ঢাকা, বাংলাদেশ   বৃহস্পতিবার ০৩ এপ্রিল ২০২৫, ২০ চৈত্র ১৪৩১

মাদারীপুর মুক্ত দিবস আজ

প্রকাশিত: ২১:৩৯, ১০ ডিসেম্বর ২০২০

মাদারীপুর মুক্ত দিবস আজ

নিজস্ব সংবাদদাতা, মাদারীপুর, ৯ ডিসেম্বর ॥ মাদারীপুর মুক্ত দিবস ১০ ডিসেম্বর। ১৯৭১ সালের এই দিনে খলিল বাহিনীর ৩ শতাধিক মুক্তিযোদ্ধা ও পাকি হানাদার বাহিনীর মধ্যে একটানা ৩৬ ঘণ্টা সম্মুখ যুদ্ধের পর এক মেজর ও এক ক্যাপ্টেনসহ ৩৯ জল্লাদ আত্মসমর্পণ করায় মাদারীপুর শত্রুমুক্ত হয়। অথচ স্বাধীনতা অর্জনের ৫০ বছর আসন্ন হলেও চূড়ান্ত হয়নি শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের নামের তালিকা। ফলে অবহেলায় নামহীন অবস্থায় দাঁড়িয়ে রয়েছে ‘শহীদ মুক্তিযোদ্ধা স্মৃতিস্তম্ভ’। প্রশাসন ও মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কাছ থেকেও মেলেনি সদুত্তর। ১৯৭১ সালে রণাঙ্গনের যুদ্ধে ২৫ নবেম্বর শিবচর, ৪ ডিসেম্বর রাজৈর ও ৮ ডিসেম্বর কালকিনি থানা শত্রুমুক্ত হয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের দখলে চলে আসে। এসব থানা ক্যাম্পের হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসররা মাদারীপুর শহরের এ আর হাওলাদার জুট মিলের অভ্যন্তরে ও বর্তমান মাদারীপুর সরকারী কলেজে অবস্থান নেয়। এ সময় মুক্তিযোদ্ধারা চারদিক থেকে তাদের ঘিরে রাখে। ৮ ডিসেম্বর দুপুরে তৎকালীন মহকুমা প্রশাসক আবদুল মতিনের জীপের ড্রাইভার আলাউদ্দিন মিয়া গোপনে গিয়ে কলাগাছিয়া মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে সংবাদ পৌঁছে দেয় যে, ৯ ডিসেম্বর ভোর রাতে পাকি বাহিনী মাদারীপুর থেকে ফরিদপুরের উদ্দেশে পালিয়ে যাবে। এ সংবাদ পেয়ে বিভিন্ন অঞ্চলের ৩ শতাধিক মুক্তিযোদ্ধা বর্তমান সদর উপজেলার ঘটকচর থেকে সমাদ্দার ব্রিজের পশ্চিম পাড় পর্যন্ত মহাসড়কের দুপাশে প্রায় ৪. কিমিব্যাপী অবস্থান নেয়। ৯ ডিসেম্বর ভোর ৫টায় হানাদার বাহিনী গোলবারুদ, অস্ত্র ও কনভয়সহ তাদের বাঙালী দোসর রাজাকার, আলবদর, আলসামস ও মুজাহিদ বাহিনী নিয়ে ফরিদপুরের উদ্দেশে রওনা দেয়। ভোর সাড়ে ৫টার দিকে ঘটকচর ব্রিজ পার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আক্রমণ শুরু করে। মুক্তিযোদ্ধাদের তাড়া খেয়ে হানাদার বাহিনী দ্রুত গাড়ি চালাতে থাকে। অবস্থা বেগতিক দেখে তারা একটি কনভয় থেকে নেমে কভার ফায়ার করতে করতে আরও দ্রুত সকল গাড়ি নিয়ে এগুতে থাকে। এ সময় হানাদার বাহিনীর ফেলে যাওয়া কনভয় থেকে মুক্তিযোদ্ধারা বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদ সংগ্রহ করে নেয়। মুক্তিযোদ্ধাদের