
রুমি একজন প্রেমিক, একজন সাধক, একজন গুরু এবং সর্বোপরি একজন ঈশ্বরের প্রেমে মগ্ন দার্শনিক। তার কবিতায় ঈশ্বরের প্রতি প্রেম এক দুর্নিবার আকর্ষণের মতো ছড়িয়ে আছে। প্রেম, ভক্তি, আধ্যাত্মিকতা, এবং আত্মসন্ধানের যে অপূর্ব মেলবন্ধন রুমির লেখায় পাওয়া যায়, তা কেবল সাহিত্য নয় এটি আত্মার অভিজ্ঞতা, হৃদয়ের আকুতি এবং গভীর এক তৃষ্ণার প্রতিফলন। রুমির ঈশ্বর দর্শন কেবল নির্দিষ্ট কোনো ধর্মীয় মতবাদে সীমাবদ্ধ নয়, এটি এক সর্বজনীন ভালোবাসার প্রকাশ, যেখানে ঈশ্বরকে পাওয়া যায় প্রেমের গভীরতায়, মানবতাবোধে এবং আত্মনিবেদনে।
রুমির জীবনের সবচেয়ে বড় মোড় আসে শামস তাবরিজির সঙ্গে সাক্ষাতে। শামসের উপস্থিতি রুমির ভেতরে এমন এক আগুন জ্বেলে দেয়, যা তাকে পার্থিব জ্ঞান থেকে আত্মিক জ্ঞানের পথে ধাবিত করে। শামস তার কাছে ছিলেন এক রহস্যময় দরবেশ, যিনি তাকে শেখান প্রেমের প্রকৃত অর্থÑ যেখানে ঈশ্বর কেবল উপাসনার বিষয় নয়, এক গভীর অনুভূতি, এক ধ্যান, এক অব্যক্ত আকর্ষণ। রুমি প্রেমের যে ব্যাখ্যা দেন, তা ধর্মের প্রচলিত কাঠামো হতে ভিন্ন। এই প্রেম ব্যক্তিগত, আত্মিক এবং সর্বজনীনÑ যা মানুষকে মুক্ত করে, তাকে নতুন এক আলোয় উদ্ভাসিত করে।
রুমির কবিতাগুলোতেও এই প্রেম ঈশ্বর দর্শনের মূল উপজীব্য হয়ে ওঠে। তার প্রতিটি কবিতায় ঈশ্বর যেন এক প্রেমিক, আর আত্মা যেন প্রেমে বিভোর প্রিয়তমা। এই হৃদয়ের গভীরে ঈশ্বরের অবস্থানই রুমির দৃষ্টিতে প্রকৃত ঈশ্বর দর্শন। এটি কোনো বাহ্যিক আচার বা অনুশাসনে সীমাবদ্ধ নয়, অন্তরের গভীর অনুভবে, একাগ্র ভালোবাসায় এবং সমস্ত অস্তিত্বকে বিসর্জনের মধ্য দিয়ে উপলব্ধ হয়।
রুমি প্রেমকে দেখেছেন আত্মার মুক্তির পথ হিসেবে। তার মতে, ঈশ্বর প্রেম ছাড়া ধরা দেন না। প্রেম হচ্ছে সেই আগুন, যা আমাদের অন্তরের অন্ধকার দূর করে, অহংবোধকে বিলীন করে এবং আমাদের প্রকৃত সত্তার সন্ধান দেয়। রুমির ঈশ্বর দর্শনে কোনো কঠোর বিধান নেই, নেই কোনো জটিল ধর্মতত্ত্ব। তিনি ঈশ্বরকে উপলব্ধি করেন এক ভালোবাসার স্রোতধারায়, যেখানে প্রেমিক আর প্রিয়তম এক হয়ে যায়, ভক্ত আর ঈশ্বরের মাঝে কোনো পার্থক্য থাকে না।
রুমি বিশ্বাস করতেন, ঈশ্বরকে পেতে হলে প্রেমের গভীরতায় ডুব দিতে হয়, নিজেকে হারাতে হয়, নিজের সব অহং ও গর্বকে বিসর্জন দিতে হয়। তার কবিতায় প্রেম কখনো পরম প্রেমিকের কাছে আত্মসমর্পণের আহ্বান, কখনো বা এক ব্যাকুল তৃষ্ণার প্রকাশÑ যেখানে ঈশ্বর একমাত্র অবলম্বন। তার মসনবী থেকে শুরু করে সমস্ত রচনাতেই এই আত্মিক প্রেমের প্রবাহ বইতে থাকে।
রুমির দর্শন আজও প্রাসঙ্গিক, কারণ এটি মানব হৃদয়ের গভীর চাওয়া-পাওয়ার গল্প। আধুনিক জগতের কোলাহলে, যেখানে আমরা আত্মিক শূন্যতায় ভুগছি, সেখানে রুমির প্রেমময় ঈশ্বর দর্শন আমাদের মনে করিয়ে দেয়Ñ সত্যিকারের পূর্ণতা বাহ্যিক কোনো সাফল্যে নয়, আত্মার গভীর সংযোগে, প্রেমের নিঃস্বার্থ উৎসর্গে।
রুমি আমাদের শেখান, ঈশ্বর কেবল এক ধর্মীয় ধারণা নয়, ঈশ্বর এক অনুভূতি, এক প্রবাহ, যা ভালোবাসার মাধ্যমে ধরা দেয়। আর সেই ভালোবাসা যখন নিঃস্বার্থ, যখন সমস্ত অস্তিত্বকে জড়িয়ে নেয়, তখনই ঈশ্বর ধরা দেন প্রেমের রূপে।
রুমি কেবল এক কবি নন, তিনি প্রেমের এক সাধক, এক দার্শনিক, যিনি আমাদের শেখানÑ প্রেমই ঈশ্বর, আর ঈশ্বরই প্রেম। তার দর্শন আজও মানুষের আত্মার খোরাক জোগায়, প্রেমের প্রকৃত রূপ বুঝতে সাহায্য করে। সত্যিকারের প্রেমে ডুবে গেলে, আত্মার গভীরে উঁকি দিলে, ঈশ্বরকেও পাওয়া যায়Ñ এটাই রুমির চিরন্তন বাণী।