
ড. সন্্জীদা খাতুন
পাড়ি দিয়েছেন দীর্ঘ এক জীবন। সমৃদ্ধ সেই মানবিক ও মুক্ত সমাজ বিনির্মাণে রেখে গেছেন অনন্য ভূমিকা। সংস্কৃতিকে সঙ্গী করে ছড়িয়েছেন সম্প্রীতির বারতা। সুরকে হাতিয়ার করে লড়াই করেছেন সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে। সম্প্রীতি ও প্রগতির দেশ গড়ার স্বপ্ন নিয়ে কেটে গেছে মানবতার এই আজন্ম সাধকের প্রতিটি দিন। তিনি হলেন ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ছায়ানটের সভাপতি ড. সন্্জীদা খাতুন।
আজ শুক্রবার সম্প্রতি প্রয়াত এই রবীন্দ্র গবেষক, সংগীতজ্ঞ, সাংস্কৃতিক আন্দোলনের পুরোধা ব্যক্তিত্ব ও লেখিকার ৯২তম জন্মবিার্ষিকী ও ৯৩তম জন্মদিন। ১৯৩৩ সালের এই দিনে ঢাকায় জন্মগ্রহণ করে তিনি। সন্জীদা খাতুন ১৯৩৩ সালের ৪ এপ্রিল ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা বাংলাদেশের জাতীয় অধ্যাপক কাজী মোতাহার হোসেন। মাতা সাজেদা খাতুন। তিনি ১৯৫৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে বিএ অনার্স করেন।
১৯৫৫ সালে বিশ্বভারতী থেকে বাংলা ভাষা সাহিত্যে প্রথম শ্রেণিতে এমএ পাস করেন। একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৭৮ সালে তিনি ‘রবীন্দ্রসঙ্গীতের ভাবসম্পদ’ গবেষণাপত্রে পিএইচডি লাভ করেন। পরে ১৯৮৩-১৯৮৫ সাল পর্যন্ত পিএইচডি উত্তর গবেষণা করেন। তিনি ১৯৫৭ সাল থেকে ভাষা ও সাহিত্য বিষয়ে অধ্যাপনা শুরু করেন। ১৯৯৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে অধ্যাপক হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন।
এক জীবনে বিপুল অর্জন সন্জীদা খাতুনের। সেই সুবাদে তিনি বাংলাদেশ সরকারের একুশে পদক, ভারত সরকারের পদ্মশ্রী, পশ্চিবঙ্গের বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় প্রদত্ত ‘দেশিকোত্তম’ (ডি.লিট), পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের রবীন্দ্রস্মৃতি পুরস্কার, কলকাতার টেগোর রিসার্চ ইনস্টিটিউট থেকে রবীন্দ্রতত্ত্বাচার্য উপাধি, বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, অনন্যা পুরস্কার, বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটির সম্মানজনক ফেলোশিপ, বেগম জেবুননেছা ও কাজী মাহবুবউল্লাহ জনকল্যাণ ট্রাস্টের স্বর্ণপদক ও সম্মাননা, সা’দত আলী আখন্দ পুরস্কার, বিজয় দিবস পদক, ২০০৯ বাংলা একাডেমির রবীন্দ্র-পুরস্কারসহ অসংখ্য পুরস্কার লাভ করেন। এ ছাড়া ভারত সরকার প্রবর্তিত ‘টেগোর অ্যাওয়ার্ড ফর কালচারাল হারমনি’ পুরস্কার দেওয়া হয় ছায়ানটকে। সংগঠনের পক্ষ থেকে তা গ্রহণ করেন তিনি।
সংগঠক সন্জীদা ১৯৬১ সালে জন্মকাল থেকে ছায়ানটের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত। ১৯৭২ সাল থেকে অদ্যাবধি ‘ছায়ানট সঙ্গীতবিদ্যায়তন’-এর অধ্যক্ষ। ২০০১ সাল থেকে ছায়ানটের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। ১৯৮১ সালে প্রতিষ্ঠিত জাতীয় রবীন্দ্রসঙ্গীত সম্মিলন পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য তিনি। এ ছাড়াও ‘নালন্দা’ বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি তিনি। তার বেশ কিছু রবীন্দ্রনাথের এলবাম প্রকাশিত হয়েছে।
সন্জীদা খাতুন লিখেছেন অনেকগুলো বই। এগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত’, ‘রবীন্দ্রসঙ্গীতের ভাবসম্পদ’ ‘ধ্বনি থেকে কবিতা’, ‘অতীত দিনের স্মৃতি’, ‘তোমারি ঝরণাতলার নির্জনে’, ‘রবীন্দ্রনাথ : বিবিধ সন্ধান’, ‘কাজী মোতাহার হোসেন’, ‘রবীন্দ্রনাথের হাতে হাত রেখে’, ‘বাংলাদেশের সংস্কৃতির চড়াই-উৎরাই’, ‘ধ্বনির কথা আবৃত্তির কথা’, ‘সংস্কৃতির বৃক্ষছায়ায়’, ‘স্বাধীনতার অভিযাত্রা’, ‘সাহিত্যকথা সংস্কৃতিকথা’, ‘আমার সোনার বাংলা’, ‘জননী জন্মভূমি’, ‘রবীন্দ্রনাথ এবং রবীন্দ্রনাথ’, ‘রবীন্দ্রনাথ: তাঁর আকাশ-ভরা কোলে’, ‘প্রবন্ধ সংগ্রহ’ ও ‘রবীন্দ্রনাথের গান মননে লালনে’ । গত ২৫ মার্চ রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান সন্্জীদা খাতুন।