ঢাকা, বাংলাদেশ   শুক্রবার ০৪ এপ্রিল ২০২৫, ২১ চৈত্র ১৪৩১

গাজীপুর সাফারি পার্কে (ট্যুরিস্ট বাসের এসি নষ্ট থাকায়) জানালা খুলেই “আতঙ্কের আনন্দ ভ্রমণ”

নিজস্ব সংবাদদাতা, শ্রীপুর, গাজীপুর

প্রকাশিত: ২১:০৪, ৩ এপ্রিল ২০২৫; আপডেট: ২১:০৫, ৩ এপ্রিল ২০২৫

গাজীপুর সাফারি পার্কে (ট্যুরিস্ট বাসের এসি নষ্ট থাকায়) জানালা খুলেই “আতঙ্কের আনন্দ ভ্রমণ”

ছবিঃ সংগৃহীত

গাজীপুরে সাফারি পার্কে হিংস্র প্রাণী থাকায় পর্যটকবাহী বাসের দরজা-জানালা বন্ধ করেই ভ্রমণের নিয়ম। কিন্তু অধিকাংশ বাসের শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র-এসি বিকল থাকায় দর্শনার্থীদের বিড়ম্বনা পোহাতে হচ্ছে। বাসে ছোট ফ্যান লাগালেও তা পর্যাপ্ত নয়। ফলে গরমের যন্ত্রনা এড়াতে পর্যটকদের অনেকেই বাসের জানালা খুলেই বাঘ, সিংহ, ভালুক বেষ্টনীতে তারা হিংস্র প্রাণীদের বিচরণ উপভোগ করছেন। এতে যে কোন সময় আনন্দ ভ্রমণ করতে আসা পর্যটকরা বড় ধরণের দুর্ঘটনার শিকার হতে পারেন বলে ধারণা করছেন কেউ কেউ।

পার্কের কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দর্শনার্থীদের ভ্রমণের জন্য ৭টি বাসের ৫টির এসি বিকল হয়ে আছে। বিকল্প হিসেবে কয়েকটি বাসে ছোট ফ্যান যুক্ত করলেও তা অপর্যাপ্ত। ফলে বাসে চড়ে গরমে অতিষ্ঠ পর্যটকরা অনেক সময় বাসের জানালা খুলে দিচ্ছেন। তাতে আনন্দ-ভ্রমণের সময় চালক ও পর্যটকদের আতঙ্কে থাকতে হচ্ছে।

সরেজমিনে পার্কে গিয়ে দেখা গেছে, পার্কটির কোর সাফারির বাঘ-সিংহ-ভালুক বেষ্টনীতে প্রবেশ করতে রওনা হয়েছে পর্যটকবাহী একটি বাস। বেষ্টনীতে প্রবেশ করার আগেই চালক হ্যান্ড মাইকে দর্শনার্থীদের বাসের জানালার বাইরে হাত বা মাথা বের না করার জন্য সতর্ক করে দিচ্ছেন।

কিন্তু এসি বিকল থাকায় বাসটি চলার কিছুক্ষণের মধ্যে অভিভাবকদের সঙ্গে আসা শিশুরা গরমে অতিষ্ঠ হয়ে কান্নাকাটি শুরু করে। পরে বাধ্য হয়ে অনেকে বাসের জানালার কাঁচ খুলে দেন। তারা বাস চালকের কথা কর্ণপাত করেনি। বাসটি হিংস্র ওইসব প্রাণীর বেষ্টনীতে ঢুকলেও জানালা বন্ধ করেননি তারা। কিছু পর্যটক আবার অনেকে খোলা জানালা দিয়ে বাইরে হাত বের করেই ক্যামেরা/মোবাইল ফোন দিয়ে ছবি তুলছিলেন।

কয়েক বছর আগে সাফারি পার্কের টাইগার রেস্টুরেন্টে বসে এক পর্যটক তার সঙ্গীদের বাঘ বেষ্টনীতে থাকা একটা বাঘের অবস্থান দেখাতে জানালার গ্রীলের ফাঁক দিয়ে বাইরে হাত বের করেন। এসময় টাইঘার রেস্টুরেন্টের জানালার নিচে খাদের পানিতে থাকা একটি বাঘ ছুটে গিয়ে ওই পর্যটকের হাতের কব্জি ছিড়ে নিয়ে যায়। এরপর থেকে ওই রেস্টুরেন্টের বাইরে নিরাপত্তা বেষ্টনী জোরদার করা হয়। কিন্তু বাসের জানালা এভাবে খোলা রাখলে যেকোন সময় আবারও বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কোর সাফারি পার্কের গাড়ীর এক চালকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রায় ১১ বছর আগে কেনা ৮টি বাসের মধ্যে ৫টি বাসেরই এসি বিকল রয়েছে। তাই নিষেধ করার পরও অনেক সময় বাসের জানালার গ্লাস খুলে দিচ্ছেন দর্শনার্থীরা। এছাড়া একটি বাস গত বছরের ৫ আগস্টের হামলায় ভাংচুরের পর গ্যারেজে পড়ে আছে। এখন ৭টি বাসই চলাচল করছে। এসব বাসের কয়েকটিতে ছোট ফ্যান লাগানো হলেও তা অপর্যাপ্ত। তাই গরমে অতিষ্ঠ হয়ে অনেক পর্যটক মাঝে-মধ্যেই বাসের জানালা খুলে ফেলছে।

