ঢাকা, বাংলাদেশ   সোমবার ৩১ মার্চ ২০২৫, ১৬ চৈত্র ১৪৩১

ঈদ-বৈশাখ ঘিরে চাঙ্গা অর্থনীতি

এম শাহজাহান

প্রকাশিত: ২৩:৩১, ২৭ মার্চ ২০২৫

ঈদ-বৈশাখ ঘিরে চাঙ্গা অর্থনীতি

নানামুখী সংকটের মধ্যেও ঈদের খুশিতে ভাসছে দেশ

নানামুখী সংকটের মধ্যেও ঈদের খুশিতে ভাসছে দেশ। এই খুশি আরও বাড়িয়ে দেয় যখন গায়ে থাকে নতুন পোশাক। আর তাই ধনী-দরিদ্র সবাই নিজ নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী ঈদের কেনাকাটা করে থাকেন। গত কয়েক বছর ধরেই ঈদের সঙ্গে বাড়তি যোগ হয়েছে বাঙালির সার্বজনীন উৎসব পহেলা বৈশাখ। বাংলা নববর্ষ আসন্ন। বছরের প্রথম দিনটি কত সুন্দরভাবে কাটানো যাবে সেই চেষ্টার কমতি নেই কারও। এ জন্যও করা হচ্ছে বাড়তি কেনাকাটা। উৎসব উদ্যাপনে কেনা হচ্ছে- পোশাক, জুতা-স্যান্ডেল, প্রসাধনী, জুয়েলারি ও খাদ্যসহ নানাবিধ পণ্য। 
ব্যবসায়ীরা সারা বছর মুখিয়ে থাকেন ঈদ ও পহেলা বৈশাখের বেচা-বিক্রির জন্য। ঈদের বাজারে জমজমাট ব্যবসা-বাণিজ্যের আশায় বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করেছেন বিভিন্ন খাতের উদ্যোক্তারা। বেচাকেনা ও বিক্রি ভালো হচ্ছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। দেশের এক কোটি প্রবাসী মা-বাবা ও আত্মীয়স্বজনের কাছে রেমিটেন্স পাঠাচ্ছেন। সেই রেমিটেন্সের জোয়ারে ভাসছে দেশ। 
চলতি মার্চ মাসের গত ২৬ দিনে রেমিটেন্স এসেছে প্রায় ৩ বিলিয়ন বা ২৯৫ কোটি ডলার। ঈদের আগে রেমিটেন্স আহরণ ৩০০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। অতীতে এ রকম দেখা যায়নি। গত বছরের শুরু থেকেই নেতিবাচক ছিল অর্থনীতি। এ অবস্থায় শুরু হয় জুলাই বিপ্লব। ৫ আগস্টের পর পালটে যায় সব হিসাব-নিকাশ। বিপর্যস্ত অবস্থায় পড়ে অর্থনীতি।

তবে অন্তর্বর্তী সরকারের ৭ মাসের চেষ্টা, রমজান ও ঈদ সামনে রেখে অর্থনীতিতে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে। ঈদের পর পরই আছে আরেকটি উৎসব। চলতি বছর জাতীয় নির্বাচনেরও আভাস আছে। এ সবই অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক। ফলে রমজান, ঈদ ও পহেলা বৈশাখের উৎসব ঘিরে অর্থনীতি চাঙা হয়েছে। 
মূলত ঈদ ও পহেলা বৈশাখের উৎসব ঘিরে অভ্যন্তরীণ ব্যবসা-বাণিজ্যে এখন সুবাতাস বইতে শুরু করেছে। নানা ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে থাকা অর্থনীতি চাঙ্গা হওয়ার সুযোগ এসেছে ঈদকে ঘিরে। অভ্যন্তরীণ বেচাকেনায় গতি ফিরেছে অর্থনীতিতে। দুই উৎসব ঘিরে কয়েক লাখ কোটি টাকার বাণিজ্য হবে বলে আশা করা হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, এবার শবেবরাতের পর থেকে কেনাকাটা করছেন নগরবাসী। আর এখন ঈদ সামনে রেখে ব্যবসায়ীদের দম ফেলার সময় নেই।

