ঢাকা, বাংলাদেশ   শুক্রবার ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, ১৫ ফাল্গুন ১৪৩১

মালয়েশিয়াতেও শেখ পরিবারের জালিয়াতি

অনলাইন রিপোর্টার

প্রকাশিত: ০১:৪৩, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৫

মালয়েশিয়াতেও শেখ পরিবারের জালিয়াতি

ছবি; সংগৃহীত

এক্সপোর্ট সার্ভিসেস কুয়ালালামপুর লিমিটেড (ইএসকেএল) শেখ পরিবার ঘনিষ্ঠদের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান। কোম্পানিটির ৩০ শতাংশ শেয়ার নিয়ে পরিচালক হওয়া আমেরিকান নাগরিক মোহাম্মদ তাবিথ আউয়ালকে নিয়ে তৈরি হয়েছে কৌতূহল।

দুর্নীতি ও সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে ইএসকেএলের সঙ্গে চুক্তি বাতিল করে অন্তর্বর্তী সরকার। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানটি আবারও কাজের অনুমোদন পেয়েছে। এর পেছনের কারিগর রহস্যমানব তাবিথ। তিনি যেন জাদুরকাঠি হয়ে আবির্ভূত হয়েছেন।

বর্তমান সরকারের প্রত্যাখ্যাত ইএসকেএল স্বাভাবিক কার্যক্রমে ফেরায় গুঞ্জন শুরু হয়েছে নানা মহলে। কৌতূহল বাড়ছে রহস্যময় আমেরিকান নাগরিককে নিয়ে, কে এই তাবিথ। তাকে নিয়ে মালয়েশিয়া প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে বেশ আলোচনা হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, আওয়ামী লীগ সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী একে আবদুল মোমেনের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত গিয়াস উদ্দিন নামে এক ব্যবসায়ী ওই প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি)। এর পেছনে মূল মালিকানায় ছিলেন শেখ পরিবারের ঘনিষ্ঠ চিফ হুইপ নুরে আলম চৌধুরী লিটন ও তার ভাই নিক্সন চৌধুরী।

পর্দার আড়ালে প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে শেখ রেহানাও যুক্ত ছিলেন বলে গুঞ্জন রয়েছে মালয়েশিয়ায়। তাদের দাপটেই মূলত পূর্ব অভিজ্ঞতা যাচাই-বাছাই এবং টেন্ডার ছাড়াই প্রতিষ্ঠানটিকে নিয়োগ করা হয় ই-পাসপোর্ট ও ভিসা প্রসেস করার গুরুত্বপূর্ণ কাজে।

মালয়েশিয়া প্রবাসীদের ই-পাসপোর্ট ও বাংলাদেশ ভ্রমণে আগ্রহী দেশটির নাগরিকদের ভিসা প্রসেসের জন্য ২০২৩ সালের ২ সেপ্টেম্বর অনুমোদন পেয়েছিল ইএসকেএল। পূর্ব অভিজ্ঞতা ও কাজের সক্ষমতা যাচাই-বাছাই এবং প্রতিযোগিতামূলক টেন্ডার ছাড়াই শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী সরকারের ইচ্ছায় কোম্পানিটিকে গুরুত্বপূর্ণ এ কাজ দেওয়া হয়। বিষয়টি নিয়ে তখন প্রশ্ন উঠলেও মুখ ফুটে কেউ বলার সাহস পাননি।

ড. মুহাম্মদ ইউনূস নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গত ডিসেম্বরে কোম্পানিটির সঙ্গে চুক্তি বাতিল করে। কিন্তু তাবিথ আউয়াল প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক হিসেবে যোগ দেওয়ার পর সেই সিদ্ধান্ত স্থগিত করে আবারও অনুমতি দিতে হয়েছে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ ওঠা কোম্পানিটিকে।

তাবিথ আউয়াল নিয়ে কৌতূহলের সূত্র ধরে অনুসন্ধানে পাওয়া যায়, প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে ৩০ শতাংশ শেয়ারের বিনিময়ে নতুন পরিচালক হয়েছেন তাবিথ। তার নামের সঙ্গে নাগরিকত্ব উল্লেখ রয়েছে আমেরিকান হিসেবে। এ ছাড়া নথিতে তার আবাসিক ঠিকানা উল্লেখ করা হয়েছে থাইল্যান্ডে।

ব্যবসায়িক ঠিকানা উল্লেখ করা হয়েছে মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে। বাংলাদেশের সঙ্গে তার কোনো সম্পৃক্ততা কাগজে-কলমে নেই। যদিও কুয়ালালামপুরে বাংলাদেশ হাইকমিশনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, হাইকোর্টের এক আদেশে কার্যাদেশ ফিরে পেয়েছে ইএসকেএল।

অনুসন্ধানে জানা যায়, কোম্পানিটিকে কাজের অনুমোদন দেওয়ার সময় ভিসা প্রসেস ও ই-পাসপোর্টের জন্য হাইকমিশনে স্থাপিত পাসপোর্ট সার্ভিস সেন্টার থেকে সরকারি সার্ভারসহ কম্পিউটার সরঞ্জামাদি এই প্রতিষ্ঠানে স্থানান্তর করা হয়। একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হওয়ার পর রাষ্ট্রীয় সম্পদ দেওয়া হয় প্রতিষ্ঠানটিকে। মালয়েশিয়া প্রবাসী বাংলাদেশিদের সব তথ্য এই সার্ভারে সংরক্ষিত ছিল। এতে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হাতে চলে যায় প্রবাসীদের ব্যক্তিগত তথ্য।

