ঢাকা, বাংলাদেশ   শুক্রবার ০৪ এপ্রিল ২০২৫, ২১ চৈত্র ১৪৩১

বিমসটেকে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন

তরুণদের চাকরিপ্রার্থী না হয়ে উদ্যোক্তা হওয়ার আহ্বান প্রধান উপদেষ্টার

কূটনৈতিক রিপোর্টার

প্রকাশিত: ২৩:৫২, ৩ এপ্রিল ২০২৫

তরুণদের চাকরিপ্রার্থী না হয়ে উদ্যোক্তা হওয়ার আহ্বান প্রধান উপদেষ্টার

প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস বিমসটেক শীর্ষ সম্মেলন উপলক্ষে ব্যাঙ্ককের থাই প্রধানমন্ত্রীর নৈশভোজে যোগ দেন

তরুণদের চাকরিপ্রার্থী না হয়ে উদ্যোক্তা হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি বলেন, ‘বর্তমান তরুণ প্রজন্ম আগেকার প্রজন্ম থেকে আলাদা। আজকের তরুণরা পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রজন্ম। তাই তরুণরা নিজেদের চাকরিপ্রার্থী না ভেবে উদ্যোক্তা হিসেবে নিজেদের বিশ্বমানচিত্রে পরিচিত করে তুলতে হবে। তাহলেই কেবল টেকসই উন্নয়ন সম্ভব।’
বৃহস্পতিবার থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে বিমসটেক ইয়ং জেনারেশন ফোরামে মূল বক্তব্য উপস্থাপনকালে তিনি এ কথা বলেন। অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের কি-নোট স্পিকার প্রধান উপদেষ্টা নিজেই। 
তরুণদের শুরুতে বা ক্ষুদ্র পরিসরে ব্যবসা চালু করার পরামর্শ দিয়ে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘তুমি একবারে রাতারাতি সবকিছু পরিবর্তন করতে পারবে না। তাই ছোট পরিসরে শুরু করে পরিবর্তনের সূচনা কর।’

‘শুরুতে বড় পরিসরে ব্যবসা চালু করা ভুল পথ বলেও তিনি তরুণ উদ্যোক্তাদের সতর্ক করেন।’ সকলের জন্য টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে তরুণদের সামাজিক ব্যবসায় যুক্ত হওয়ার আহ্বানও জানান ড. ইউনূস।
প্রধান উপদেষ্টা তার বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতার কথা শেয়ার করে বলেন, গরিব মানুষের কর্মসংস্থান দরকার, টাকার না। কিন্তু অন্যরা বলল, অর্থ চাকরির চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আমি বলতে শুরু করলাম ঋণ একজনের মানবাধিকার। তখন বলা শুরু করল, ব্যাংকের ঋণের সঙ্গে মানবাধিকারের সম্পর্ক কী।

একজন মানুষের আশ্রয়ের জন্য, জীবনে চলার জন্য ঋণপ্রাপ্তি মানবাধিকারের মধ্যে পড়ে। তখন আমি ভাবলাম, যদি ব্যাংক ঋণ না দেয় তাহলে আমি কেন তাদের জন্য নিজের ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করছি না। এক ডলার ঋণ দিয়ে শুরু করে আমি নিজের ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করলাম। অনেক সময় লাগল, কিন্তু অবশেষে আমি গ্রামের মানুষের জন্য একটা ব্যাংক তৈরি করতে পেরেছি। সেটা হচ্ছে গ্রামীণ ব্যাংক।
ভূমিকম্পে মিয়ানমার ও থাইল্যান্ডে প্রাণহানির ঘটনায় শোক প্রকাশ করে ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, এই ঘটনা আমাদের মানুষকে রক্ষা করার সক্ষমতার সীমাবদ্ধতাকে তুলে ধরে। প্রকৃতির এই অনাকাক্সিক্ষত আচরণ সম্পর্কে আমরা এখনো আগে থেকে জানতে পারি না।

প্রকৃতিকে বোঝার চেষ্টায় এবং মানুষকে রক্ষায় আমাদের এখনো অনেক পথ পাড়ি দেওয়া বাকি। বাংলাদেশও ভূমিকম্পের ঝুঁকির মধ্যে আছে। সৌভাগ্যবশত আমাদের এখনো এই ধরনের ট্র্যাজেডির মুখোমুখি হতে হয়নি।
তিনি বলেন, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর আমি ১৯৭২ সালের জুনে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশে ফিরে যাই। নতুন একটি দেশে নিজের ভাবনার মতো করে তৈরি করার ইচ্ছায় এবং স্বাধীনতার উচ্ছ্বাসে আমি চেষ্টা করছিলাম জানতে, আমি কী করতে পারি দেশের জন্য। 
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, আমি সারাজীবন চেষ্টা করেছি গ্রামে এমন ধরনের কাজ করতে। এক সময় মনে হলো গ্রামও আমার জন্য অনেক বড় বিষয় হয়ে যায়। আমি পুরো গ্রামের জন্য একা কিছু করতে পারব না। তাই আমি একজন একজন করে কাজ করা শুরু করলাম। আমি তাদের সঙ্গে কথা বলা শুরু করলাম।