গভীর রাত পর্যন্ত ক্রেতারা কেনাকাটা করতে মার্কেটে আসছেন। ক্রেতাদের ভিড়ে ঠাসা দেশের মার্কেট, বিপণি বিতান, ফ্যাশন হাউজ ও শোরুমগুলো। তবে এবার পোশাকসহ অন্যান্য জিনিসপত্রের দাম কিছুটা বাড়লেও ভোজ্যতেল ও চাল ছাড়া বেশিরভাগ নিত্যপণ্যের দাম কমে আসছে। বৈশ্বিক সংকটের এই সময় ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় মানুষের সঞ্চয় কিছুটা কমতে পারে।

এ ছাড়া ঈদ ও পহেলা বৈশাখের লম্বা ছুটির কারণে অর্থনীতিতে কিছুটা বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে। তবে ব্যবসায়ীরা ঈদের বেচা-বিক্রি ও কেনাকাটা নিয়ে ইতোমধ্যে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। 
এবার প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্সে জোয়ার বইছে। এর সঙ্গে সরকারি-বেসরকারি খাতের বেতন-বোনাস ঈদের কেনাকাটায় খরচ হবে। অনেকে বাড়তি কেনাকাটা করতে হাতে জমানো সঞ্চয় খরচ করছেন। তবে এবারের ঈদ ও পহেলা বৈশাখ ঘিরে আসলে কত লাখ কোটি টাকার ব্যবসা-বাণিজ্য হবে সে বিষয়ে কোন গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও বাণিজ্য সংগঠনের কাছে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই।

যে যার মতো মনগড়া ও অনুমানভিত্তিত তথ্য-উপাত্ত দিচ্ছেন। যদিও বেশ কয়েক বছর আগে ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের পাশাপাশি আরও কয়েকটি সংগঠন থেকে ঈদকেন্দ্রিক অর্থনীতির আকার ঘোষণা করা হয়। এতে দেখা যায়, ঈদকেন্দ্রিক অর্থনীতির আকার প্রায় ২ লাখ থেকে ২ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকার বেশি। 
ঈদ অর্থনীতির একটি বড় চালিকাশক্তি হচ্ছে পোশাকের বাজার। এ সময় দোকানগুলোতে পোশাকের বেচাকেনা তিন থেকে চারগুণ বেড়ে যায়। এই তথ্য বেশ কয়েক বছর আগের। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এদেশ ২০ কোটি মানুষের এক বিশাল বাজার। দিন দিন অভ্যন্তরীণ চাহিদা ও ভোগ্য ব্যয় বাড়ছে। তাই ঈদ ও পহেলা বৈশাখ ঘিরে এ বছর দুই লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য হতে পারে। 
বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি ও এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সহ-সভাপতি মো. হেলাল উদ্দিন প্রত্যাশা করছেন এবারের রোজার ঈদকে ঘিরে প্রায় আড়াই লাখ কোটি টাকার বাণিজ্য হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এর মধ্যে শুধু পোশাকের বাজারেই যোগ হতে পারে ৮০ থেকে ৯০ হাজার কোটি টাকা। নিত্যপণ্যের বাজারে বাড়তি যোগ হচ্ছে ৩০-৩৫ হাজার কোটি টাকা। ধনী মানুষের দেওয়া জাকাত ও ফিতরা বাবদ আসছে প্রায় ৩৮-৪০ হাজার  কোটি টাকা। পরিবহন খাতে অতিরিক্ত বাণিজ্য ১ হাজার  কোটি টাকা। ঈদকে কেন্দ্র করে ভ্রমণ ও বিনোদন বাবদ ব্যয় হয় ৪-৫ হাজার কোটি টাকা। 
এ ছাড়া প্রায় সাড়ে ১২ লাখ সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারী, ৬০ লাখ দোকান কর্মচারী, তৈরি পোশাক ও বস্ত্র খাতের ৭০ লাখ শ্রমিক ঈদ বোনাস পাবেন, যা ঈদ অর্থনীতিতে যুক্ত হবে। পাশাপাশি প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্স আসছে প্রতিদিন প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা করে। ঈদের সময়ে প্রবাসীরা তাদের আত্মীয়স্বজনের কাছে বাড়তি ব্যয় মেটাতে পাঠানো প্রচুর পরিমাণে এ বৈদেশিক মুদ্রা ঈদ অর্থনীতি চাঙ্গা করতে অন্যতম বড় ভূমিকা রাখছে। ঈদকে ঘিরে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রায় দুই লাখ কোটি টাকার ব্যবসা হয়েছে। 
বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ১ লাখ ৯৬ হাজার কোটি টাকার মতো ব্যবসা হয়। তার আগের বছর ২০২৩ সালে ঈদকেন্দ্রিক ব্যবসা হয় ১ লাখ ৮৭ হাজার কোটি টাকা। ১০ বছর আগে ২০১৫ সালে ঈদকেন্দ্রিক ব্যবসা ছিল ১ লাখ ৫৫ হাজার কোটি টাকার মতো। এবার ঈদকেন্দ্রিক আড়াই লাখ কোটি টাকার ব্যবসা হবে বলে আশা করছেন ব্যবসায়ীরা। 
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি  মো. হেলাল উদ্দিন জনকণ্ঠকে বলেন, এবার দেশে কিছুটা অস্থিতিশীল পরিস্থিতি থাকলেও মানুষের মনে স্বস্তি আছে। দলে দলে মানুষ মার্কেট-শপিং মলে আসছেন ঈদ কেনাকাটা করতে। তবে রোজার শুরুতে মার্কেটগুলোতে বিক্রি কিছুটা কম হলেও মধ্য রোজার পর থেকে বিক্রি-বাট্টা বেড়েছে। আর শেষ দিকে এসে তো মার্কেটে ক্রেতার ভিড়ে পা ফেলার জায়গা নেই। কারণ সরকারি-বেসরকারি চাকরিজীবীরা বোনাস হাতে পেয়েছেন।

