
ছবি: প্রতীকী
প্যারেন্টিং স্টাইল হচ্ছে শিশু লালন-পালন করার কলাকৌশল। অর্থাৎ বাবা-মা তার শিশুকে কীভাবে বড় করে তুলছেন, তার সাথে কেমন আচরণ করছেন, কীভাবে যত্ন নিচ্ছেন, কী ধরনের শিক্ষা দিয়ে বড় করছেন এই সবকিছুই প্যারেন্টিং স্টাইলের অন্তর্ভুক্ত।
প্রত্যেকটি শিশু তাদের নিজস্ব ব্যক্তিত্ব নিয়ে পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করে। তবে বাবা-মায়ের প্যারেন্টিং স্টাইল ঠিক করে দেয় শিশুটির সামাজিক দক্ষতা, চিন্তাধারা, দৃষ্টিভঙ্গি, পরিবেশ-পরিস্থিতির সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়ার ক্ষমতা এবং তাদের আচার-আচরণ কেমন হবে।
আমাদের দেশের বেশিরভাগ বাবা-মায়েরাই সন্তানের বিকাশের জন্য সঠিক প্যারেন্টিং স্টাইল সম্পর্কে সচেতন নয়। তবে বর্তমানে অনেকেই এর গুরুত্ব বুঝতে শুরু করেছেন। চলুন এমন তিন ধরনের প্যারেন্টিং স্টাইল সম্পর্কে আলোচনা করি, যা শিশুদের জন্য চরম ক্ষতিকর।
[এখানে মনোবিজ্ঞানের গবেষণায় প্রকাশিত শিশুদের জন্য ক্ষতিকর তিন ধরনের প্যারেন্টিং স্টাইল সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে]
১. কর্তৃত্ববাদী প্যারেন্টিং (Authoritarian parenting)
‘Journal of Cognitive Psychotherapy’র গবেষণার মতে, এই ধরনের প্যারেন্টিং-এ পিতা-মাতারা শিশুদের কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করে তাদের থেকে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি প্রত্যাশা করেন। তারা শিশুদের মতামত এবং পছন্দ-অপছন্দকে কোন প্রকার গুরত্ব না দিয়ে নিজেদের মতামত তাদের উপর চাপিয়ে দেওয়াকেই সঠিক মনে করে থাকেন। এই ধরনের প্যারেন্টিং স্টাইলে শিশুদের আলাদা কোন ব্যক্তিস্বাধীনতা থাকে না।
বাবা-মায়েরা সন্তানের অন্ধ আনুগত্য প্রত্যাশা করে তারা যেটা বলবেন সেটাই হতে হবে এই নীতিতে বিশ্বাসী থাকেন। বাবা-মায়ের ‘কারণ আমি বলেছি তাই এটাই তোমাকে করতে হবে’ এমন চাপিয়ে দেয়া সিদ্ধান্ত এই ধরণের প্যারেন্টিং-এর উদাহরণ।
‘World Journal of Social Sciences’র গবেষণায় দেখা যায়, এ ধরনের শাসনে সন্তানরা প্রচণ্ড মানসিক চাপের মধ্যে বেড়ে ওঠায় হীনমন্যতা এবং প্রায়শই অপরাধবোধে ভোগে। এছাড়াও আত্মসম্মানবোধ এবং আত্মবিশ্বাসের প্রচুর ঘাটতি তৈরি হওয়ায় সমাজে সবার সাথে খাপ খাইয়ে চলাটা তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। তাদের মধ্যে মানসিক সমস্যাও বেশি দেখা যায় এবং পড়াশোনাতেও খুব একটা ভালো করতে পারে না।
২. লেসেজ-ফেয়ার প্যারেন্টিং (Laissez-faire)
‘Laissez-faire’ একটি ফরাসি শব্দ যার অর্থ ‘মানুষকে যা খুশি তা-ই করতে দেওয়া।’ যেখানে এই ধরনের প্যারেন্টিং-এ পিতামাতারা তাদের সন্তানের আচরণের উপর খুব কম নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেন। সন্তানদের খাবার, ঘুম এবং টেলিভিশন দেখার মতো বিষয়ে তাদের নিজস্ব সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ দেন।
