ঢাকা, বাংলাদেশ   বৃহস্পতিবার ০৩ এপ্রিল ২০২৫, ২০ চৈত্র ১৪৩১

ইঞ্জিন ও কোচ সংকট

নতুন লাইনে ট্রেন চালু  করা যাচ্ছে না

ইবরাহীম মাহমুদ আকাশ

প্রকাশিত: ২২:৪৫, ২ এপ্রিল ২০২৫

নতুন লাইনে ট্রেন চালু  করা যাচ্ছে না

.

জোড়াতালি দিয়ে চলছে রেলওয়ের লোকোমোটিভ (ইঞ্জিন) ও কোচ (বগি)। সারাদেশে তিন হাজারের বেশি কিলোমিটার রেলপথ রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় তিনশ’ কিলোমিটার নতুন রেলপথ নির্মাণ করা হয়েছে। কিন্তু ইঞ্জিন ও কোচ সংকটের কারণে নতুন রেললাইন দিয়ে ট্রেন চালু করতে পারছে না রেল কর্তৃপক্ষ। এছাড়া ইঞ্জিন সংকটে ঈদযাত্রায় এবার বিশেষ ট্রেন কম পরিচালনা করেছে রেলওয়ে। এদিকে রেলওয়ে কারখানার অবস্থা খুবই নাজুক। জনবল সংকটের কারণে চাহিদা থাকার পরও ইঞ্জিন ও কোচ মেরামত করতে পারছে না কারখানা কর্তৃপক্ষ। রেলপথে যাত্রীদের চাহিদা থাকার পরও পর্যাপ্ত ট্রেন পরিচালনা করতে পারছে না রেলওয়ে। তাই সাম্প্রতিক সময়ে রেলে যে বিনিয়োগ হয়েছে, এর সুফল পেতে হলে রেলের কারখানাগুলোকে আধুনিকায়ন করার পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের।    
রেলওয়ের সূত্র জানায়, বর্তমানে সারাদেশে ৩ হাজার ২১৭ কিলোমিটার রেলপথ রয়েছে। এর মধ্যে পদ্মা সেতু হয়ে ঢাকা থেকে যশোর পর্যন্ত ১৬৯ কিলোমিটার নতুন রেলপথ নির্মাণ করা হয়েছে। এছাড়া চট্টগ্রামের দোহাজারী থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত ১০০ কিলোমিটার রেলপথ, খুলনা থেকে মোংলা সমুদ্রবন্দর পর্যন্ত প্রায় ৬৫ কিলোমিটার রেলপথ ও বাংলাদেশের আখাউড়া থেকে ভারতের আগরতলা পর্যন্ত ১৫ কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণ করা হয়েছে। এসব রেলপথ নির্মাণ করতে প্রায় ৭০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। কিন্তু ইঞ্জিন ও কোচ সংকটের কারণে এসব রেলপথে চাহিদা অনুযায়ী ট্রেন চালু করা সম্ভব্য হয়নি বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
এ বিষয়ে ওয়ার্ক ফর আ বেটার বাংলাদেশ (ডব্লিউবিবি) ট্রাস্ট প্রকল্প কর্মকর্তা আতিকুর রহমান জানান, সাম্প্রতিক সময়ে রেলে যে বিনিয়োগ হয়েছে, এর সুফল পেতে হলে রেলের কারখানাগুলোকে আধুনিকায়ন করতে হবে। তৈরি করতে হবে দক্ষ জনবল। আর তা না হলে যুগের পর যুগ বিদেশ থেকে  ইঞ্জিন কোচ কিনেই যেতে হবে। রেল নিজে কিছু তৈরি করতে পারবে না। গত এক যুগে ৩৩০ কিলোমিটার নতুন রেললাইন নির্মাণ করা হয়েছে। ১১৭টি নতুন ট্রেন চালু হয়েছে। ১০২টি বন্ধ স্টেশন চালু করা হয়েছে। রেলের প্রধান তিনটি কারখানা রয়েছে। এগুলো হচ্ছে সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানা, পার্বতীপুর কেন্দ্রীয় লোকোমোটিভ কারখানা এবং পাহাড়তলী ক্যারেজ ও ওয়াগন কারখানা। এসব কারখানায় প্রায় ৬০ শতাংশ জনবল ঘাটতি রয়েছে। পাশাপাশি বাজেট ঘাটতি, যন্ত্রাংশের স্বল্পতা, আধুনিক যন্ত্রপাতির অভাব এবং অনিরাপদ কাজের পরিবেশের কারণে কারখানাগুলোর পুরোপুরি সুফল পাওয়া যাচ্ছে না।
আতিকুর রহমান বলেন, পাহাড়তলী ক্যারেজ ও ওয়াগন কারখানায় ৪৩১টি মেশিনের মধ্যে ২০০টির বেশি মেয়াদোত্তীর্ণ এবং সৈয়দপুর কারখানায় ৭৮৭টি মেশিনের মধ্যে ৪৪৮টি ৬০ বছরের পুরনো। রেলের মহাপরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী ৩০ বছরে যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের জন্য ৪৭৪টি ইঞ্জিন, ৫ হাজার ১৪৩টি কোচ ও ৬ হাজার ৪৩৯টি ওয়াগন কেনা হবে। এসব ইঞ্জিন কোচ সচল রাখতে নতুন কারখানা স্থাপন ও বর্তমান কারখানা উন্নয়নের বিকল্প নেই। 

