ঢাকা, বাংলাদেশ   শুক্রবার ০৪ এপ্রিল ২০২৫, ২১ চৈত্র ১৪৩১

ট্রাম্পের বাণিজ্যযুদ্ধ শুরু

শতাধিক দেশের ওপর উচ্চ শুল্ক আরোপ

জনকণ্ঠ ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৩:৪০, ৩ এপ্রিল ২০২৫

শতাধিক দেশের ওপর উচ্চ শুল্ক আরোপ

হোয়াইট হাউসের রোজ গার্ডেনে বৃহস্পতিবার বিভিন্ন দেশের ওপর শুল্ক আরোপের চার্ট দেখেন ট্রাম্প

শতাধিক দেশের পণ্যের ওপর নতুন করে উচ্চ শুল্ক আরোপ করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বুধবার স্থানীয় সময় বিকেল চারটায় হোয়াইট হাউজের রোজ গার্ডেনে এক সংবাদ সম্মেলনে নতুন এ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন তিনি। কোন দেশের ওপর কত হারে পারস্পরিক শুল্ক আরোপ হবে, সংবাদ সম্মেলনে তার একটি তালিকা মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিজেই তুলে ধরেন।

তার যুক্তি, নতুন এই ‘রেসিপ্রোক্যাল ট্যারিফ’ বা পাল্টা শুল্ক ব্যবস্থা যুক্তরাষ্ট্রকে ‘ফের সম্পদশালী’ করবে। ট্রাম্পের এই কর্মকা- নিয়ে বিশ্বজুড়ে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে বহু দেশ যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নতুন শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছে। খবর বিবিসি, আলজাজিরা ও সিএনএন অনলাইনের।  
ধারণা করা হচ্ছে, নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে শতাধিক দেশের ওপর আরোপ করা এই শুল্ক বিশ্বব্যাপী অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। অনেক দেশ ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্তকে ‘বাণিজ্য যুদ্ধ’ হিসেবে আখ্যায়িত করছে। অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করেছেন, এই বাণিজ্য যুদ্ধ শুরু হলে তাতে কেউ-ই জয়ী হবে না।
কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্প শুল্ক আরোপের ঘোষণার এই দিনটিকে যুক্তরাষ্ট্রের ‘অর্থনৈতিক স্বাধীনতা দিবস’ হিসাবে অভিহিত করে বলেন, আমরা একটি স্বাধীন ও সুন্দর জাতি হতে যাচ্ছি। তিনি বলেন এবং, এই দিনটিকে আপনারা ভবিষ্যতে স্মরণ করবেন। আপনারাই তখন বলবেন, ‘তিনি (ট্রাম্প) সঠিক ছিলেন’। এই দিনটি আমাদের ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিন।

মার্কিন অর্থনীতিকে পুনর্গঠনের জন্য অন্যান্য দেশের উপর ‘ন্যূনতম ১০ শতাংশ বেসলাইন শুল্ক’ ঘোষণা করেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প, যা আগামী পাঁচই এপ্রিল থেকে কার্যকর হবে। যেসব দেশ শুধুমাত্র এই বেসলাইন শুল্ক’র মুখোমুখি হবে, সেগুলো হলো:
যুক্তরাজ্য, সিঙ্গাপুর, ব্রাজিল, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, তুরস্ক, কলম্বিয়া, আর্জেন্টিনা, এল সালভাদর, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও  সৌদি আরব। এছাড়া, আগামী নয়ই এপ্রিল থেকে আরো প্রায় ৬০টি ওপর উচ্চতর শুল্ক আরোপ শুরু হবে। এই দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন পণ্যের ওপর উচ্চ শুল্ক আরোপ করেছিলো। তবে বুধবার থেকেই বিদেশে প্রস্তুতকৃত অটোমোবাইলের ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ শুরু হচ্ছে।

