাত