
ছবি: সংগৃহীত
গাজীপুরের কালিয়াকৈরের সিনাবহ এলাকায় ঈদের আগের দিন গত রোববার (৩০ মার্চ) বন বিভাগের লোকজন উচ্ছেদ অভিচান পারিচালনা করেছেন। এসময় বুলডোজার দিয়ে ওই এলাকার প্রায় দুই শতাধিক বাড়িঘরসহ দোকানপাট গুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
এছাড়াও বনকর্মীরা জুয়েল (৪৫) নামের এক ব্যক্তির পা ভেঙে দিয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
অভিযানকালে চারদিকে কান্নার রোল পড়ে যায়, যেন সৃষ্টি হয় এক হৃদয়বিদারক আবহাওয়া। ঘরবাড়ি হারিয়ে তিনদিন ধরে খোলা আকাশের নিচে রাত্রিযাপন করছে ভুক্তভোগী মানুষজন। পরিবারের লোকজন নিয়ে ঈদের আনন্দ উপভোগ করবে এমন আশা নিয়ে রমজানের শেষ রোজা রেখেছিল লোকজন। কিন্তু ঈদের আগের দিনই বন বিভাগ এমন উচ্ছেদ অভিযান চালাবে, মানুষ তা ভাবতেই পারেনি।
বাড়িঘর হারানো লোকজন সূত্রে জানা গেছে, রোববার (৩০ মার্চ) সকাল ৯টা থেকে উপজেলার সিনাবহ এলাকায় বন বিভাগের লোকজন অভিযান চালিয়ে দুই শতাধিক ঘরবাড়িসহ দোকানপাট ভেঙে ফেলেছে। কেউ কেউ ঘরের ভিতর থাকা আসবাবপত্র পর্যন্ত বের করতে পারেনি, সমস্ত মালামালসহ ঘরবাড়ি গুড়িয়ে দিয়েছে।
এছাড়াও ভুক্তভোগীরা জানায়, এ এলাকায় উচ্ছেদ অভিযান চালানো হবে, শনিবার বিকেলে তা মাইকিং করেছে। ভোর হওয়ার সাথে সাথেই বন বিভাগের লোকজন পুলিশ, র্যাব, বিজিবি, আনসার, আর্মির যৌথ বাহিনী উচ্ছেদ অভিযান শুরু করে। এক ভুক্তভোগী বলেন, ‘ঘরে একমুঠো চাল নেই যে, ঈদের দিন রান্না করে বাড়ির ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের মুখে একমুঠো ভাত উঠিয়ে দিবো। এখানে আমাদের শতবছরের পুরানো ঘর বাড়ি রয়েছে।’
এছাড়া, ‘বনের জমিতে আমাদের পূর্বপুরুষরা বাড়ি বানিয়েছে। অভিযান পরিচালনা করার আগে আমাদের ঘরবাড়ি সরিয়ে নেওয়ার জন্য এক সপ্তাহ সময় দিলে সরকারের এমন কী ক্ষতি হতো?’ প্রশ্ন ভুক্তভোগীদের।
বন বিভাগ সূত্র জানায়, কালিয়াকৈর চন্দ্রা রেঞ্জের সিনাবহ এলাকায় অবৈধ দখলদারদের সরে যাওয়ার জন্য শনিবার বিকেলে নোটিশ দিয়ে মাইকিং করে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। তারা সরে যায়নি। সকালে উচ্ছেদ অভিযান শুরুর দিকে ওই এলাকায় লোকজন বাধা প্রদান করে এবং এক পর্যায়ে জবরদখলকারীদের সাথে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া হয়। এসময় বনকর্মীরা কয়েকজনকে আটক করে, পরে ছেড়ে দেয়। ৪টি বুলডোজার দিয়ে বাজারের দোকানসহ দুই শতাধিক ঘরবাড়ি গুড়িয়ে দেয়া হয়েছে।
বাগাম্বর এলাকার কালাম নামের এক স্থানীয় বলেন, ‘১০/১২ বছর আগে আমরা এখানে বাড়িঘর তৈরি করে বসবাস করে আসছি। ঈদের আগের দিন হঠাৎ করে বন বিভাগের লোকজন নির্মমভাবে আমাদের বাড়িঘর ভেঙ্গে গুড়িয়ে দিলো। আমরা এখন যাব কোথায়?’
ক্ষতিগ্রস্তরা জানায়, ‘আমরা ঘরবাড়ি করার সময় চন্দ্রা বন বিভাগের লোকদের সাথে আলোচনা করেই ঘর তৈরি করেছি, তাদের টাকা না দিয়ে কেউ ঘর করতে পারে না। আমাদের ঘরবাড়ি ভেঙে দিয়ে ঈদের আনন্দ কেড়ে নিলো।’
এ ব্যাপারে কালিয়াকৈর চন্দ্রা রেঞ্জ কর্মকর্তা শহিদুল ইসলাম জানান, ‘সরকারের নির্দেশক্রমে এ অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। তবে ঈদের একদিন আগে এই অভিযান করা ঠিক হয়নি। আমরা ঈদের পরে আবারো অভিযান পরিচালনা করবো।’ তার অফিসের লোকজনদেরকে টাকা দিয়েই বনের জমিতে কেউ কেউ নতুন ঘর করেছে এমন অভিযোগে তিনি ক্ষেপে গিয়ে বলেন, ‘তারা নিতে পারে, আমিতো টাকা নেইনি।’
ঘটনাস্থলে এমন অনেক বাড়ির মালিককে দেখা গেছে, যারা তাদের বাড়ির জমির কাগজপত্র নিয়ে রেঞ্জ কর্মকর্তার পিছনে পিছনে ঘুরছে কিন্তু রেঞ্জ কর্মকর্তা তাদেরকে কোন পাত্তাই দিচ্ছেন না।
ওই এলাকার আব্দুল জলিল (৭৫) জানান, ‘আমার বাড়িটি একশত বছরেরও পুরাতন বাড়ি। জমির কাগজপত্র সব সঠিক রয়েছে। আমি তাদের কাগজ দেখাতে গেলে তারা লাঠি দিয়ে বারি মেরে আমার হাতসহ বাড়িঘরও ভেঙে দিয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, তার বাড়ি ভাঙচুরের সময় তার বাড়ির এক নারীকে বন বিভাগের লোকজন নির্মমভাবে টেনে হিঁচড়ে ধরে নিয়ে যায়। পরে এ ঘটনায় এলাকাবাসী ক্ষিপ্ত হয়ে বন বিভাগের এফডিএম (নৌচালক) মিনহাজের উপর আক্রমণ করে। এতে তার মাথা ফেটে যায় বন বিভাগের অন্যান্য লোকজন তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে প্রেরণ করেন।
বন বিভাগের উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনাকালে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বন বিভাগের ডিএফও মোঃ বশিরুল আলম্, এসিএফ শামসুল আরেফিন, কালিয়াকৈর ভারপ্রাপ্ত রেঞ্জ কর্মকর্তা শহিদুল ইসলাম শাকিল, কাচিঘাটা রেঞ্জ কর্মকর্তা মোঃ শাহজাহান আলী, কালিয়াকৈর ও কাচিঘারেঞ্জের বিভিন্ন বিট কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা।
রাকিব