ঢাকা, বাংলাদেশ   শুক্রবার ০৪ এপ্রিল ২০২৫, ২১ চৈত্র ১৪৩১

ট্রাম্পের ৩৭ শতাংশ শুল্কারোপ

কঠিন চ্যালেঞ্জে পড়বে বাংলাদেশ

অপূর্ব কুমার

প্রকাশিত: ২৩:৩৭, ৩ এপ্রিল ২০২৫; আপডেট: ২৩:৩৭, ৩ এপ্রিল ২০২৫

কঠিন চ্যালেঞ্জে পড়বে বাংলাদেশ

ট্রাম্পের ৩৭ শতাংশ শুল্কারোপ

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন শুল্ক করের ঘোষণা বাংলাদেশের রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে প্রতিযোগী দেশের তুলনায় বাংলাদেশকে বেশি আঘাত হানার আশঙ্কা রয়েছে। কারণ যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি পোশাক রপ্তানি খাতের মূল প্রতিযোগী দেশ তুরস্ক বেশি সুবিধা পাবে। এছাড়া বাংলাদেশের চেয়ে কম শুল্কারোপের সুবিধা পাবে ভারত ও পাকিস্তান।

সর্বোপরি যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্কের হার মূল্যস্ফীতিকে উসকে দেবে এবং মার্কিন ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পাবে। ফলে বৈশ্বিক ক্রেতারা বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানির পরিমাণ কমিয়ে দেবে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদ ও রপ্তানিকারকরা। তবে ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ট্রাম্পের ঘোষণার পর বুঝে-শুনে প্রতিক্রিয়া দেওয়াসহ আলোচনার মাধ্যমে শুল্ক কমানোর চেষ্টা করতে হবে।

একইভাবে বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা পণ্যের ওপর শুল্ক কমানোর ওপর জোর দিয়েছেন তারা। বাংলাদেশের ওপর শুল্ক করারোপ করার পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ সরকারও মার্কিন পণ্যের ওপর শুল্ক পর্যালোচনা করছে বলে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের প্রেস উইং থেকে জানানো হয়েছে।
নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ওপর প্রতিশোধমূলক শুল্ক আরোপ করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতি কমানো এবং মার্কিন শিল্পকে সুরক্ষা দেওয়ার লক্ষ্যে এই শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। তালিকা থেকে বাদ যায়নি যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক বন্ধু রাষ্ট্রও। 
বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউসের প্রকাশিত একটি চার্ট অনুযায়ী, বাংলাদেশ মার্কিন পণ্যের ওপর ৭৪ শতাংশ শুল্ক আরোপ করে। তাই বাংলাদেশী পণ্যের ওপর ৩৭ শতাংশ ‘ডিসকাউন্টেড রিসিপ্রোকাল ট্যারিফ’ ধার্য করা হয়েছে। ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্তে বাংলাদেশী পণ্যের ওপর শুল্ক বাড়িয়ে ৩৭ শতাংশ করা হয়েছে। এতদিন দেশটিতে বাংলাদেশী পণ্যের ওপর গড়ে ১৫ শতাংশ করে শুল্ক ছিল।
যুক্তরাষ্ট্রের অফিস অব টেক্সটাইল অ্যান্ড অ্যাপারেলের তথ্য অনুসারে, চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে বাংলাদেশ থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রপ্তানি হয়েছে ৮০০ মিলিয়ন ডলার, যা গতবছরের একই সময়ের তুলনায় ৪৫.৯৩ শতাংশ বেশি। ২০২৪ সালে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ৭.৩৪ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছিল, যা আগের বছরে ছিল ৭.২৮ বিলিয়ন ডলার। আশঙ্কা করা হচ্ছে, এই তৈরি পোশাক রপ্তানি খাতেই বেশি আঘাত আসবে।
কোথায় পেছাবে বাংলাদেশ ? বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের প্রতিযোগীদের মধ্যে তুরস্কের ওপর ১০ শতাংশ, ভারতের ওপর ২৭ শতাংশ, পাকিস্তানের ওপর ৩০ শতাংশ, শ্রীলঙ্কার ওপর ৪৪ শতাংশ, ভিয়েতনামের ওপর ৪৬ ও কম্বোডিয়ার ওপর ৪৭ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। দেখা যাচ্ছে, ভারত, পাকিস্তান ও তুরস্কের ওপর শুল্ক আমাদের চেয়ে কম। সেই হিসাবে সবচেয়ে বেশি লাভবান হবে তুরস্ক।