১৯৮৯ সালে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা যায়, পিতা-মাতার এই ধরনের শাসনে সন্তানরা বেশি আবেগপ্রবণ, অবাধ্য এবং প্রাপ্তবয়স্কদের উপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে থাকে। বাউমরিন্ড তার গবেষণায় দেখিয়েছেন, কিশোর বয়সে এই শিশুদের অনেকেরই আত্মনিয়ন্ত্রণে দুর্বলতা, স্কুলে খারাপ পারফর্মেন্স এবং মাদক গ্রহণের উচ্চহার ছিল।
Group Dynamics-এর একটি গবেষণার মতে, এই ধরনের বাবা-মায়েরা সন্তানদের উপর কম নিয়ম-কানুন আরোপ করেন এবং বন্ধুর মতো আচরণ করেন। ফলে শিশুরা অতিরিক্ত স্বাধীনতা পায় এবং প্রায়ই সমস্ত বিধি-নিষেধ থেকে মুক্ত থাকে। বাবা-মা মনে করেন সন্তানের স্বাধীনতায় তাদের হস্তক্ষেপ করা উচিত হবে না। তবে শাসন ও নিয়ন্ত্রণের অভাব শেষ পর্যন্ত তাদের সন্তানের জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
৩. অনীহা বা উদাসীনতাযুক্ত প্যারেন্টিং (Neglectful/Uninvolved Parenting)
'Journal of Child and Family Studies’র ২০১৮ সালের গবেষণায় দেখা যায়, এই ধরনের প্যারেন্টিং-এ বাবা-মায়েরা শিশুদের চাহিদা এবং প্রয়োজনের দিকে উদাসীন থাকে। তারা শিশুদের প্রচণ্ড অবহেলা ও উদাসীনতায় বড় করেন। এখানে শিশুরা অতিরিক্ত স্বাধীনতা পেয়ে থাকে এবং বাবা-মা তাদের মতামতের উপর তেমন একটা হস্তক্ষেপ করেন না।
এভাবে বেড়ে ওঠা শিশুদের জীবনে তেমন কোনো শৃঙ্খলা থাকে না। জীবনের বেশিরভাগ সময় অযত্নে বেড়ে ওঠা শিশুদের প্রতি বাবা-মা তেমন একটা আকাঙ্ক্ষা অথবা প্রত্যাশাও রাখেন না।
সাধারণত এসব ক্ষেত্রে দেখা যায়, বাবা-মায়েদের নিজেদের মানসিক কোন সমস্যা থাকে অথবা তারাও শৈশবে অবহেলায় বেড়ে উঠে। ফলে তারাও তাদের সন্তানদের অযন্তে বড় করে যা শিশুর ভবিষ্যতের জন্য ক্ষতিকর।
উদাহরণস্বরূপ, পিতা-মাতা যদি সন্তানের পড়াশোনা বা স্কুলের ব্যাপারে খোঁজ-খবর না রাখেন, সন্তানের হোমওয়ার্কে সাহায্য না করেন তবে সন্তান হীনমন্যতায় ভুগতে পারে বা একাকীত্ব অনুভব করতে পারে।
২০২২ সালের Cureus গবেষণায় প্রকাশিত হয়, অনীহাযুক্ত প্যারেন্টিং দ্বারা সৃষ্ট ক্ষতি গভীর এবং দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। এই ধরনের পরিবেশে বেড়ে ওঠা শিশুদের প্রায়ই নিজেদের অপ্রয়োজনীয় মনে করে এবং তাদের আত্মসম্মান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একাকীত্বের ফলে উদ্বেগ, বিষণ্ণতা অথবা মানসিক সমস্যাও ভুগতে পারে শিশু। এছাড়া এ ধরনের শিশুদের নৈতিক মূল্যবোধের অভাব এবং আচরণগত সমস্যাও দেখা দেয়।
সূত্র : https://shorturl.at/wmG3V
রাকিব