এ ছাড়া সরকারি চাকরিজীবী এবং ব্যাংকাররা চলতি মাসের বেতনও ইতোমধ্যে হাতে পেয়ে গেছেন। তাই পোশাক বাজার, খাদ্যপণ্যের বাজার থেকে শুরু করে সব ধরনের বাজারেই ক্রেতার ভিড় বেড়েছে। আমরা আশা করছি, এবারের ঈদবাজার সব মিলিয়ে খুব ভালো কাটবে এবং ব্যবসায়ীরা প্রত্যাশার চেয়েও ভালো পণ্য বিক্রি করতে পারবেন। 
তিনি আরও বলেন, ঈদের আগে এখনো যেহেতু সপ্তাহখানেক সময় রয়েছে, তাই ঠিক কত টাকার ঈদ বাণিজ্য এবার হবেÑ সেটি এখনই বলা যাচ্ছে না। সঠিক হিসাব রোজার পর বলা যাবে। তবে আমরা আশা করছি, এবারের ঈদকেন্দ্রিক আড়াই লাখ কোটি টাকার ব্যবসা হবে। আমাদের এ টার্গেট পূর্ণ হবে কি না, সেটি বলতে পারছি না। কারণ এবার পণ্যের দাম কিছুটা বাড়তি। অবশ্য আমরা আশাবাদী আড়াই লাখ কোটি টাকার ব্যবসা না হলেও বিক্রি পরিস্থিতি আমাদের প্রত্যাশার কাছাকাছিই থাকবে।
বেশি বেচাকেনা পোশাকেই ॥ ঈদে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয় পোশাক সামগ্রী। ঈদে শীর্ষ ১০ পণ্যের কেনাকাটায় দেড় লাখ কোটি টাকার বাণিজ্য হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এর মধ্যে সবার শীর্ষে থাকে পোশাক। এর পরই জুতা-স্যান্ডেল, লুঙ্গি-গেঞ্জি-গামছা। খাদ্যপণ্যের মধ্যে সেমাই-চিনি, মাংস, মিষ্টি, গ্রসারী পণ্য রয়েছে।