ভারতও হয়ত কিছুটা লাভবান হতে পারে। তবে প্রতিযোগী চীন হয়ত খুব বেশি সুবিধা পাবে না। কারণ চীনের ওপর আরোপিত শুল্ক কর আরও বেশি। কিন্তু বাস্তবতা হলো, মূল্যবৃদ্ধির কারণে মার্কিন ভোক্তারা এমনিতেই কিনবে কম, এর জেরে সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
আরোপকৃত শুল্ক পর্যালোচনা করছে এনবিআর ॥ প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানিকৃত পণ্যের ওপর আরোপিত শুল্ক পর্যালোচনা করছে বাংলাদেশ। বৃহস্পতিবার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি লিখেছেন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) দ্রুততম সময়ে শুল্কহার যৌক্তিক করার বিভিন্ন বিকল্প খুঁজে বের করবে, যা এই বিষয়টি সমাধানে অত্যন্ত জরুরি।

তিনি আরও লিখেছেন, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠ বন্ধু এবং আমাদের সবচেয়ে বড় রপ্তানি গন্তব্য। ট্রাম্প প্রশাসন ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে আমরা দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহযোগিতা বৃদ্ধির জন্য একযোগে কাজ করে আসছি। যুক্তরাষ্ট্র সরকারের সঙ্গে চলমান আলোচনার মাধ্যমে শুল্ক ইস্যু সমাধানে ইতিবাচক অগ্রগতি হবে বলে আশা করছি।
ট্রাম্পের নতুন শুল্ক কর ঘোষণার পর বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেছেন, বাংলাদেশী পণ্যের ওপর ট্রাম্পের ৩৭ শতাংশ শুল্কারোপের জেরে বৈশ্বিক বাণিজ্য যুদ্ধের কারণে বিশ্বব্যাপী চাহিদা কমে যাওয়ার নেতিবাচক প্রভাব বাংলাদেশের রপ্তানিতে পড়তে পারে। তবে নতুন এ শুল্ক আরোপের ফলে মার্কিন বাজারে প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে বড় কোনো পরিবর্তন আসবে না বলেও উল্লেখ করেছেন তিনি।

তিনি বলেন, নতুন শুল্ক আরোপের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে বড় কোনো পরিবর্তন আসবে না। কারণ বাংলাদেশের প্রতিযোগী অন্যান্য দেশের ওপরেও একই ধরনের শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তার হার বাংলাদেশের তুলনায় বেশি। তবে ট্রাম্প প্রশাসনের এই সিদ্ধান্তের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতি বাড়বে।

দেশটির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে যেতে পারে। এতে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বৈশ্বিক বাণিজ্য যুদ্ধের কারণে বিশ্বব্যাপীও চাহিদা কমে যেতে পারে। তার একটি নেতিবাচক প্রভাব বাংলাদেশের রপ্তানিতে পড়তে পারে।
এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের উৎপাদনশীলতা বাড়ানো এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, যুক্তরাষ্ট্র তাদের পণ্য বাংলাদেশে রপ্তানিতে ৭৪ শতাংশ শুল্ক আরোপ হয় বলে যে হিসাব প্রকাশ করেছে, সেটি কীভাবে হিসাব করেছে এই বিষয়টি জানতে চাওয়া যেতে পারে।
বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের তুলা রপ্তানির পঞ্চম বৃহত্তম বাজার উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই তুলা রপ্তানিতে বাংলাদেশের কোনো শুল্ক নেই। বাংলাদেশ স্ক্র্যাপ আমদানি করে যুক্তরাষ্ট্র থেকে। সেখানেও শূন্য শুল্ক। পেট্রোলিয়াম গ্যাস আমদানিতে ৩১ শতাংশ শুল্ক রয়েছে। এই হচ্ছে প্রধান প্রধান আমদানি। তাহলে যুক্তরাষ্ট্র কেন ৭৪ শতাংশের কথা বলছে, সেটা জানতে চাওয়া দরকার। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র বলেছে, যারা তাদের পণ্য ব্যবহার করে রপ্তানি করবে, তাদের বিশেষ সুবিধা দেওয়া হবে।

বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের তুলা ব্যবহার করে পোশাক বানিয়ে রপ্তানি করে। ফলে এ বিষয়টি টিকফার আলোচনায় তোলা যেতে পারে। পাশাপাশি বাংলাদেশের যেসব ব্র্যান্ড ক্রেতা রয়েছে, তাদের মাধ্যমে ট্রাম্প প্রশাসনকে অবহিত করা যেতে পারে যে, বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের তুলা ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য বাজারে রপ্তানি করছে।
সিপিডির সিনিয়র রিসার্চ ডিরেক্টর খোন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি মারাত্মকভাবে আঘাত হানবে। কারণ নতুন করের হার বাংলাদেশ থেকে আমদানি করা সব পণ্যের জন্য প্রযোজ্য হবে। নতুন করের হারে আমদানি পণ্যের দাম বাড়বে। ফলে মার্কিন ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পাবে এবং তারা ভোক্তাদের আইটেমগুলোর জন্য কম ব্যয় করবে।

অন্যদিকে নতুন শুল্কের হার মূল্যস্ফীতিকে উসকে দেবে। ফলে বৈশ্বিক ক্রেতারা বাংলাদেশ থেকে পণ্য আমদানি কমিয়ে দেবে। তিনি জানান, তবে বাংলাদেশের জন্য কিছুটা স্বস্তি রয়েছে, কারণ নতুন শুল্কের হার পাকিস্তান, ভারত, ভিয়েতনাম, শ্রীলঙ্কা, কম্বোডিয়া এবং আরও অনেক দেশের জন্য প্রযোজ্য হবে। এই মুহূর্তে বাংলাদেশকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে হবে এবং নীতি বিশ্লেষণ করতে হবে। আমাদের বিবেচনা করা উচিত যে, এটি কতদিন টিকে থাকবে বা থাকবে কি না, কোনো বিনিময় আছে কি না, যা করের হার কমাতে সাহায্য করতে পারে।
বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মাদ হাতেম বলেছেন, ৩৭ শতাংশ শুল্ক আরোপ হলে এটা রপ্তানি খাতে বড় ধরনের প্রভাব পড়বে এবং সামগ্রিক রপ্তানি কমে যেতে পারে। কারণ যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের তৈরি পোশাক পণ্যের সবচেয়ে বড় একক বাজার। এখন তাৎক্ষণিক সমাধান হলো, আমাদের সরকার ধীরে ধীরে তাদের পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে ডিউটি কমিয়ে দিতে পারে। এটা করলে আমাদের ক্ষতি নেই।

কারণ যুক্তরাষ্ট্রে আমাদের আমদানির চেয়ে রপ্তানি অনেক বেশি। তাই যতটুকু আমদানি হচ্ছে সেখানে সরকার যদি ডিউটি কমিয়েও দেয়, এর প্রভাব খুব একটা হবে না। এটা একটা সমাধান হতে পারে, বলে মনে করেন হাতেম।
বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি ফারুক হাসান বলেন, যে ট্যারিফ বাংলাদেশের ওপর আরোপ করা হয়েছে সেটা আমাদের ওপর হওয়ার কথা না। যুক্তরাষ্ট্রে আমাদের তৈরি পোশাক রপ্তানির এভারেজ ডিউটি ১৫.২ শতাংশ। যুক্তরাষ্ট্রে কিন্তু পণ্যের আইটেম অনুযায়ী ডিউটি। আর ইউরোপীয় ইউনিয়নে ফ্ল্যাট ১২.৫ শতাংশ। যুক্তরাষ্ট্রে পলেস্টারে একরকম, নিটে একরকম, উলে একরকম, ট্রাউজারে একরকম।