তিনি আরো জানান, বৃষ্টির দিনে কোর সাফারি অংশের রাস্তায় ছোট-বড় খানাখন্দে বৃষ্টির পানি জমে থাকে। এসব পথে চলতে গিয়ে অনেক সময় গাড়ির যন্ত্রাংশ নষ্ট হয়ে যায়। সামনের বর্ষা মৌসুম শুরুর আগে রাস্তা মেরামত করা না হলে ঝুঁকি আরো বাড়বে।

পর্যটক নিয়ে ভ্রমণের সময় বাঘ বেষ্টনীর রাস্তার গর্তে পড়ে একটি বাস বিকল হয়ে যায়। এতে বাসে থাকা দর্শনার্থীরা আতঙ্কিত হয়ে চিৎকার শুরু করেন। চালক ও পার্ক কর্তৃপক্ষ প্রায় ৩০ মিনিট পর ঝুঁকি নিয়ে পর্যটকদের উদ্ধার করে। তারপর কিছু অংশ মেরামত করা হলেও রাস্তার অবস্থা পুরোপুরি ভাল নেই।

মানিকগঞ্জ থেকে পার্কে বেড়াতে আসা পোশাক শ্রমিক খাদিজা আক্তার বলেন, স্বামী সন্তানসহ তারা ৫ জন ঘুরতে এসেছেন পার্কে। কোর সাফারি পার্কে প্রাণী দেখতে বাসে উঠে দেখি এসি নষ্ট। গরমে যাত্রীদের হাঁসফাঁস অবস্থা। অনেকের সঙ্গে থাকা শিশুরা গরমে কান্না শুরু করে। এ অবস্থায় বাসের জানালা খুলে দিলে তার কান্না থামে। জানালা দিয়ে কান্নার শব্দ বাইরে গেলে শুয়ে থাকা বাঘ/ সিংহ কান পেতে শুনে এবং শব্দের উৎস খুঁজে। এ এক ভয়ংকর দৃশ্য। তখন গরম লাগলেও পর্যকটকরা বাধ্য হয়েই আবার জানালা বন্ধ করে দেয়।

খাদিজা আক্তারের স্বামী আনিছুর রহমান বলেন, টাকা দিয়ে টিকেট কেটেও টেনশনের মধ্য দিয়ে আনন্দ উপভোগ করতে হয়েছে।

গাজীপুর সাফারি পার্কের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম বলেন, ২০১৩ সালে সাফারি পার্ক প্রতিষ্ঠার সময় ৮টি এসি বাস, দুটি জিপ নিয়ে দর্শনার্থী ও কর্মকর্তাদের পরিবহন সেক্টরের যাত্রা শুরু। কিন্তু কয়েক বছর ধরেই বাসগুলোর অবস্থা খারাপ হয়ে পড়েছে। প্রায়ই মেরামত করে বাসগুলো চালাতে হচ্ছে। একটি পর্যটক বাস মেরামতের জন্য গত ৮ মাস যাবত গ্যারেজে পড়ে আছে। তবে বিকল্প হিসেবে বাসে ছোট ছোট ফ্যান সংযোজন করা হয়েছে বলেন তিনি। কোর সাফারির ভিতরের রাস্তায় ছোট-বড় খানাখন্দ থাকায় পর্যটকবাহী বাস চলাচল কিছু সমস্যা হলেও পার্কের রাস্তার কিছু অংশ ইতিপূর্বে সংস্কার ও মেরামত করা হয়েছে। বাকি অংশ বরাদ্দ পেলেই মেরামত করা হবে।

পার্কের দেখাশুনার দায়িত্বে থাকা বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ ঢাকার বিভাগীয় কর্মকর্তা শারমিন আক্তার বলেন, বিষয়গুলো পার্কের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম আমাকে জানালে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছি। এখনও সরকারি বরাদ্দ না পাওয়ায় এসি সংযোজন কিংবা নতুন বাস কেনা সম্ভব হচ্ছে না। তাই যে সকল বাসে এসি নষ্ট, সে সকল বাসে ছোট ছোট ফ্যান লাগিয়ে দেয়া হয়েছে। বরাদ্দ পেলে এসিসহ রাস্তা সংস্কার ও মেরামত করে দেওয়া হবে।

ইমরান

×