আর, যুক্তরাজ্যর ওপর ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হলেও ইউরোপিয়ান ইউনিয়নভুক্ত সকল দেশের পণ্য আমদানিতে ২০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। ট্রাম্পের নতুন শুল্ক পরিকল্পনায় দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর পণ্য আমদানিতে যুক্তরাষ্ট্র সর্বনি¤œ ১০ শতাংশ থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ৪৮ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করেছে। এশিয়ার দেশগুলোর ওপর আরোপিত শুল্ক এক নজরে দেখে নেওয়া যাক-
চীন - ৩৪ শতাংশ, ভিয়েতনাম - ৪৬ শতাংশ, তাইওয়ান - ৩২ শতাংশ, ইন্দোনেশিয়া - ৩২ শতাংশ, জাপান - ২৪ শতাংশ, দক্ষিণ কোরিয়া - ২৫ শতাংশ, থাইল্যান্ড - ৩৬ শতাংশ, মালয়েশিয়া - ২৪ শতাংশ, কম্বোডিয়া - ৪৯ শতাংশ, বাংলাদেশ - ৩৭ শতাংশ, ভারত - ২৬ শতাংশ, পাকিস্তান - ২৯ শতাংশ, সিঙ্গাপুর - ১০ শতাংশ, নেপাল - ১০ শতাংশ, ফিলিপিন্স - ১৭ শতাংশ, শ্রীলঙ্কা - ৪৪ শতাংশ, মিয়ানমার - ৪৪ শতাংশ ও  লাওস  ৪৮ শতাংশ। ট্রাম্প বলেছেন, অন্যান্য দেশ যুক্তরাষ্ট্রকে ‘বাজেভাবে’ ব্যবহার করেছে এবং আমেরিকান পণ্যের ওপর অসম শুল্ক আরোপ করেছে। এটিকে তিনি ‘প্রতারণার’ সঙ্গে তুলনা করেছেন। অন্যান্য দেশ অসম শুল্ক আরোপ করার কারণে যুক্তরাষ্ট্রও তাদের ওপর এই পাল্টা শুল্ক আরোপ করছে।
কিন্তু ট্রাম্পের সর্বশেষ শুল্ক আরোপের তালিকায় নেই রাশিয়া, কানাডা, মেক্সিকো, উত্তর কোরিয়া, কিউবাসহ আরও কয়েকটি দেশের নাম।
ট্রাম্প বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত শুল্ক অন্যদের আরোপিত শুল্কের ‘প্রায় অর্ধেক’। “সুতরাং, সেই হিসাবে পুরোপুরি পাল্টা শুল্ক হচ্ছে না। তবে হ্যাঁ, আমি তা করতে পারতাম। কিন্তু এটি করলে অনেক দেশের জন্য কঠিন হয়ে যেত। আমি তা করতে চাইনি। তিনি তার বক্তব্যে বারবার উল্লেখ করেন যে এটি যুক্তরাষ্ট্রের “মুক্তির দিন”। এই দিনটির জন্য যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে অপেক্ষা করছিলো বলেও জানান। ট্রাম্প যোগ করেন, আজকের দিনটি আমেরিকান শিল্পের “পুনর্জন্মের” দিন এবং আমেরিকা “পুনরায় সম্পদশালী” হলো।
মার্কিন অর্থনীতিবিদ ওলু সোনোলা বলেছেন, এই শুল্ক দীর্ঘদিন কার্যকর থাকলে, অর্থনৈতিক সমস্ত ভবিষ্যতবাণী জানালা দিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দিন। ১৯১০ সালের পর প্রথমবারের মতো এরকম উচ্চ শুল্ক দেখা যাচ্ছে। এটি কেবল যুক্তরাষ্ট্র নয়, বরং পুরো বিশ্বের জন্যই ভোগান্তির কারণ হতে পারে। অনেক দেশে অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ব্যাপক এই শুল্ক ব্যবস্থায় হতবাক হয়েছে দীর্ঘদিনের মিত্ররা। কারণ তাদের অনেকেই অপ্রত্যাশিতভাবে উচ্চ শুল্কের তালিকায় পড়ে গেছে।