একেকটায় একেক রকম ডিউটি। কিন্তু গড়ে সেখানে ১৫.২ শতাংশ। তিনি বলেন, আমরা যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা, যন্ত্রপাতি ও পোশাক শিল্পের জন্য যেসব পণ্য আমদানি করি, তার অধিকাংশ শুল্কমুক্ত এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে এক শতাংশ। ডিউটি বাড়ানোর প্রভাব তো পড়বেই। 
সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক সেলিম রায়হান সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম পোস্টে লিখেছেন, বাংলাদেশ এবং অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এই পরিবর্তন বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে। এমন একটি অনিশ্চিত ব্যবস্থায় কঠিন অর্থনৈতিক পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের ওপরে যেসব কারণে বাড়তি শুল্ক আরোপ করেছে, সেগুলো দূর করে এ শুল্ক কমিয়ে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করতে পারলে নেতিবাচক প্রভাব থেকে বের হয়ে আসার সুযোগ রয়েছে।
জাহিদ হোসেন বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্কনীতি বাংলাদেশের রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে এতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে এই প্রভাব পড়বে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে চাহিদা কমার কারণে। ধারণা করা হচ্ছে, এই ট্যারিফ (শুল্ক) আরোপ করায় আমেরিকার অর্থনীতিতে মন্দা আসবে। সবকিছুর দাম বাড়বে। এতে ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা কমতে পারে। ফলে বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি কমার আশঙ্কা রয়েছে।

তবে প্রতিযোগিতামূলক বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান খুব বেশি পরিবর্তন হবে না বলে জানান তিনি। কারণ অন্যান্য দেশের ওপরও যুক্তরাষ্ট্র বাড়তি শুল্ক আরোপ করেছে, এমনকি কিছু দেশের ক্ষেত্রে তা বাংলাদেশের তুলনায় বেশি। ফলে বাংলাদেশের প্রতিযোগী দেশ ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কাসহ অন্য দেশগুলোও একই ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হবে, কোনো বাড়তি সুবিধা পাবে না। 
তবে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের ওপরে যেসব কারণে বাড়তি শুল্ক আরোপ করেছে, সেগুলো দূর করে এ শুল্ক কমিয়ে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করতে পারলে নেতিবাচক প্রভাব থেকে বের হয়ে আসার সুযোগ রয়েছে বলে মনে করেন তিনি। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র বলছে, বাংলাদেশে পণ্যের ওপর সরাসরি ও পরোক্ষভাবে ৭৪ শতাংশ শুল্ক আরোপিত হয়, যার ভিত্তিতে ট্রাম্প প্রশাসন ৫০ শতাংশ ছাড় দিয়ে ৩৭ শতাংশ শুল্ক নির্ধারণ করেছে। এখন দরকার আলোচনার মাধ্যমে এই হিসাব খতিয়ে দেখা এবং যুক্তি তুলে ধরা।
তিনি পরামর্শ দেন, বাংলাদেশকে মার্কিন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বসে আলোচনা করতে হবে যে, পরোক্ষ শুল্ক হিসাবের ভিত্তিগুলো যথাযথ কি না। পাশাপাশি, সরকার ইতোমধ্যে যে সংস্কারগুলো করেছে, সেগুলো তুলে ধরা জরুরি। এ নিয়ে তিনি বলেন, এই বাড়তি শুল্ক সরবরাহকারীরা নয়, ক্রেতারা পরিশোধ করবে এই বিষয়ে তাদের ঐক্যবদ্ধ সিদ্ধান্ত দরকার।
শীর্ষ রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান শাশা ডেনিমসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শামস মাহমুদ বলেন, শুল্ক শূন্যের কোটায় নামিয়ে আনা হলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানিতে শুল্ক কমানো সম্ভব হবে। তার মতে, ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন শুল্ক কাঠামোর ফলে ভারত ও পাকিস্তান থেকে পোশাক রপ্তানি বাংলাদেশের তুলনায় সস্তা হতে পারে। কারণ সেসব দেশ মার্কিন পণ্যের ওপর শুল্ক কমিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে মার্কিন পণ্যের ওপর আমদানি শুল্ক শূন্যের কোটায় নামিয়ে আনতে হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। প্রতিযোগীদের তুলনায় উচ্চ রপ্তানি শুল্ক ও চীন থেকে শিল্প স্থানান্তর নিয়ে অনিশ্চয়তা বাণিজ্যকে হুমকির মুখে ফেলেছে। রাজস্বের জন্য আমদানি করের ওপর বাংলাদেশের নির্ভরশীলতা এখন শুল্ক শিথিল করার প্রয়োজনীয়তার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
বিআইআইএসএসের গবেষণা পরিচালক অর্থনীতিবিদ ড. মাহফুজ কবীর বলেছেন, ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্তে দেশের রপ্তানি, বিনিয়োগ ও অর্থনীতি বড় ধরনের ক্ষতির মধ্যে পড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। তিনি বলেন, ট্রাম্প প্রশাসন যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, এর ফলে রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। তৈরি পোশাক খাত সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। পোশাক খাতে বাংলাদেশের যারা প্রতিযোগী দেশ, বিশেষ করে প্রধান প্রতিযোগী ভারত।