গুলিবর্ষণে ভীত হয়ে এদিক-ওদিক ছোটাছুটি করে হানাদার ও তাদের দোসরদের একটি অংশ সমাদ্দার ব্রিজের দুইপাশে পূর্বে তৈরি করা বাঙ্কারে আশ্রয় নিয়ে পাল্টা গুলি ছুড়তে থাকে। অপর অংশ ২টি কনভয় ও একটি জিপসহ সমাদ্দার ব্রিজ পাড় হয়ে রাজৈর থানার টেকেরহাটের দিকে পালিয়ে যায়। তারা টেকেরহাট ফেরি পাড় হয়ে ফরিদপুর যাওয়ার সময় ছাগলছিড়া নামক স্থানে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিরোধের মুখে পড়ে। উপায়ান্ত না দেখে ৩০ পাকিসেনা ও ১২ রাজাকারসহ আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়। এদিকে সমাদ্দার ব্রিজে ৯ ডিসেম্বর সারাদিন সারারাত এবং ১০ ডিসেম্বর সারাদিন সম্মুখযুদ্ধ চলে মুক্তিযোদ্ধা ও হানাদার বাহিনীর মধ্যে। তুমুল যুদ্ধের এক পর্যায়ে হানাদার বাহিনীর গোলাবারুদ স্তিমিত হয়ে আসলে ১০ ডিসেম্বর বিকেলে মুক্তিযোদ্ধাদের পক্ষ থেকে হ্যান্ডমাইকযোগে পাকি বাহিনীকে আত্মসমর্পণের আহ্বান জানানো হয়। এতে সাড়া দিয়ে হানাদার বাহিনী রাইফেলের মাথায় সাদা কাপড় উড়িয়ে বাঙ্কার থেকে বেরিয়ে আসে এবং পাশের খাল থেকে পানি, গাড়ি থেকে শুকনো খাবার ও গোলাবারুদ নিয়ে পুনরায় বাঙ্কারে ঢুকে গোলাগুলি শুরু করে। এতে মুক্তিযোদ্ধারা আরও ক্ষিপ্র হয়ে পাল্টা আক্রমণ শুরু করে। দুইপক্ষের মধ্যে তুমুল যুদ্ধে ২০ পাকি সেনা ও ১৪ মুজাহিদ রাজাকার নিহত হয়। যুদ্ধে শহীদ হন মাদারীপুরের সর্বকনিষ্ঠ মুক্তিযোদ্ধা সরোয়ার হোসেন বাচ্চু। ভোলা নিজস্ব সংবাদদাতা ভোলা থেকে জানান, আজ ১০ ডিসেম্বর। ১৯৭১ সালের এদিনে পাক হানাদার মুক্ত হয় দ্বীপজেলা ভোলা। দীর্ঘ ৯ মাসের সশস্ত্র সংগ্রাম ও যুদ্ধের পর পাক হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসররা ভোলার মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিরোধের মুখে ভোলা থেকে পালিয়ে যায়। ভোলাকে স্বাধীন করে ভোলার বীর সন্তানরা। ভোলা জেলা মুক্তিযেদ্ধো সংসদের সাবেক কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা দোস্ত মাহামুদ,সাবেক ডেপুটি কমান্ডার শফিকুলই সলাম,বীর মুক্তিযোদ্ধা এম হাবিবুর রহমান জানান, ১৯৭১-এ দেশ রক্ষায় সারাদেশের ন্যায় ভোলাতেও চলে মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি। ভোলা সরকারী স্কুল মাঠ, বাংলা স্কুল, টাউন স্কুল মাঠ ও ভোলা কলেজ মাঠের কিছু অংশে মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণ শুরু হয়। পরে মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে পাক হানাদার বাহিনীর সম্মুখযুদ্ধ হয় ভোলার ঘুইংঘারহাট, দৌলতখান, বাংলাবাজার, বোরহানউদ্দিনের