এর ফলে বিশ্বের বৃহত্তম ভোক্তা অর্থনীতির চারপাশে নতুন বাণিজ্যিক বাধা তৈরি হবে, যা বিগত কয়েক দশকের বাণিজ্য উদারীকরণ নীতির বিপরীত। বাণিজ্য অংশীদাররা পাল্টা প্রতিক্রিয়া জানাতে পারে, যা সাইকেল থেকে শুরু করে ওয়াইন পর্যন্ত বিভিন্ন পণ্যের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে তুলতে পারে। মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ না নেওয়ার জন্য সবার প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, দেখা যাক, পরিস্থিতি কোথায় যায়, কারণ যদি আপনারা পালটা পদক্ষেপ নেন, তাহলে সংঘাত আরও বাড়বে। তড়িঘড়ি কোনও পদক্ষেপ নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ হবে না।
স্টক মার্কেটে নতুন শুল্কের সম্ভাব্য প্রভাব সম্পর্কে জানতে চাইলে বেসেন্টের সাফ উত্তর, এ নিয়ে আমি কিছু জানি না। ট্রাম্পের ঘোষণার পরই শেয়ার বাজারে ব্যাপক দরপতন হয়। বৃহস্পতিবার দিনের শুরুতে জাপানের নিক্কেই সূচক ছিল আট মাসের মধ্যে সর্বনি¤œ। প্রায় একই অবস্থা দেখা গেছে মার্কিন ও ইউরোপীয় বাজারে। বিগত কয়েক সপ্তাহ ধরে বাণিজ্যযুদ্ধের শঙ্কায় এমনিতেই কিছুটা অস্থিরতা ছিল।  নতুন শুল্ক ঘোষণার পর মার্কিন ও ইউরোপীয় স্টক ফিউচারে তীক্ষ্ম দরপতন দেখা দেয়। মার্কিন শেয়ার বাজার গত ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি থেকে প্রায় পাঁচ ট্রিলিয়ন ডলার হারিয়েছে।
চীন তাদের রপ্তানি পণ্যে ব্যাপক হারে নতুন মার্কিন শুল্কারোপের তীব্র বিরোধিতা জানিয়েছে। নিজেদের অধিকার ও স্বার্থ রক্ষায় যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দিয়েছে দেশটি। বৃহস্পতিবার চীন এ কথা জানায়। বেজিংয়ের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলেছে, এসব শুল্ক আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নীতিবিরোধী। এটা সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর বৈধ অধিকার ও স্বার্থের গুরুতর ক্ষতি করবে। মন্ত্রণালয়টি ওয়াশিংটনের প্রতি এসব শুল্ক ‘অবিলম্বে বাতিল’ করার আহ্বান জানিয়েছে।