ইঞ্জিন সংকটে ঈদযাত্রায় বিশেষ ট্রেন কম ॥ ঈদুল ফিতর উপলক্ষে এবার ঈদযাত্রায় ঢাকা থেকে ৫ জোড়া বিশেষ ট্রেনের ব্যবস্থা করেছে রেলওয়ে। এছাড়া চট্টগ্রাম থেকে এক জোড়া বিশেষ ট্রেনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। কিন্তু গত বছর এর সংখ্যা আরও বেশি ছিল। গত ঈদুল ফিতরে আট জোড়া বিশেষ ট্রেন পরিচালনা করেছিল রেলওয়ে। ইঞ্জিন সংকটের কারণে এ বছর বিশেষ ট্রেন পরিচালনা কমিয়ে দেওয়া হয়েছে রেলওয়ে কর্মকর্তারা জানান।
রেলওয়ে সূত্র জানায়, ঈদুল ফিতর উপলক্ষে এবার চাঁদপুর ঈদ স্পেশাল-১ ও ২ চলাচল করে চট্টগ্রাম-চাঁদপুর-চট্টগ্রাম রুটে; দেওয়ানগঞ্জ ঈদ স্পেশাল-৩ ও ৪ চলাচল করে ঢাকা-দেওয়ানগঞ্জ-ঢাকা রুটে; শোলাকিয়া ঈদ স্পেশাল-৫ ও ৬ চলাচল করে ভৈরববাজার-কিশোরগঞ্জ-ভৈরববাজার রুটে; শোলাকিয়া ঈদ স্পেশাল-৭ ও ৮ চলাচল করবে ময়মনসিংহ-কিশোরগঞ্জ-ময়মনসিংহ রুটে; পার্বতীপুর ঈদ স্পেশাল-৯ ও ১০ চলাচল করে জয়দেবপুর-পার্বতীপুর-জয়দেবপুর রুটে। তবে লোকোমোটিভ (ইঞ্জিন) সংকটের কারণে চট্টগ্রাম থেকে দেশের বিভিন্ন গন্তব্যে চলাচলকারী ঈদের বিশেষ ট্রেনের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দিয়েছে রেল কর্তৃপক্ষ।
চট্টগ্রাম থেকে এ বছর ঈদ উপলক্ষে শুধুমাত্র একটি জোড়া বিশেষ ট্রেন চালানো হবে শুধুমাত্র চট্টগ্রাম-চাঁদপুর রুটে। গত বছর ঈদে যাত্রীদের অতিরিক্ত চাপ সামলাতে চার জোড়া বিশেষ ট্রেন পরিচালিত হয়েছিল চট্টগ্রাম থেকে। সেগুলো হলো-চট্টগ্রাম-ময়মনসিংহ রুটে একটি, চট্টগ্রাম-চাঁদপুর রুটে দুটি এবং চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটে একটি। এবার বিশেষ ট্রেনের সংখ্যা কমে যাওয়ায় ঈদে ঘরমুখো যাত্রীদের জন্য ব্যাপক দুর্ভোগের আশঙ্কা করেন যাত্রীরা।
রেলওয়ের পরিবহন বিভাগ কর্মকর্তারা জানান, ঈদের সময় অতিরিক্ত ট্রেন চালানোর জন্য তারা যান্ত্রিক বিভাগ থেকে প্রয়োজনীয় লোকোমোটিভ চেয়েছিল, কিন্তু পাননি। এ বিষয়ে রেলওয়ের ডেপুটি চিফ অপারেটিং সুপারিনটেনডেন্ট তারেক ইমরান জানান, যান্ত্রিক বিভাগকে ঈদের সময় বাড়তি ট্রেন পরিচালনার জন্য ইঞ্জিন বরাদ্দ দিতে অনুরোধ করেছিলাম। কিন্তু তারা আমাদের চাহিদা অনুযায়ী ইঞ্জিন সরবরাহ করতে পারেনি। ইঞ্জিন সংকটের কারণে ঈদে বিশেষ ট্রেনের সংখ্যা কমিয়ে আনতে হচ্ছে, যা বিদ্যমান ট্রেনগুলোর ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে।