বর্তমান সরকার চুক্তি বাতিল করে ই-পাসপোর্টের জন্য স্থাপিত এই যন্ত্রপাতি হাইকমিশনে ফিরিয়ে আনার জন্য দিন ধার্য ছিল ১৮ ফেব্রুয়ারি। কিন্তু এর আগের দিন এই সিদ্ধান্ত বাতিল করে পাল্টা চিঠি দেওয়া হয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে। এতে শেখ পরিবার ঘনিষ্ঠ এই প্রতিষ্ঠান ই-পাসপোর্ট ও ভিসা প্রসেসিং সেবা চালিয়ে যাওয়ার পুনরায় অনুমোদন পায়।

মালয়েশিয়ান প্রবাসী বাংলাদেশিদের পাসপোর্ট প্রসেসিং এবং স্থানীয় মালয়েশিয়ানদের ভিসা প্রসেস সার্ভিসের নামে ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে হঠাৎ করেই আত্মপ্রকাশ ঘটে এই প্রতিষ্ঠানের। তখন থেকে ই-পাসপোর্ট আবেদন গ্রহণ ও প্রসেসিং করা এবং বাংলাদেশ ভ্রমণে আগ্রহী স্থানীয় মালয়েশিয়ানদের ভিসার জন্য আবেদন বেসরকারি এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে করতে হতো। কোম্পানিটি দায়িত্ব পাওয়ার এক বছরও হয়নি। এর মধ্যে গত ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যান।

এই অল্প সময়েই প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। মালয়েশিয়া প্রবাসী বাংলাদেশিদের হয়রানি কমা তো দূরের কথা, উল্টো ভোগান্তি বেড়েছিল। মনগড়া ফি আদায়সহ নানা দুর্নীতির অভিযোগ উঠায় চরম সমালোচনার সম্মুখীন ছিল প্রতিষ্ঠানটি। এমনকি মনগড়া ফি আদায়ের প্রতিবাদ করলে অনেক ই-পাসপোর্ট আবেদনকারীর গায়ে হাত তোলার অভিযোগও রয়েছে।

সূত্র জানায়, পাসপোর্ট প্রসেসের মূল দায়িত্ব হচ্ছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের। কিন্তু এই প্রতিষ্ঠানকে ই-পাসপোর্ট আবেদন প্রসেস করার দায়িত্ব দেওয়ার সময় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে কোনো অনুমতি নেওয়া হয়নি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিজস্ব এখতিয়ারে এই কোম্পানিকে অনুমোদন দেয়।

বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর গত ডিসেম্বরে ইএসকেএলের সঙ্গে সব চুক্তি বাতিল করে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় সব যন্ত্রপাতি কুয়ালালামপুর হাইকমিশনে ফিরিয়ে আনার নির্দেশ দেওয়া হয়। সে নির্দেশনা অনুযায়ী ১৮ ফেব্রুয়ারি যন্ত্রপাতি ফিরিয়ে আনার জন্য তারিখ নির্ধারিত ছিল। কিন্তু তাবিথ আউয়াল যুক্ত হওয়ার পর হাইকোর্টের একটি আদেশের অজুহাতে মেশিনপত্র খুলে আনা আর সম্ভব হয়নি। মালয়েশিয়ান সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দপ্তরে জমা দেওয়া শেয়ার হস্তান্তর রেকর্ডে দেখা যায়, নতুন যুক্ত হওয়া তাবিথকে কোম্পানিটির পরিচালক নিয়োগের তারিখ দেখানো হয়েছে ২০২৪ সালের ২ ডিসেম্বর।

এদিকে অপর একটি সূত্র জানায়, শুরু থেকেই এই কোম্পানিকে নানাভাবে সুযোগ-সুবিধা তৈরি করে দেওয়ার পেছনের কারিগর ছিলেন মালয়েশিয়ায় নিযুক্ত ডেপুটি হাইকমিশনার খোরশেদ আলম খাস্তগীর ও হাইকমিশনের প্রশাসনিক কর্মকর্তা প্রণব কুমার ভট্টচার্য্য।

খোরশেদ আলম খাস্তগীর ২০২০ সালের নভেম্বরে কুয়ালালামপুরে বাংলাদেশ হাইকমিশনে বদলি হয়েছিলেন। ফ্যাসিবাদী শেখ হাসিনা সরকারের একান্ত অনুগত কর্মকর্তা হিসেবে তিনি পরিচিত। জুলাই-আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের সময় মালয়েশিয়ায়ও প্রবাসী বাংলাদেশিরা নানাভাবে ফ্যাসিবাদবিরোধী লড়াইয়ে যুক্ত হন।

তখন খোরশেদের উদ্যোগে কুয়ালালামপুরের একটি থানায় বাংলাদেশিদের আসামি করে মামলা করার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় এসে তাকে নেদারল্যান্ডসে রাষ্ট্রদূত হিসেবে পদোন্নতি দেয়। কিন্তু ব্যাপক সমালোচনার মুখে তা স্থগিত করা হয়। বর্তমানে মালয়েশিয়ায় তিনি একই পদে রয়েছেন।
 

শহীদ

×