দেউলা ও চরফ্যাশন বাজারে। স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালীন ভোলা শহরের পানি উন্নয়ন বোর্ড অফিস চত্বর দখল করে পাক হানাদার বাহিনী ক্যাম্প বসায়। সেখান থেকে চালায় নানান পৈশাচিক কর্মকাণ্ড। ১৯৭১ সালের এদিনে পাক হানাদার বাহিনীর কবল থেকে মুক্ত হয় আজকের দ্বীপজেলা ভোলা। সেদিন সকালে পাক বাহিনী ভোলা লঞ্চঘাট হয়ে কার্গো লঞ্চযোগে পালিয়ে যায়। এ সময় তারা গুলি বর্ষণ করতে করতে পালিয়ে যায়। পরে অবশ্য চাঁদপুরের ডাকাতিয়া নদীতে মিত্র বাহিনীর বিমান হামলায় কার্গো লঞ্চটি ডুবে গেলে ভোলার পাক হানাদারদের সব সদস্য নিহত হয়। সকালে পাক বাহিনীর পালিয়ে যাওয়ার খবর পেয়ে হাজার হাজার মুক্তিকামী মানুষ ভোলার রাজপথে নেমে আসে। ‘জয় বাংলা’ ‘তোমার নেতা, আমার নেতা’ ‘শেখ মুজিব, শেখ মুজিব’ স্লোগানে স্লোগানে মুখরিত করে চারপাশ। নড়াইল নিজস্ব সংবাদদাতা নড়াইল থেকে জানান, আজ ১০ ডিসেম্বর নড়াইল হানাদার মুক্ত দিবস। একাত্তর সালের এই দিনে নড়াইলের মুক্তিপাগল দামাল ছেলেরা মিত্র বাহিনীর কোন প্রকার সহযোগিতা ছাড়াই পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীকে সম্মুখযুদ্ধে পরাজিত করে নড়াইলকে মুক্ত করে। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে দশ লক্ষাধিক মানুষের বিশাল জনসভায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণে স্বাধীনতার যে আহ্বান ছিল নড়াইলের মুক্তিপাগল জনতা তা থেকে পিছুপা হয়নি। নড়াইল ছিল মুক্তিযুদ্ধে ৮নং সেক্টরের অধীন রণ কৌশলগত এলাকা। প্রথমদিকে ওসমান চৌধুরী এবং পরবর্তীতে মেজর মঞ্জুর নেতৃত্ব দেন এই সেক্টরের। ১৩ এপ্রিল যশোর অবস্থানের পরই হানাদাররা, তাদের এদেশীয় দোসর রাজাকার, আল-বদরদের সহায়তায় নড়াইলের নিরীহ জনগণের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে গণহত্যা শুরু করে। ৭ ডিসেম্বর মুক্তিযোদ্ধারা ফজলুর রহমান জিন্নার নেতৃত্বে নড়াইল কলেজের দক্ষিণে মাছিমদিয়া গ্রামে সমবেত হয়ে পাকিস্তানী পুলিশ ও রাজাকারদের ওপর অতর্কিতে আক্রমণ চালায়। এই যুদ্ধে তরুণ মুক্তিযোদ্ধা লোহাগড়ার জয়পুর গ্রামের মিজানুর রহমান হানাদার বাহিনীর হাতে শহীদ হন। মিজানুর রহমানের মৃতদেহ হানাদার বাহিনীর দোসররা হাত-পা বেঁধে ঝুলিয়ে নড়াইল শহর প্রদক্ষিণ করে আতঙ্ক সৃষ্টি করে এবং ছবি তোলে। ৯ ডিসেম্বর বিজয়ের তীব্র আকাক্সক্ষা নিয়ে নড়াইলের মুজিব বাহিনীর কমান্ডার শরীফ হুমায়ুন কবীরের নেতৃত্বে দুই শতাধিক মুক্তিযোদ্ধা জড়ো হয়। মুক্তিযোদ্ধারা নড়াইল ভিক্টোরিয়া কলেজের দক্ষিণ দিক থেকে