প্রসাধনী, ইলেক্ট্রনিক্স টিভি, মোবাইলসহ নানা ধরনের পণ্যও  বেচা-কেনা হয় ঈদ উপলক্ষে। অনেকে আবার  সোনার গয়না, ঘরের আসবাবপত্র কেনেন বলে ঈদে এসব পণ্যের বিক্রি স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে অনেক গুণ বেড়ে যায়। এর বাইরে ঈদের ছুটিতে পর্যটন খাতেও মানুষ অর্থ ব্যয় করে। 

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, মধ্যবিত্ত  শ্রেণির একটি পরিবার ন্যূনতম থেকে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা ব্যয় করে ঈদকে ঘিরে। সামর্থ্য অনুযায়ী এই অঙ্ক আরও বাড়ে। ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, ঈদে পোশাকসহ পরিধেয় খাতে থেকে ১ লাখ কোটি, জুতা-কসমেটিকস ৪ হাজার কোটি, ভোগ্যপণ্য সাত থেকে ৯ হাজার কোটি, জাকাত-ফিতরা ও দান-খয়রাত ৩৮ হাজার কোটি, যাতায়াত বা  যোগাযোগ খাতে ১০ হাজার কোটি, সোনা-ডায়মন্ড পাঁচ হাজার কোটি, ভ্রমণ খাতে সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি, ইলেকট্রনিক্স চার হাজার কোটি, স্থায়ী সম্পদ ক্রয় এক হাজার কোটি, পবিত্র ওমরাহ পালন তিন হাজার কোটি, আইনশৃঙ্খলাসহ অন্যান্য খাতে লেনদেন হয় আরও এক হাজার কোটি টাকা। 
তবে এফবিসিসিআইয়ের পাশাপাশি আরও কয়েকটি সংগঠন থেকে ঈদকেন্দ্রিক অর্থনীতির আকার ঘোষণা করা হয়েছে। এতে দেখা যায়, ঈদকেন্দ্রিক অর্থনীতির আকার প্রায় ২ থেকে আড়াই লাখ কোটি টাকার বেশি। এদিকে, ঈদ অর্থনীতির একটি বড় চালিকাশক্তি হচ্ছে পোশাকের বাজার। এ সময় দোকানগুলোতে পোশাকের বেচাকেনা তিন থেকে চারগুণ বেড়ে যায়। 
অভ্যন্তরীণ পোশাকের সবচেয়ে বড় জোগান আসে পুরানা ঢাকার উর্দু রোডের পোশাক মার্কেট থেকে। ঢাকার বিভিন্ন মার্কেটসহ দেশের বিভাগ ও জেলা-উপজেলা পর্যায়ের মার্কেটগুলোতে দেশী পোশাক সরবরাহ হয় পুরান ঢাকার এই মোকাম থেকে। এর বাইরে ভারত, পাকিস্তান, থাইল্যান্ড এবং চীন থেকেও প্রচুর তৈরি পোশাক আমদানি করা হয়। ঈদ বাজারে এসব দেশ থেকে পোশাক আমদানি আরও বেড়ে যায়। সব মিলে এবারের ঈদে পোশাক বাজার থেকে এক লাখ কোটি টাকার বাণিজ্য হওয়ার আশা ব্যবসায়ীদের। 