সতর্ক করে দিয়েছে যে এটি ‘বিশ্বের অর্থনৈতিক উন্নয়নকে বিপন্ন করবে’ এবং মার্কিন স্বার্থ এবং আন্তর্জাতিক সরবরাহ শৃঙ্খলের ক্ষতি করবে। যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে নিয়মিত একতরফা হুমকি দেওয়ার অভিযোগও তুলেছে চীন। ট্রাম্পের বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার দেশগুলোর একটি হচ্ছে চীন। 
এর আগে গত মাসে চীনের সব পণ্যের ওপর ২০ শতাংশ শুল্কারোপ করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। এর প্রতিক্রিয়ায় চীন সয়াবিন, শূকরের মাংস, মুরগির মাংসসহ বিভিন্ন মার্কিন কৃষিপণ্যের ওপর ১৫ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করে। বিশ্ব বাণিজ্যে যুক্তরাষ্ট্রের এই সিদ্ধান্তের প্রভাব নিয়ে বিবিসির অর্থনীতিবিষয়ক সম্পাদক ফয়সাল ইসলাম বলেন, এসব শুল্ক বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় প্রভাব ফেলবে। 
তার মতে, শুল্ক থেকে পাওয়া রাজস্বের পরিমাণ লাইন চার্টে বসালে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে।
তিনি উল্লেখ করেন, প্রায় ১০০ বছর আগে সেই ত্রিশের দশকে ভীষণভাবে সুরক্ষিত মার্কিন অর্থনীতির আমলে সর্বশেষ শুল্ক থেকে এ ধরনের উচ্চ রাজস্ব আদায়ের নজির দেখা গিয়েছিল। নতুন এই শুল্ক আরোপের ফলে দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত বিশ্ববাণিজ্যে ব্যাপক পরিবর্তন আসবে। 
এশিয়ার দেশগুলোর ওপর আরোপিত শুল্ককে প্রকৃত অর্থেই ‘অপ্রত্যাশিত’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। এগুলো হাজার হাজার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও কলকারখানা প্রভাব ফেলবে। বেশ কয়েকটি দেশকে সার্বিকভাবে চরম বিপদে ফেলবে। ভেঙে পড়বে প্রচলিত ব্যবসায়িক কাঠামো।
বিশ্বের সবচেয়ে বড় বড় কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের তৈরি করা সরবরাহ ব্যবস্থা নিমিষেই ভেঙে পড়বে। অনেক মার্কিন ঘেঁষা প্রতিষ্ঠান চীনের দিকে ঝুঁকে পড়তে পারে বলেও মত দেন তিনি। ট্রাম্পের এই পদক্ষেপের ফলে পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোয় কাপড়, খেলনা, ইলেকট্রনিক্সসহ বেশকিছু পণ্যের দাম খুব দ্রুত বেড়ে যাবে বলে ধারনা করা হচ্ছে। 
ট্রাম্পের নতুন শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত বিশ্ব অর্থনীতির জন্য ‘বড় আঘাত’ বলে মন্তব্য করেছেন ইউরোপীয় কমিশনের প্রধান উরসুলা ভন ডার লিয়েন।  
তিনি বলেন, এই নতুন শুল্ক বিশ্ববাজারে ‘অনিশ্চয়তার বিস্তার ঘটাবে’, যার ফলে ‘বিশ্বজুড়ে লক্ষ লক্ষ মানুষের জন্য ভয়াবহ পরিণতি’ ঘটতে পারে।
তিনি বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন যে, সবচেয়ে দুর্বল দেশগুলোর ওপর এটি মারাত্মক প্রভাব ফেলবে, যাদের মধ্যে কিছু দেশ এখন যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ শুল্কের শিকার হতে চলেছে।
ইইউ প্রধান বলেন, ইউরোপ ঐক্যবদ্ধ প্রতিক্রিয়া দেখাবে এবং সতর্ক করে দিয়েছেন যে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন। তিনি আরও বলেন, যদি আপনি আমাদের একজনের বিরুদ্ধে যান, তাহলে পুরো ইউরোপের বিরুদ্ধে দাঁড়াবেন।  
ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মিত্র ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি এই সিদ্ধান্তকে ‘ভুল’ বলে অভিহিত করেছেন। স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ বলেন, তার দেশ ‘একটি উন্মুক্ত বিশ্বে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ’ থাকবে। আয়ারল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী মিখল মার্টিন ট্রাম্পের সিদ্ধান্তকে ‘গভীরভাবে অনুশোচনীয়’ এবং ‘কাউকে উপকৃত করবে না’ বলে মন্তব্য করেন।
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ বৃহস্পতিবার এলিসি প্রাসাদে শুল্কে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক করেন। ফরাসি সরকারের মুখপাত্র সোফি প্রিমাস বৃহস্পতিবার সকালে বলেন, ফ্রান্স ‘এই বাণিজ্য যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত’।

×