আক্রমণ চালালে হানাদার বাহিনীর পাল্টা আক্রমণে সম্মুখযুদ্ধে বাগডাঙ্গার মুক্তিযোদ্ধা মতিয়ার রহমান শহীদ হন। ওই দিনই পানি উন্নয়ন বোর্ডের বাংলোতে অবস্থানরত পাকিস্তান মিলিটারির ৪০ সদস্যকে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দিলে তারা আত্মসমর্পণে অস্বীকৃতি জানায়। এ সময় মুক্তিবাহিনীর যোদ্ধারা চতুর্দিক থেকে প্রচণ্ড গোলাবর্ষণ শুরু করলে পাক মিলিটারিরা আত্মসমর্পণে বাধ্য হয়। মুক্তিযোদ্ধারা সারারাত শহরে বিজয় উল্লাস করে জয় বাংলা স্লোগানে শহর প্রকম্পিত করে তোলে এবং ১০ ডিসেম্বর নড়াইলকে পাক হানাদার মুক্ত ঘোষণা করে। রাণীনগর নিজস্ব সংবাদদাতা নওগাঁ থেকে জানান, বাঙালী জাতির স্বাধীনতা সংগ্রামের চূড়ান্ত বিজয়ের দিন ১৬ ডিসেম্বরের বাকি আর ৬ দিন। ১৯৭১ সালের ১০ ডিসেম্বর রাণীনগরবাসীর জন্য একটি স্মরণীয় দিন। আজকের এই দিনে নওগাঁর রাণীনগর উপজেলা হানাদার মুক্ত হয়। স্বাধীনতা সংগ্রামে সাড়া দিয়ে সারাদেশের ন্যায় এই উপজেলার মুক্তিযোদ্ধারা মাতৃভূমিকে শত্রুমুক্ত করার লড়াইয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন। মহান স্বাধীনতা সংগ্রামের ৯ মাস রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ের পর নওগাঁর রাণীনগর উপজেলাবাসী আজকের এ দিনে শত্রুমুক্ত হয়ে বিজয় উল্লাস আর ‘জয় বাংলা, বাংলার জয়’ জয়ধ্বনিতে প্রকম্পিত করে তুলেছিল রাণীনগর উপজেলার আকাশ-বাতাস। ১৯৭১ সালের ৯ ডিসেম্বর রাণীনগর পাকি-হানাদার মুক্ত করার লক্ষ্যে কমান্ডার হারুন-অল-রশিদ, রঞ্জু আহমেদের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা থানা সদরে থাকা হানাদার ক্যাম্প চারদিক থেকে ঘেরাও করেন। পরদিন ১০ ডিসেম্বর সম্মুখযুদ্ধে গোলাগুলির এক পর্যায়ে ১৭ জন রাজাকার অস্ত্রসহ আত্মসমর্পণ করে। এই সময় পাকি-হানাদার বাহিনী রেললাইন দিয়ে সান্তাহার অভিমুখে পালিয়ে যায়। বীর মুক্তিযোদ্ধা সামছুর রহমান শ্যাম বলেন, ৯ ডিসেম্বর আমিসহ আমার কয়েকজন সহযোদ্ধা পাকি বাহিনীর চৌকি রাণীনগর থানা প্রাঙ্গণ, পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় ও আহম্মদ আলীর বাসায় পূর্ব দিক থেকে আস্তে আস্তে ঘিরে নিয়ে সম্মুখযুদ্ধের মাধ্যমে অগ্রসর হতে থাকি। এই সম্মুখযুদ্ধে লুৎফর রহমান নামে এক মুক্তিযোদ্ধা পাকি-বাহিনীর গুলিতে নিহত হোন। পরদিন ১০ ডিসেম্বর পাকি-বাহিনী আমাদের গেরিলা যুদ্ধের কাছে হার মেনে রেললাইন ধরে সান্তাহারের দিকে পালিয়ে যায়। আর এভাবেই লুৎফর রহমানের বুকের তাজা রক্তের বিনিময়ে ১০ ডিসেম্বর পাকি-হানাদার মুক্ত হয় রাণীনগর উপজেলা।

আরো পড়ুন  

×