এ ছাড়া ঈদে সব ধরনের নিত্যপণ্যের চাহিদা বেড়ে যায়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ভোজ্যতেল, মাংস, চিনি, ডাল, সেমাই ও পেঁয়াজ। ফলে এসব পণ্যের আমদানিও বাড়ে। রোজা ও ঈদে  ভোজ্যতেলের চাহিদা হচ্ছে প্রায় আড়াই লাখ টন, চিনি সোয়া ২ লাখ টন থেকে পৌনে তিন লাখ টন, ডাল ৬০ হাজার টন, ছোলা ৫০ হাজার টন, খেজুর ১৩ হাজার টন, পেঁয়াজ ৩ লাখ ২৫ হাজার থেকে ৩ লাখ ৫০ হাজার টন এবং রসুনের চাহিদা প্রায় ৮০ হাজার টন। এসব পণ্য আমদানিতে ব্যবসায়ীদের নিজস্ব টাকার পাশাপাশি ব্যাংক থেকে মোটা অঙ্কের টাকার জোগান দেওয়া হয়।
ভোগ্যপণ্যের বাজার ॥  ঈদে সব ধরনের নিত্যপণ্যের চাহিদা বেড়ে যায়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ভোজ্যতেল, মাংস, চিনি, ডাল, সেমাই ও পেঁয়াজ। ফলে এসব পণ্যের আমদানিও বাড়ে। রোজা ও ঈদে  ভোজ্যতেলের চাহিদা প্রায় তিন লাখ টন, চিনি দুই লাখ থেকে পৌনে তিন লাখ টন, ডাল ৬০ থেকে ৭০ হাজার টন, ছোলা ৫০-৬০ হাজার টন, খেজুর ১৫ হাজার টন, পেঁয়াজ ৩ লাখ ৫০ হাজার থেকে ৪ লাখ টন এবং রসুনের চাহিদা প্রায় ৮০ হাজার টন। 
এসব পণ্য আমদানিতে ব্যবসায়ীদের নিজস্ব টাকার পাশাপাশি ব্যাংক থেকে মোটা অঙ্কের জোগান দেওয়া হয়। ১৪ লাখ সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারী অষ্টম বেতন কাঠামোর আলোকে ঈদ  বোনাস পাচ্ছেন। এর মধ্যে রয়েছে তিন বাহিনী, পুলিশ, বিজিবি, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের কর্মকর্তা ও কর্মচারী। এ ছাড়া  বেসরকারি অফিস-প্রতিষ্ঠানগুলোও নিজস্ব কাঠামোতে বোনাস দিচ্ছে। এ ছাড়া পোশাক ও বস্ত্র খাতের প্রায় ৭০ লাখ কর্মীর বোনাসও রয়েছে, যা পুরোটাই যোগ হচ্ছে ঈদ অর্থনীতিতে। ঈদ উৎসব অর্থনীতিতে সারাদেশের দোকান কর্মচারীদের বোনাস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। 
বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির হিসাবে দেশে ২৬ লাখ দোকান, শপিং মল, বাণিজ্য বিতান রয়েছে। গড়ে একটি দোকানে তিনজন করে ৬০ লাখ জনবল কাজ করছে। একজন কর্মীকে ৬ হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকা করে বোনাস দেওয়া হয়। যা পুরোটাই ঈদ উৎসব অর্থনীতিতে যোগ হচ্ছে। তৃতীয় উৎসবের মধ্যে রয়েছে পহেলা বৈশাখ।

