
.
মিয়ানমারে শক্তিশালী ভূমিকম্পের পর নজিরবিহীন দুর্যোগ দেখা দিয়েছে। এক সপ্তাহ আগে দেশটিতে ৭ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হানে। তবে এখনো দুর্গম এলাকায় পুরোদমে উদ্ধার কার্যক্রম শুরু করতে পারেনি দেশটির জান্তা সরকার। ধ্বংসস্তূপের মধ্যে এখনো বহু মানুষ আটকে রয়েছে। এর মধ্যেই আশ্রয়, বিশুদ্ধ পানি, ওষুধ ও খাবারের অভাবে ধুঁকছে ক্ষতিগ্রস্তরা। বুধবার মিয়ানমার সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ভূমিকম্পে এখন পর্যন্ত ২৯৮৬ জন নিহত ও বহু মানুষ আহত হয়েছেন। হতাহতের এই সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।
মিয়ানমার জান্তা সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, উদ্ধার ও পুনর্বাসন প্রক্রিয়া চলছে। তবে ধারণা করা হচ্ছে, শক্তিশালী এ ভূমিকম্পে আরও অনেক বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে।
জাতিসংঘের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, গৃহযুদ্ধের মধ্যে থাকা মিয়ানমারে ভূমিকম্প ‘ইতোমধ্যে মারাত্মক হয়ে ওঠা একটি সংকটের’ সঙ্গে যুক্ত হয়ে পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলেছে। দীর্ঘদিন ধরে চলা গৃহযুদ্ধের কারণে দেশটিতে মারাত্মক খাদ্য সংকট চলছে। অর্থনীতিও পতনের পথে রয়েছে।
ভূমিকম্পটি মধ্যাঞ্চলীয় শহর সাগাইং শহরে আঘাত হানে, এরপর নিকটবর্তী মান্দালয় থেকে ব্যাপক ধ্বংসের খবর আসতে থাকে যা মিয়ানমারের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর; পাশাপাশি ২৪১ কিলোমিটার দক্ষিণে রাজধানী নেপিদো থেকেও ধ্বংসযজ্ঞের খবর প্রকাশিত হতে শুরু করে।
১৯৪৮ সালে স্বাধীনতার পর থেকে অধিকাংশ সময়জুড়ে সামরিক শাসনে থাকা মিয়ানমার দশকের পর দশক ধরে অস্থিরতায় ভুগছে। মারাত্মক ভূমিকম্পের পর এই দেশটিতে যে পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে তাকে নজিরবিহীন দুর্যোগ বলছে বহু ত্রাণ সংস্থা।
২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে সামরিক বাহিনী অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ক্ষমতা গ্রহণ করার পর থেকে দেশটিতে গৃহযুদ্ধ আরও তীব্র হয়েছে। নতুন নতুন অনেক সরকারবিরোধী গোষ্ঠী জান্তাবিরোধী প্রতিরোধ লড়াইয়ে সামিল হয়েছে। দুইপক্ষের সহিংস লড়াইয়ের কারণে দেশটির লাখ লাখ বাসিন্দা সারাক্ষণ শঙ্কা ও নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে বাস করতে বাধ্য হচ্ছে। খবর বিবিসি, আলজাজিরা ও নিউলাইট অব মিয়ানমার অনলাইনের।
জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি জানিয়েছে, খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা ‘নজিরবিহীন স্তরে’ পৌঁছে গেছে, দ্রুত বাড়তে থাকা মূল্যস্ফীতির কারণে অনেকের পক্ষেই খাবার কেনা অসাধ্য হয়ে উঠেছে। সোনালি বৌদ্ধ মন্দিরের শহর মান্দালয় ‘সোনার শহর’ হিসেবে পরিচিত, কিন্তু মিয়ানমারের সাবেক এই রাজকীয় রাজধানী শহরটির বাতাসে এখন শুধু মৃতদেহের গন্ধ। এত মৃতদেহ স্তূপ হয়ে আছে যে সেগুলো ‘একসঙ্গে পুড়িয়ে দিতে হবে’ বলে জানান মান্দালয়ের এক বাসিন্দা।
দেশটির দ্বিতীয় জনবহুল শহরটির বাসিন্দারা জানিয়েছেন, তারা রাতে ঘুমহীন অবস্থায় রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন। এরমধ্যে খাবার ও পানির সরবরাহ অপ্রতুল হয়ে ওঠায় হতাশ হয়ে পড়ছেন তারা।
এদিকে মিয়ানমারের ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় ত্রাণ নিয়ে যাওয়ার সময় একটি চীনা ত্রাণবহরে দেশটির সামরিক বাহিনী গুলি করেছে। দেশটির সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠী তা’ আং ন্যাশনাল লিবারেশন আর্মি (টিএনএলএ) জানিয়েছে, মান্দালয়ে যাওয়ার পথে উত্তরাঞ্চীয় শান রাজ্যের নায়ুং চো শহর অতিক্রমের সময় ত্রাণবাহী নয়টি গাড়ির একটি বহরে জান্তার সেনারা ভারী মেশিনগান দিয়ে গুলি করে।
টিএনএলএ জানায়, ত্রাণবহরটি তাদের গন্তব্য, যে পথ দিয়ে তারা যাচ্ছে ও সরবরাহ পরিকল্পনা সামরিক জান্তাকে অবহিত করেছিল। অপরদিকে সামরিক বাহিনী বলেছে, চীনা ত্রাণবাহী বহরটি যে নায়ুং চো শহর অতিক্রম করবে এমনটি তাদের জানানো হয়নি, নির্দেশ দেওয়ার পরও না থামায় সেটি লক্ষ্য করে গুলি করা হয়েছে। জান্তার দাবি, এ ঘটনায় কেউ জখম হয়নি। ঘটনাটি তারা তদন্ত করে দেখছে বলে জানিয়েছে।
গত শুক্রবার স্থানীয় সময় দুপুরের দিকে মিয়ানমারের মধ্যাঞ্চলে ৭ দশমিক ৭ মাত্রার শক্তিশালী একটি ভূমিকম্প হয়। ভয়াবহ এ ভূমিকম্পে ব্যাপক অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি হয়। দেশটির তিনটি সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠী প্রাকৃতিক দুর্যোগের এই বিপর্যস্ত অবস্থার মধ্যে ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে ত্রাণ সরবরাহ নির্বিঘ্ন করতে সাময়িকভাবে লড়াই বন্ধ রাখার আহ্বান জানিয়েছে।
কিন্তু সামরিক জান্তার প্রধান সিনিয়র জেনারেল মিন অং হ্লাইং সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর এ আহ্বান প্রত্যাখ্যান করেছে। দেশটির সামরিক বাহিনী ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতেও বিমান হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। হ্লাইং বলেছেন, মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা পদক্ষেপ গ্রহণ অব্যাহত রাখবে।