ঢাকা, বাংলাদেশ   বৃহস্পতিবার ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, ১৫ ফাল্গুন ১৪৩১

ট্রাম্প ঝুঁকছেন পুতিনের প্রতি, স্টারমার কি তাকে পারবেন ফেরাতে?

প্রকাশিত: ১৯:৪৫, ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৫; আপডেট: ২০:০৮, ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৫

ট্রাম্প ঝুঁকছেন পুতিনের প্রতি, স্টারমার কি তাকে পারবেন ফেরাতে?

ছবিঃ সংগৃহীত

যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী গত কয়েক মাস ধরে সাবধানে ট্রাম্পের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলছেন। নির্বাচনের আগেই তিনি ট্রাম্পের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছেন, আর ট্রাম্পও বলেছেন, স্টারমার তার প্রতি "খুব ভালো" আচরণ করছেন।

বৃহস্পতিবার, ওয়াশিংটনে তাদের বৈঠক এই সম্পর্কের পরীক্ষার মুহূর্ত। ইউক্রেন সংকট যখন গভীর হচ্ছে, তখন স্টারমার ইউরোপ এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সেতুবন্ধনকারী নেতা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। তিনি কি ট্রাম্পকে বোঝাতে পারবেন যে পশ্চিমা বিশ্বের ঐক্য ধরে রাখা জরুরি?

অন্যথায়, তিনি বুঝতে পারেন যে তিনি এমন একটি সম্পর্ক তৈরি করছেন যা বাস্তবে কোনো কাজে আসবে না। স্টারমার এবং ট্রাম্পের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে রয়েছে বিশাল পার্থক্য। স্টারমার বারবার যুক্তরাজ্য-যুক্তরাষ্ট্রের "বিশেষ সম্পর্ক" এর কথা বললেও, বাস্তবে সেই সম্পর্ক এখন অনিশ্চিত।

ক্লেয়ার আইন্সলি, স্টারমারের সাবেক নীতি পরিচালক, বলেছেন, "এই সফর শুধু যুক্তরাজ্যের জন্য নয়, পুরো ইউরোপের জন্য একটি বড় পরীক্ষা।"

ইউক্রেন ইস্যুতে ট্রাম্পকে রাজি করানো যাবে?
ট্রাম্পের ইউক্রেন নীতি ইউরোপের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছেন, ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কির সমালোচনা করেছেন এবং ইউরোপের নেতাদের সঙ্গে দূরত্ব বজায় রেখেছেন।

স্টারমারের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হবে ট্রাম্পকে বোঝানো যে ইউক্রেন সংকট সমাধানে আমেরিকার সক্রিয় ভূমিকা রাখা জরুরি। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ ইতোমধ্যেই এই চেষ্টা করেছেন, এবার পালা স্টারমারের।

যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স ইউক্রেনের জন্য একটি সম্ভাব্য শান্তিরক্ষী বাহিনী গঠনের পরিকল্পনা করছে, যা তখনই কার্যকর হবে যদি আমেরিকা একটি "ব্যাকস্টপ" হিসেবে সামরিক উপস্থিতি নিশ্চিত করে—সম্ভবত পোল্যান্ড বা রোমানিয়ায়।

স্টারমার ওয়াশিংটনে যাওয়ার পথে সাংবাদিকদের বলেন, "আমেরিকার নিরাপত্তা নিশ্চয়তা ছাড়া ইউরোপ একা এই দায়িত্ব নিতে পারবে না।"

কিন্তু ট্রাম্প কি এতে রাজি হবেন? তিনি ইতোমধ্যেই বলেছেন, ইউরোপকেই এই দায়িত্ব নিতে হবে। তার কাছে স্টারমারের সফরের গুরুত্ব ততটা নাও থাকতে পারে, যতটা স্টারমারের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ।

প্রতিরক্ষা বাজেট বৃদ্ধি: ট্রাম্পকে খুশি রাখার চেষ্টা?
স্টারমার তার সফরের আগেই ট্রাম্পের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছেন—যুক্তরাজ্য ২০২৭ সালের মধ্যে প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়িয়ে জিডিপির ২.৫% এবং পরবর্তী দশকের মাঝামাঝি ৩% করবে।

এই ঘোষণা একদিকে যুক্তরাজ্যের সামরিক শক্তি বৃদ্ধির জন্য জরুরি, অন্যদিকে এটি ট্রাম্পের মন জয় করার কৌশলও হতে পারে।

তিনি বলেন, "আমাদের নিরাপত্তা নীতি বদলাতে হবে, কারণ এখনকার চ্যালেঞ্জের জন্য দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা দরকার।"

তবে এই সিদ্ধান্ত কি শুধুই রাজনৈতিক কৌশল, নাকি সত্যিই যুক্তরাজ্যের সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা?