বাঙালির সার্বজনীন উৎসব এটি। ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে এই একটি দিনে সবাই যেন বাঙালি হয়ে যায়। বৈশাখের অর্থনীতির সুনির্দিষ্ট আকার নিয়ে এখনো প্রাতিষ্ঠানিক কোনো গবেষণা হয়নি। তবে সূত্রের হিসাবে লেনদেনের সম্ভাব্য পরিমাণ হবে ১৫ হাজার কোটি টাকা।
২৬ লাখ দোকানে হয়েছে ঈদের কেনাকাটা ॥ বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির তথ্যমতে, ঈদে সারাদেশের ২৬ লাখ দোকানে কেনাকাটা শুরু হয়েছে। মুদি দোকান থেকে শুরু করে এসব দোকানের মধ্যে কাপড়ের দোকান, শোরুম ও ফ্যাশন হাউসগুলোও রয়েছে। এসব দোকানে বছরের অন্য সময় প্রতিদিন ৩ হাজার কোটি টাকার পণ্য বিক্রি হলেও রোজার মাসে সেটি তিনগুণ বেড়ে হয় ৯ হাজার কোটি টাকা।

ওই হিসেবে রোজার এক মাসে এই ২৬ লাখ দোকানে ঈদ পোশাক থেকে শুরু করে ভোগ্যপণ্য বিক্রি হবে প্রায় ২ লাখ কোটি টাকারও বেশি। ঈদুল ফিতরে সবচেয়ে বেশি টাকা লেনদেন হয় পোশাকের বাজারে। পোশাকের দোকানেই ঈদের কেনাকাটা এবার ৮০ হাজার থেকে ১ লাখ কোটি কোটি টাকার বেশি। শুধু তাই নয়, ঈদ ঘিরে অর্থনীতির সব খাতেই গতি ফিরে আসে। ঈদের মাসে যেমন সারাদেশের শপিং মল বা মার্কেটগুলো গতিশীল হয়-তেমনি সারাদেশের কুটিরশিল্প, তাঁতশিল্প, দেশীয় বুটিক হাউসগুলোয় বাড়ে কর্মচাঞ্চল্য ও আর্থিক লেনদেন। বিপুল অর্থ ব্যয়ের কারণে অর্থনীতিতে বড় ধরনের গতিশীলতা আসে।
আসছে রেকর্ড পরিমাণে রেমিটেন্স ॥ ঈদ অর্থনীতিতে পোশাকের বাজারের পর বড় অবদান রাখে রেমিটেন্স। এবারের ঈদের আগে যে হারে রেমিটেন্স আসছে তাতে এবার দেশের ইতিহাসে নতুন রেকর্ড সৃষ্টি হতে যাচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাব মতে, চলতি মাস মার্চের প্রথম ২৬ দিনেই এসেছে প্রায় ৩ বিলিয়ন বা ২৯৫ কোটি ডলারের রেমিটেন্স। বাংলাদেশী মুদ্রায় যার পরিমাণ ৩৬ হাজার কোটি টাকার বেশি। ওই হিসেবে প্রতিদিন আসছে প্রায় ১১.৩৪ কোটি ডলার বা প্রায় ১৩৮৪ কোটি টাকা করে। দেশের ইতিহাসে এর আগে কখনোই এত পরিমাণ  রেমিটেন্স আসেনি। 
এর আগে সর্বোচ্চ (প্রায় ২৬৪ কোটি ডলার) রেমিটেন্স আসে গত ডিসেম্বরে। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ প্রবাসী আয় এসেছে গত মাস ফেব্রুয়ারিতে (প্রায় ২৫৩ কোটি ডলার)।  মাস শেষে এই রেমিটেন্স নতুন উচ্চতায়  পৌঁছবে বলে আভাস মিলছে। অর্থাৎ তিন বিলিয়ন ডলারের ঘর অতিক্রম করবে রেমিটেন্স বা প্রবাসী আয়। এর ফলে রেমিটেন্সে নতুন রেকর্ড করবে দেশ। একদিকে বিপুল পরিমাণ রেমিটেন্স, অন্যদিকে বেচাকেনায় বাড়ায় চাঙা হয়ে উঠছে দেশের অর্থনীতি। 
এ প্রসঙ্গে ঈদ অর্থনীতি নিয়ে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও সিপিডির সম্মানীয় ফেলো প্রফেসর ড. মোস্তাফিজুর রহমান জনকণ্ঠকে বলেন, দেশের অর্থনীতিতে ঈদবাজারের অবদান প্রতি বছরই বাড়ছে। ঈদকে ঘিরে সারাদেশের নগদ অর্থের প্রবাহে বেড়ে যায়। ব্যাংকগুলোতে কর্মচাঞ্চল্য বাড়ে। সব মিলিয়ে বছরের দুটি ঈদ দেশের অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

এ ছাড়া গ্রামীণ অর্থনীতিও গতিশীল হয় ঈদকে ঘিরে। কারণ প্রবাসীরা দেশের বাইরে থাকার কারণে পরিবার-পরিজনের জন্য প্রচুর রেমিটেন্স পাঠান। সব মিলিয়ে ঈদকে ঘিরে দেশের অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যে এক অন্য রকম গতি ফিরে আসে।

আরো পড়ুন  

×