
সম্প্রতি ইন্ডিয়া টু’ডের এক অনুষ্ঠানে উপস্থাপক রাজ চেঙ্গাপ্পার উপস্থাপনায় আমন্ত্রণ জানানো হয়, বাংলাদেশের ইংরেজি দৈনিক দ্য ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনামকে। মাহফুজ আনাম ইন্ডিয়া টু’ডের ‘নাথিং বাট ট্রু’ অনুষ্ঠানে বাংলাদেশে চলমান বেশ কিছু ইস্যু নিয়ে কথা বলেছেন।
উপস্থাপক রাজের, এবার আমরা রাজনৈতিক ক্ষেত্রে আসি। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে নতুন একটি রাজনৈতিক দলের জন্ম, যা যুব আন্দোলনের মধ্যে রূপ লাভ করেছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ছাত্র আন্দোলনের নেতারা, যারা হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করেছিলেন, আনুষ্ঠানিকভাবে একটি নতুন রাজনৈতিক দল ঘোষণা করেছেন। এটি ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি বা এনসিপি নামে পরিচিত। আপনি জানেন যে বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে দুটি পারিবারিক নেতৃত্বাধীন দল হাসিনার আওয়ামী লীগ এবং খালেদার বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বা বিএনপি রাজনীতিতে আধিপত্য বিস্তার করেছে।
এখন এনসিপি কিছু দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশের দ্বিদলীয় রাজনীতির জন্য একটি গুরুতর চ্যালেঞ্জ নিয়ে এসেছে, যা কয়েক দশক পর প্রথমবারের মতো বড় ধরনের একটি পরিবর্তনের সম্মুখীন হয়েছে। ঢাকায় একটি সমাবেশে এনসিপি নেতারা দ্বিতীয় একটি প্রজাতন্ত্র গড়ে তোলার অঙ্গীকার করেছিলেন এবং পুরনো ন্যারেটিভগুলো যেমন ধর্মনিরপেক্ষতা বনাম ইসলামপন্থী এবং ভারত বনাম পাকিস্তান সম্পর্কের থেকে মুক্তি চেয়েছিলেন। আবার, যা ঘটেছে তার একটি ধারণা দেওয়ার জন্য জুলাই আন্দোলনের ২৬ বছর বয়সী নেতা নাহিদ ইসলাম ইউনূস সরকারের মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করে এনসিপির আংশিক প্রধান বা কনভেনর হিসেবে মনোনীত হয়েছেন। এই নতুন রাজনৈতিক দলের আগমন কিভাবে গুরুত্বপূর্ণ এবং নির্বাচনের সম্ভাব্য তারিখ কী?
প্রশ্নের জবাবে মাহফুজ আনাম বলেন, নতুন রাজনৈতিক দলের আগমন নিঃসন্দেহে এমন কিছু, যা আমি ব্যক্তিগতভাবে খুব প্রত্যাশা করছি। কারণ যেমন আপনি বলেছেন, আমরা দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিকভাবে বাইনারি পরিস্থিতিতে ছিলাম—বিএনপি অথবা আওয়ামী লীগ- এটা ৫ বছরের একটি মেয়াদকালে দুলতে থাকত। শেষ ১৫ বছর শাসন করলেন হাসিনা। এর শুরু ১৯৯১ সাল থেকে। হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের পতনের কারণে যে বছরটি আমরা ‘গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা’র বছর বলে জানি। তখন থেকেই শুরু আওয়ামী লীগ ও বিএনপির এই ৫ বছর মেয়াদে অদল-বদলের পালা। তা ছাড়া আমাদের মনে রাখতে হবে, এরশাদের জাতীয় পার্টি আছে আর একটি দল আছে জামায়াতে ইসলামী, যা বাংলাদেশের পুরনো দলগুলোর মধ্যে অন্যতম। এখন ছাত্রদের নতুন যে দলের আগমন হলো, তা রাজনীতিতে একটি নতুন উপাদানের মতো। আর আমাদের এটাও বুঝতে হবে যে, ছাত্রদের এই রাজনৈতিক দল গঠনের মানে হলো তাদেরকে এখন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতির ভেতর আসতে হবে। তারা হাসিনাকে অপসারণ করেছিল, তাই তাদের মধ্যে এক ধরনের সফলতার অনুভূতি রয়েছে, এমন কিছু যা বিএনপি করতে পারেনি, এমন কিছু যা অন্য কোনো রাজনৈতিক দল করতে পারেনি, তারা কয়েক মাসের আন্দোলনে এটি করেছে। সুতরাং সেই আত্মবিশ্বাস তাদের মধ্যে তৈরি হয়েছে যেখানে তাদের মনে হচ্ছে যে তারা বাংলাদেশকে আমূল বদলে দিতে পারে। কিন্তু তারা রাজনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি হবে। বিশেষ করে নির্বাচনের ক্ষেত্রে। নির্বাচনের ব্যাপারটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, আমরা সবাই এটি নিয়ে অধীর আগ্রহে আছি।
প্রথমত, এটা এখন মোটামুটি নির্ধারিত যে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর বা বড়জোর জানুয়ারি পর্যন্ত গড়াতে পারে। তবে ছাত্রদের দল প্রকাশ্যেই বলছে, তারা নির্বাচনের আগে সংস্কার চায়। তাদের এই ব্যাপারটা বোধগম্য, কারণ তারা বেশ নতুন এবং নির্বাচনে যেতে কিছুটা ভীত। কারণ এতে হয়তো তারা দেখবে যে তাদের জনসমর্থন আসলে তেমন নেই।
অন্যদিকে, বিএনপি আক্ষরিক অর্থেই ক্ষমতায় আসার জন্য দরজার ওপারে অপেক্ষা করছে। কারণ আওয়ামী লীগ এখন একপ্রকার বিচ্ছিন্ন। সুতরাং বিএনপি নির্বাচনের জন্য অধীর হয়ে অপেক্ষা করছে। ছাত্ররা তেমন আগ্রহী নয় এবং জামায়াতে ইসলামী, যারা এখন বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি বড় ফ্যাক্টর, তারা দ্বিধাগ্রস্ত—তারা অপেক্ষা করতে রাজি, ১০-১৫ বছরও অপেক্ষা করতে রাজি। তারা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে যদি হয়, কিন্তু স্থগিত হলেও তাদের তেমন সমস্যা নেই। এটাই এখন পরিস্থিতি।
তবে মূল কথা হলো, দেশবাসী নির্বাচন চায়। হাসিনার সবচেয়ে বড় সমালোচনা ছিল, গত তিনটি নির্বাচনে—২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪, এ নির্বাচনগুলোয় এত বড় আকারে কারসাজি হয়েছিল যে, অনেক বেশি সংখ্যক ভোটার ভোট দিতে পারেননি। সুতরাং বর্তমানে বাংলাদেশে সবার প্রবল আগ্রহ রয়েছে যে সবাই তাদের ভোটাধিকার ফিরে পেতে চান। এই পরিস্থিতি অনুযায়ী, আমরা ডিসেম্বর মাসে নির্বাচন দেখতে যাচ্ছি, যদি তা কোনো নাটকীয় কারণে স্থগিত না হয়।
ফুয়াদ