স্টারমার-ট্রাম্প সম্পর্ক: জটিল এক সমীকরণ
ইউরোপের কিছু নেতা ট্রাম্পকে এড়িয়ে চলতে চান। জার্মানির সম্ভাব্য পরবর্তী চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মার্জ বলেছেন, "ইউরোপের উচিত আমেরিকার ওপর নির্ভরশীলতা কমানো।"

কিন্তু স্টারমার ট্রাম্পের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে চান। তিনি বিশ্বাস করেন, সঠিকভাবে বোঝানো গেলে ট্রাম্পকে পশ্চিমা জোটের সঙ্গে রাখা সম্ভব।

তবে এটি সহজ হবে না। অতীতে স্টারমার ট্রাম্পের বিরুদ্ধে কড়া সমালোচনা করেছেন। একসময় তিনি বলেছিলেন, "ট্রাম্প যদি বরিস জনসনকে সমর্থন করেন, তবে সেটিই প্রমাণ করে জনসন প্রধানমন্ত্রী হওয়ার যোগ্য নন।"

এদিকে, ট্রাম্পও লেবার পার্টির বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছেন যে তারা তার নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করেছে।

এখন স্টারমার সতর্ক কৌশল অবলম্বন করছেন। কিন্তু তার দলের ভেতরেই অনেকে ট্রাম্পের ইউক্রেন ও গাজা নীতির সমালোচনা করছেন। এক লেবার এমপি সিএনএনকে বলেন, "টুইট করে পররাষ্ট্রনীতি চালানো যায় না। এটি ইউরোপের নিরাপত্তার জন্য বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।"

চাগোস দ্বীপ: আরেকটি বিতর্কিত সিদ্ধান্ত
স্টারমারের জন্য আরও একটি চ্যালেঞ্জ হলো চাগোস দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা। ব্রিটেনের শেষ আফ্রিকান উপনিবেশগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম, যা মরিশাসের কাছে হস্তান্তরের পরিকল্পনা চলছে।

ডিয়েগো গার্সিয়া দ্বীপে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। স্টারমারের দল বলছে, এই চুক্তি হলে ঘাঁটিটি ৯৯ বছরের জন্য নিরাপদ থাকবে। তবে ট্রাম্প এতে সন্তুষ্ট নাও হতে পারেন।

যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রতিরক্ষা সচিব গ্রান্ট শ্যাপস এই চুক্তিকে "অবাস্তব" বলে অভিহিত করেছেন। তিনি সতর্ক করেছেন, "চীন এই দ্বীপ ব্যবহার করে নিজেদের প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টা করতে পারে।"

একজন লেবার এমপি সিএনএনকে বলেন, "জাতীয় নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে আমি নিশ্চিত নই যে এটি আমাদের জন্য সঠিক সিদ্ধান্ত।"

স্টারমারের সামনে কঠিন পথ
ইউক্রেন, চাগোস, চীন এবং অতীতে ট্রাম্পকে নিয়ে দেওয়া মন্তব্য—সব মিলিয়ে স্টারমারের জন্য ওয়াশিংটন সফর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি সরাসরি ট্রাম্পকে চ্যালেঞ্জ করবেন না, কিন্তু এখন সময় এসেছে কঠিন আলোচনা শুরুর।

স্টারমার মূলত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দিতে চান, শত্রু তৈরি করতে চান না। কিন্তু বৈশ্বিক পরিস্থিতি তাকে একটি বড় ভূরাজনৈতিক খেলায় নিয়ে এসেছে।

সোমবার স্টারমার স্বীকার করেছেন, "ট্রাম্প ইউক্রেন ইস্যুতে বিশ্বব্যাপী আলোচনার ধারা পরিবর্তন করে দিয়েছেন। এখন যুক্তরাজ্যের সময় হয়েছে নেতৃত্ব দেওয়ার।"

তথ্যসূত্রঃ https://edition.cnn.com/2025/02/26/uk/starmer-trump-meeting-preview-ukraine-gbr-intl/index.html

মারিয়া

×