মেয়াদোত্তীর্ণ রেল ইঞ্জিন ও কোচ ॥ রেলওয়ে সূত্র জানায়, বাংলাদেশ রেলওয়ে চারটি বিভাগের মধ্যে লালমনিরহাট একটি। এই বিভাগের জন্য ১৯৬১ সালে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, হাঙ্গেরি ও দক্ষিণ কোরিয়া থেকে ২২০০ থেকে ২৯০০ সিরিজের ৩৩টি ইঞ্জিন আমদানি করা হয়। ওই বছরই পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের লালমনিরহাট বিভাগের জন্য সেগুলো আনা হয়। এ বিভাগে ১৯৮১ সালের পর আর কোনো ইঞ্জিন নতুন করে কেনা হয়নি। তবে সর্বশেষ ২০১৪ সালে দক্ষিণ কোরিয়া থেকে পূর্বাঞ্চল রেলওয়ের চট্টগ্রাম বিভাগের জন্য আনা হলেও ২৯০০ সিরিজের (এমইআই-১৫) একটি ইঞ্জিন পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ে লালমনিরহাট বিভাগকে দেওয়া হয়। এসব ইঞ্জিনের ইকোনমিক আয়ুষ্কাল ২০ বছর নির্ধারিত করা হয়েছিল; কিন্তু বর্তমানে ওইসব ইঞ্জিনের আয়ুষ্কাল পেরিয়ে গেছে ৩৪ থেকে ৪৬ বছর পর্যন্ত।
পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের লালমনিরহাট বিভাগীয় সূত্র জানায়, লালমনিরহাট রেলওয়ে বিভাগের ছয়টি সেকশন, স্টেশনের সংখ্যা সাতটি, ট্রেনের সংখ্যা ৬৬টি, ট্রেন চলাচল বন্ধ ২৬টি, বর্তমান ট্রেন চলছে ৪০টি। ট্রেনগুলো হচ্ছে আন্তঃনগর ১৮টি, মেইল কমিউটার ২৯টির মধ্যে চলছে ২১টি, বন্ধ আছে আটটি। লোকাল ট্রেন ২৪টির মধ্যে চলছে ছয়টি, বন্ধ আছে ১৮টি। এতে ইঞ্জিন প্রয়োজন ৬২টি, বর্তমান আছে মাত্র ৩২টি, এর মধ্যে ৪৬ বছর মেয়াদোত্তীর্ণ ইঞ্জিন ৩১টি।
এসব ট্রেনের ইঞ্জিন ১৯৬১ সালে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ২২০০ সিরিজের (এমইজি-৯) ১১টি, ১৯৬৯ সালে কানাডা থেকে ২৩০০ সিরিজের (এমইএম-১৪) আটটি, ফের কানাডা থেকে ১৯৭৮ সালে ২৪০০ সিরিজের (এমইএম-১৪) আরও ৯টি এবং ১৯৮১ সালে হাঙ্গেরি থেকে ৩৩০০ সিরিজের (এমএইচজেড-৮) তিনটি ইঞ্জিন পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের লালমনিরহাট বিভাগের জন্য আনা হয়েছিল। এরপর আর কোনো ইঞ্জিন কেনা হয়নি। 
তবে ২০১৪ সালে দক্ষিণ কোরিয়া থেকে পূর্বাঞ্চল রেলওয়ের চট্টগ্রাম বিভাগের জন্য আনা ২৯০০ সিরিজের (এমইআই-১৫) একটি ইঞ্জিন পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের লালমনিরহাট বিভাগকে দেওয়া হয়। এসব ইঞ্জিনের ইকোনমিক আয়ুষ্কাল ২০ বছর নির্ধারিত; কিন্তু আমেরিকা থেকে আনা ১১টির আয়ুষ্কাল