
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন দাবি করেছেন, ১৯৭২ সালের সংবিধান মূলত কপি করে তড়িঘড়ি করে তৈরি করা হয়েছিল। গতকাল এক বেসরকারি টেলিভিশনে ইন্টাভিউয়ে অংশ নিয়ে তিনি এই মন্তব্য করেন। সংবিধান প্রণয়নের সময়কার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, গণভোটের বাস্তবতা, এবং মুক্তিযুদ্ধের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সংবিধানের অমিল,বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন সামান্তা শারমিন।
সামান্তা শারমিন বলেন,“ '৭০ সালে যে নির্বাচন হয়েছিল, তার পরে '৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ যারা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন, তারা তাদের মধ্যে অনেকেই সংসদ সদস্য হিসেবে এবং সংবিধানসভার সদস্য হিসেবে সংবিধান প্রণয়ন করে। এবং সেই সময় বাংলাদেশের সংবিধানে গণভোটের কালচার ছিল। মানে সেই সময় গণভোটটাই আসলে ছিল মুক্তিযুদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে তারা ম্যান্ডেট পেয়েছেন। এবং তারপরে তারা সংবিধান প্রণয়ন করেছেন।”
তিনি আরও বলেন,“কিন্তু সে সময় সংবিধান প্রণয়ন কমিটির অনেকেই নানান ধরনের প্রশ্ন তুলেছিলেন। এই সংবিধানের গণতান্ত্রিকতা, এই সংবিধানের যে মূলনীতি, এই সংবিধান অনেক কিছু নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। এবং নানান জাতিসত্তাকে এখানে কিভাবে ইনক্লুড করা হচ্ছে বা তাদের কি অবস্থান হচ্ছে, পরিচয় ইত্যাদি অনেক কিছু নিয়ে এই গণপরিষদ বিতর্ক নামে আমরা যেই জিনিসটা জানি, সেইটাকে কোনভাবে একনলেজ করা হয়নি।”
তিনি বলেন, “আমরা সে সময় দেখেছি এমএন লার্মা এবং সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত,উনারা এগুলো নিয়ে আলাপ তুলেছেন, সেখানে তর্ক-বিতর্ক হয়েছে। কিন্তু তাদের যে কনসার্নটা, আজকে বাংলাদেশে এসেও আমরা দেখেছি, সেই কনসার্নগুলো কোনভাবে সমাধান হয়নি।”
সংবিধান প্রণয়নে তড়িঘড়ি এবং কপি করার অভিযোগ এনে তিনি বলেন,“সেই সময় বাংলাদেশের সংবিধান খুবই তাড়াহুড়ো করে তৈরি হয়েছে। বেসিক্যালি যেটা পাকিস্তানের যে ল ছিল আমাদের শাসন করার, সেই প্রাদেশিক লটাকেই একভাবে আদল পরিবর্তন করে, আর মৌলিক অধিকার সংক্রান্ত তিনটি অধ্যায় এবং মূলনীতিগুলো এড করে এই সংবিধানটা তৈরি করা হয়। এটা খুবই তাড়াহুড়ো করে করা হয়েছে।”
তিনি বলেন, “বাংলাদেশে তখন গণভোটের আয়োজন করা হয়েছিল। কিন্তু সেই ভোটের কোন পরিণতি সংবিধানে কার্যকর হয়নি। গণভোটের রেজাল্ট সংবিধানে প্রতিফলিত হয়নি।”
মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রতিফলন ঘটেনি বলেও অভিযোগ করেন তিনি।“একটা নতুন দেশের সংবিধান, মুক্তিযুদ্ধ মানে এত মানুষের রক্ত দিয়ে যেই সংবিধান আনা হয়েছে, সেই সংবিধানে অবশ্যই আমল পরিবর্তন থাকবে। কিন্তু আমরা দেখছি, আমরা এখন যেই অ্যানালাইসিসগুলো পাই এবং অনেকদিন ধরে বিশেষজ্ঞরা যেটা বলছেন, বাংলাদেশের সংবিধানটা উপনিবেশিক ল অনুসারে তৈরি হয়েছে। সেই সময়ের প্রাদেশিক ল, যেটা পাকিস্তান কপি করেছে, পরবর্তীতে বাংলাদেশ আসলে সেটাকেই কপি করেছে।”
তিনি আরও বলেন,“পাওয়ার স্ট্রাকচারের দিক থেকে দেখলে, সেই উপনিবেশিক কাঠামোই রয়ে গেছে। যে দেশ আপনাকে দমন করত, তার ল যদি আপনি কপি করেন, তাহলে তো মূল কাঠামোয় পরিবর্তন আসেনি। মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে আমাদের যেই বিপ্লবী সংবিধান প্রয়োজন ছিল, সেই ধরনের সংবিধান আমরা পাইনি।”
“ইন্ডিপেন্ডেন্সের ডিক্লারেশনে যেই মূলনীতিগুলো ছিল, সেগুলোর প্রতিফলন সংবিধানে পাই না। মূলনীতিগুলোকে শুধু এটাচমেন্ট হিসেবে রাখা হয়েছে, বাস্তবায়নের কোনও চেষ্টা হয়নি।”
একক ক্ষমতার কাঠামো নিয়েও প্রশ্ন তোলেন সামান্তা শারমিন।“সংবিধানের পুরো পাওয়ার ব্যালেন্সটা প্রধানমন্ত্রীকেন্দ্রিক করে ফেলা হয়েছে। তিনি সরকারি দলের প্রধান, তিনিই ক্যাবিনেটের প্রধান,এটা কি মুক্তিযুদ্ধের আকাঙ্ক্ষা ছিল? এটা তো নয় মাসের একটি দীর্ঘ লড়াই ছিল, সেখানে তো আরও মানুষের ত্যাগ ছিল, আরও সময় ছিল”-বলেন সামান্তা শারমিন।
“পাওয়ার স্ট্রাকচারের মূল ইন্টেনশন ছিল একটি পক্ষকে, একটি দলকে এবং একজন ব্যক্তিকে এমনভাবে শক্তিশালী করা যেন পুরো বাংলাদেশের মানুষকে বিধিবদ্ধ করে ফেলতে পারে। এইটা কখনোই মুক্তিযুদ্ধের আকাঙ্ক্ষা ছিল না।”
তিনি বলেন,“বাংলাদেশে যত রকমের ক্রাইসিস মোমেন্ট এসেছে, সকল সময়ই সাংবিধানিক সংকটের কথা বলা হয়েছে। আওয়ামী লীগ নিজের মতো করে সাংবিধানিক বৈধতা দেখাতে পেরেছে কারণ সংবিধানের মধ্যেই সেই লুপহোল ছিল।”
মূলনীতি বাস্তবায়ন না হওয়ার সমালোচনা করে তিনি বলেন,“যে মূলনীতিগুলো আনা হয়েছে, সেগুলো গালভরা বুলি হয়ে আছে। বাস্তবে কখনোই তা বাস্তবায়নের জন্য কোনও উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক ন্যায়বিচার-এই তিনটি বিষয় যদি বাস্তবায়ন না হয়, তাহলে সংবিধানের মৌল ভিত্তিই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।”
সূত্র:https://tinyurl.com/bvxhrpxk
আফরোজা