ভারতের ওপর যে পরিমাণ শুল্ক আরোপ করা হয়েছে, তা বাংলাদেশের তুলনায় অনেক কম। সুতরাং পোশাকের পরবর্তী অর্ডারগুলো অল্প সময়ের জন্য হলেও ভারতে যাবে। যদি ট্রাম্প প্রশাসন সিদ্ধান্তে পরিবর্তন না আনে, তাহলে বাংলাদেশের অর্ডারগুলো ভারতে যাবে। তিনি বলেন, চীন থেকে বড় বিনিয়োগের আশা করেছিলাম। এখন দেখা যাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে চীনের শুল্কহার কম বাংলাদেশের তুলনায়। চীন থেকে বড় বিনিয়োগ নাও আসতে পারে।

এতদিন বলা হয়েছে, মেড ইন বাংলাদেশ হলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাওয়া যাবে। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, অতিরিক্ত শুল্কের কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাজার সংকুচিত হয়ে যাবে। বাংলাদেশের সামনে সুযোগ আছে জানিয়ে এই অর্থনীতিবিদ বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বি-পক্ষীয় কাঠামোগত বাণিজ্যিক চুক্তি বা টিকফা আছে। এর মাধ্যমে সরকার আলাপ-আলোচনা শুরু করতে পারে। কিন্তু শুল্ক বসিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন, মার্কিন বাণিজ্য দপ্তর থেকে সিদ্ধান্তটি হয়নি। সিদ্ধান্ত হয়েছে হোয়াইট হাউসে, যেটি বাস্তবায়ন করবে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য দপ্তর।

আমাদের দুটো জায়গায় কাজ করতে হবে। বাংলাদেশের বাণিজ্য ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে কাজ করতে হবে। তাদের সরাসরি যোগাযোগ করতে হবে। পাশাপাশি এনবিআরকে কিছু জিনিস রিভিউ করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানির ক্ষেত্রে কত শতাংশ শুল্ক আছে। আমাদের শুল্কহার সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশ। এর ওপর নানান কর থাকে। ওই করগুলো কীভাবে কমানো যায়, তার সিদ্ধান্ত নিতে হবে। খুব দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এনবিআরকে ট্যারিফ কমানোর সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

×