উত্তীর্ণ হয়ে গেছে ৩৪ বছর আগেই। কানাডা থেকে প্রথম ধাপে আনা আটটির আয়ুষ্কাল উত্তীর্ণ হয়ে বর্তমানে ৪৬ বছর হয়েছে। অর্থাৎ এগুলো মেয়াদোত্তীর্ণ হয়েছে ২৬ বছর আগেই। দ্বিতীয় ধাপে কানাডা থেকে আনা ৯টির আয়ুষ্কাল উত্তীর্ণ হয়ে ৩৭ বছর হয়েছে। এগুলোরও মেয়াদ পেরিয়েছে ১৭ বছর আগে। হাঙ্গেরি থেকে আনা তিনটির আয়ুষ্কাল উত্তীর্ণ হয়ে ৩৪ বছর হয়েছে। এ তিনটি ইঞ্জিনের মেয়াদ ফুরিয়েছে ১৪ বছর আগে।
লালমনিরহাট রেলওয়ে বিভাগ জানায়, ছয়টি সেকশনে আয়ুষ্কাল উত্তীর্ণ ইঞ্জিন দিয়েই ৪০টি ট্রেন পরিচালনা করা হচ্ছে। এর মধ্যে ইঞ্জিন ও ট্রেন চালক তথা ক্রু সংকটের কারণে ২৬টি ট্রেন বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের এ ডিভিশনে মাত্র একটি ইঞ্জিন ছাড়া অবশিষ্ট ৩১টিই ইকোনমিক আয়ুষ্কাল পেরিয়ে মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে গেছে। এগুলোর মধ্যে ১৮টি দিয়ে ট্রেন পরিচালনা করা হচ্ছে এবং ছয়টি ইঞ্জিন পরিত্যক্ত অবস্থায় কেন্দ্রীয় মেরামত কারখানায় (কেলোকা) পড়ে রয়েছে। এছাড়া যাত্রীবাহী ও মালবাহী ট্রেন চালনায় অনুপযোগী বাকি আটটি দিয়ে শান্টিং কাজ পরিচালনা করা হচ্ছে। সব কটি ট্রেন পরিচালনার জন্য রেলওয়ের নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী প্রতিদিন ৬২টি ইঞ্জিন প্রয়োজন। অথচ লালমনিরহাট বিভাগীয় রেলওয়ের কাছে আছে মাত্র ৩২টি ইঞ্জিন। এর মধ্যে ছয়টি মেরামত অযোগ্য হওয়ায় পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। ট্রেন চালনায় অনুপযোগী আটটি ইঞ্জিন শান্টিং কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। অবশিষ্ট ১৮টি ইঞ্জিন, তাও আবার মেয়াদোত্তীর্ণ কোনো রকম জোড়াতালি দিয়ে ৪০টি ট্রেন পরিচালনা করা হচ্ছে।
পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের লালমনিরহাট বিভাগীয় যন্ত্র প্রকৌশলী শাহিনুর হক অপু জানান, দুর্ঘটনা সংঘটিত হলে কিংবা রিলিফ ট্রেন পাঠানোর প্রয়োজন হলে, অন্য কোনো একটি ট্রেন বাতিল করতে হয়, এতে নষ্ট হয় সময়। সমস্যা সমাধানে পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের (রাজশাহী) প্রধান যন্ত্র প্রকৌশলীকে এসব সমস্যা উল্লেখ করে একাধিকবার চিঠি পাঠানো হয়েছে। কিন্তু আশানুরূপ সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না বিধায় জোড়াতালি দিয়ে চলছে এই রেল বিভাগ।

×