ঢাকা, বাংলাদেশ   বৃহস্পতিবার ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, ১৫ ফাল্গুন ১৪৩১

শহীদ মিনার শান্তিনিকেতনে

অরূপ তালুকদার

প্রকাশিত: ১৭:২২, ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৫

শহীদ মিনার শান্তিনিকেতনে

কিছুদিন আগে আরেকবার গিয়েছিলাম কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের হাজারো স্মৃতিবিজড়িত শান্তিনিকেতনে। ওখানে গিয়ে সেদিন যথারীতি নানা দর্শনীয় স্থান দেখতে গিয়ে আমাদের অটো ড্রাইভার তথা গাইড সমীর আমাদেরকে এমন একটি দর্শনীয় স্থানে নিয়ে গেল সেখানে গিয়ে যা দেখলাম তা দেখে আমি রীতিমতো অবাক হয়ে গেলাম। ওখানকার স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে ওখানে এ রকম একটি ঐতিহাসিক স্থাপনা নির্মাণ করার অনুমতি দেওয়ার জন্য মনে মনে ধন্যবাদ জানালাম।
যাবার দিন কলকাতা থেকে সকালের দিকে রওনা হয়ে ট্রেনে শান্তিনিকেতন পৌঁছে গেলাম দুপুরের দিকে। বোলপুর স্টেশনে নেমে ওখান থেকেই দর্শনীয় স্থানগুলো দেখার উদ্দেশ্যে পরবর্তী দুদিনের জন্য স্থানীয় অটো ড্রাইভার সমীরের সঙ্গে কথা বার্তা বলে তাকে বুক করে নিলাম। সে তার অটো নিয়ে আমাদেরকে বিভিন্ন স্থান ঘুরিয়ে সব দেখাবে এবং প্রয়োজনে গাইডের কাজ করবে।
উঠলাম আগে থেকে বুক করা স্টেশনের কাছাকাছি একটা হোটেলে। সেখানে কিছুটা দ্রুততার সাথে দুপুরের খাওয়া-দাওয়া সেরে একটু বিশ্রাম নিয়েই বেরিয়ে পড়লাম ওর সাথে।
তারপর প্রায় ঘণ্টা দু’য়েক এদিক সেদিক ঘুরে বেশ কিছু বিখ্যাত স্থান এবং কবিগুরু স্থাপিত বিশ্বভারতীসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠান ইত্যাদি দেখে বিকেলের দিকে চলে এলাম আরেকটি বিখ্যাত স্থান সোনাঝুরির হাটে।
এই হাটটি আগে এক সময় ছিল ‘শনিবারের হাট’। আয়তনে তখন অনেক ছোট ছিল। সময়ের সাথে সাথে নানা ধরনের ছোট বড় দোকানপাটসহ এটি এখন বেশ বড় পরিসরে বসছে। স্বাভাবিকভাবে জনসমাগমও বেড়েছে প্রচুর।
এখানে রবীন্দ্র স্মৃতিবিজড়িত নানা ধরনের জিনিসপত্রের সাথে পাওয়া যায় স্থানীয় চিত্রশিল্পী ও মৃৎশিল্পীদের তৈরি সংগ্রহে রাখার মতো বিভিন্ন ধরনের জিনিসপত্র।
সোনাঝুরির হাট থেকে কিছু কেনা কাটা করে ফেরার পথে সমীর আমাদেরকে নিয়ে গেল কিছুটা দূরে বড় রাস্তা থেকে ডানদিকে একটু ভেতরে সেই স্থানে যেখানে বসে আছেন সেই বিখ্যাত ধ্যান গম্ভীর বুদ্ধদেব। ৩৪ ফুট উঁচু বিশাল সেই সফেদ বুদ্ধ মূর্তির সামনে দাঁড়ালে নিজের অজান্তেই যেন গভীর শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে আসে।