তাদের স্থানীয় ভাষা আমার জানা ছিল বলেই কথা বলতে অসুবিধা হয়নি। আমি একজন নারীর সঙ্গে দেখা করলাম, তিনি ঋণ শোধ করতে গিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ছিলেন। তিনি অসাধারণ কাজ করেছেন, কিন্তু তার সেই কাজের ফসল ঋণ শোধের পেছনেই চলে গেছে। কারণ ঋণদাতা তার কাছ থেকে নিজেদের নির্ধারণ করা মূল্যেই তার ফসল নিয়ে যেত।

আমি তাকে বললাম, আমি যদি অল্প কিছু অর্থ দেই, তাহলে সে কি তার পণ্য বাজারে বিক্রি করতে পারবে ? বাজার সম্পর্কে তার কোনো ধারণাই ছিল না। তিনি বললেন, চেষ্টা করে দেখতে পারি। সেটি আমার দেওয়া প্রথম ঋণ ছিল। এটি তাকে অন্যভাবে চিন্তা করার সুযোগ দিল।
সামান্য ঋণ একজনের জীবনে আমূল পরিবর্তন আনতে পারে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমি আমার ক্যাম্পাসের কাছের একটা ব্যাংকে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, গ্রামের এই গরিব মানুষকে ঋণ দিচ্ছেন না কেন। আমার কথা শুনে তিনি আকাশ থেকে পড়লেন এবং বললেন গরিব মানুষকে আমাদের ব্যাংক ঋণ দেয় না। আমি বললাম, আপনার ব্যাংকিং সিস্টেম পুরোই ভুল।

ভুলনীতির ওপর ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। আপনাদের মূলনীতি হচ্ছে যাদের যত বেশি আছে, তাদের আরও বেশি দেওয়া। বিষয়টি এটার বিপরীত হওয়া উচিত ছিল। যাদের কিছুই নাই, তাদের কাছে সবার আগে ব্যাংকের যাওয়া উচিত ছিল। আপনারা সেটি করেন না। সেই পুরনো মূলনীতিই এখন বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে আছে। সমাজকে পরিবর্তন করার যে উদ্দেশ্য, সেটি সেখানেই আটকে আছে। 
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, অল্প অল্প অর্থ ক্ষুদ্র ঋণের মাধ্যমে দিলে সেটি দ্রুত ফেরত আসে এবং বারবার দেওয়া যায়। সেই একই অর্থ বারবার ব্যবহার করা যায়। দান করা অর্থ একবারেই যায়, সেটি আর ফেরত আসে না।

একই অর্থ যদি আমি ঋণ হিসেবে দেই, তার সঙ্গে অপারেশনাল খরচ যুক্ত করে ফেরত নিয়ে আসা যায় এবং এটি বারবার করা যায় এবং বিস্তৃতভাবে করা যায়। লাখ লাখ মানুষের কাছে এই সেবা পৌঁছানো যায়।
বিমসটেক ইয়ং জেন ফোরামে প্রদত্ত মূলপ্রবন্ধ সরাসরি সম্প্রচার করে স্থানীয় গণমাধ্যম। এর আগে স্থানীয় সময় বিকেল সাড়ে তিনটায় প্রধান উপদেষ্টা মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন শুরু করেন।
দুই থাই মন্ত্রীর সাক্ষাৎ ॥ প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন থাইল্যান্ডের সামাজিক উন্নয়ন ও মানব নিরাপত্তাবিষয়ক মন্ত্রী (এমএসডিএইচএস) বরাওয়ুত সিলপা-আর্চা এবং থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় সংযুক্ত মন্ত্রী জিরাপর্ন সিন্ধুপ্রাই। এছাড়াও সম্মেলনে বিমসটেকভুক্ত বিভিন্ন দেশের সরকার প্রধানদের সঙ্গে দ্বি-পক্ষীয় বৈঠক করবেন প্রধান উপদেষ্টা।
থাই প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রণে নৈশভোজ ॥ সর্বশেষ থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রণে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী পেতংতার্ন সিনাওয়াত্রার  আমন্ত্রণে ব্যাংককের একটি হোটেলে বিমসটেক শীর্ষ সম্মেলনের আনুষ্ঠানিক নৈশভোজে যোগ দেন। 
উল্লেখ্য, আজ শুক্রবার ব্যাংককে বিমসটেক সম্মেলনের ফাঁকে বৈঠকে বসবেন ড. ইউনূস ও নরেন্দ্র মোদি। তবে কোন ফরম্যাটে বা কত সময় দুই শীর্ষ নেতা বৈঠক করবেন, সে বিষয়ে এখনো বিস্তারিত জানা যায়নি।

গত ৫ আগস্ট বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে অস্বস্তি তৈরি হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রায় আট মাস অতিবাহিত হলেও এটিই হবে দু’দেশের শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠক।
এর আগে সকাল আটটা ৫৫ মিনিটে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ফ্লাইটে তিনি রওনা হন। বিমসটেকের সম্মেলনে যোগ দিতে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস ব্যাংককে পৌঁছান। বৃহস্পতিবার স্থানীয় সময় দুপুর ১২টার দিকে তিনি ব্যাংকক বিমানবন্দরে পৌঁছান। বিমানবন্দরে তাকে স্বাগত জানান থাইল্যান্ডের মন্ত্রী জিরাপর্ন সিন্ধুপ্রাই।

×