সেখানেই তার অন্যপাশে দেখলাম আমাদের দেশের ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিবিজড়িত বেশ বড় একটি শহীদ মিনার। যেটি উদ্বোধন করা হয়েছে ১১ নভেম্বর, ২০২৩-এ। শহীদ মিনারটির সিঁড়ির দু’পাশে দুটি শ্বেত পাথরের ফলক। তার একটিতে লেখা রয়েছে : অদ্য ১১.১১.২৩. বিশিষ্ট রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব বীরভূম জেলা পরিষদের সভাধিপতি ফয়েজুল হক (কাজল শেখ) কর্তৃক বাংলা ভাষা আন্দোলনের শহীদদের স্মৃতি স্মারক উন্মোচন করা হল।’
এই ফলকটি সিঁড়ির বা পাশে, সিঁড়ির ডান পাশের ফলকটিতে লেখা রয়েছে : পশ্চিম আবুরখিল, রাউজান, চট্টগ্রামের কৃতি সন্তান আর্কিটেক্ট বিশ্বজিৎ বড়ুয়ার অর্থায়নে। সহধর্মিণী স্মৃতি রানী সিংহের অনুপ্রেরণায় ‘ভাষা শহীদদের স্মৃতি স্মারক’ স্থাপনাটি উৎসর্গিত হল। ১৯.১১.২৩।
মিনারটির মাঝখানের স্তম্ভটির একেবারে নিচে শ্বেত পাথরের ছোট একটি ফলক আছে, যাতে লেখা রয়েছে : ভাষা শহীদদের স্মৃতি স্মারক।
এ ছাড়াও শহীদ মিনারের পাশে নীল রঙের বেশ বড় আরেকটি বোর্ড বসানো হয়েছে, তাতে লেখা রয়েছে : শহীদ মিনারের প্রকৃত ভাস্কর ছিলেন নভেরা আহমেদ। ষাটের দশকে তিনি পূর্বতন পূর্ব পাকিস্তান ছেড়ে চলে যান ফ্রান্সে। সে সময় বিদেশে চলে যাওয়া মানেই ছিল সবকিছুর অন্তরালে চলে যাওয়াÑ কারণ তখন ইন্টারনেট বা সামাজিক যোগাযোগের কোন মাধ্যম ছিল না। এমনকি বিদেশেও নিজেকে তিনি রেখেছিলেন অন্তরালে।
১৯৯৫ সালে ‘নভেরা’ নামের একটি উপন্যাস লেখেন হাসনাত আব্দুল হাই। সেই উপন্যাসের মাধ্যমে বাঙালি জাতি জানতে পারে যে, শহীদ মিনারের ডিজাইন এবং সৃষ্টির পেছনে এক অনিন্দ্য সুন্দরী আধুনিক নারী ভাস্কর জড়িয়ে আছেন, তার নাম নভেরা আহমেদ।
এটা হামিদুর রহমানের কাজ নয়। শহীদ মিনারের পাঁচটা স্তম্ভ রয়েছে। এর মাঝখানেরটা বড়। সেটা আবার উপরের দিকে গিয়ে আনত হয়েছে। শহীদ মিনারের মডেল কোন মাতৃরূপের প্রতীক নয়। এটা হচ্ছে ভগবান গৌতম বুদ্ধের বোধি বৃক্ষের তলে বসে থাকা বুদ্ধের অঙ্গুলি সংকেত, মিনারে পাঁচটি স্তম্ভের নমনীয় আনত ভাবের প্রেরণা। বোধিতলে উপবিষ্ট বুদ্ধের অঙ্গুলি সংকেতকে প্রকাশ করেছেন। হাতের মুদ্রার আনত ভঙ্গি। যাতে মূর্ত একটি মাত্র অনাবিল মন্ত্র- সর্বে সত্তা সুখিতা হোন্তু’/ ‘সকল প্রাণী সুখী হোক।’ ইতি- বিনয়াশ্রী ভিক্ষু, শান্তিনিকেতন ১৯-১১-২০২৩।’
রক্তস্নাত ‘বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন এবং তার প্রতীক শহীদ মিনার আজ শুধু আমাদেরই গৌরবময় ইতিহাসের সামগ্রী নয় আজ এইসব কিছু আমাদের মতো বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের গর্বের বিষয়।       
একুশে ফেব্রুয়ারি ‘আমাদের মাতৃভাষা দিবস’। ‘ইউনেস্কোর’ সিদ্ধান্ত ও ঘোষণা অনুযায়ী বিগত ২০০০ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু করে সারা পৃথিবী জুড়ে এই দিনটি এখন প্রতি বছর ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ রূপে যথাযথ মর্যাদায় পালিত হয়ে আসছে।

×