ঢাকা, বাংলাদেশ   বৃহস্পতিবার ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, ১৫ ফাল্গুন ১৪৩১

নারী-শিক্ষা শক্তি ও মুক্তি

নাজনীন বেগম

প্রকাশিত: ১৬:২৯, ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৫

নারী-শিক্ষা শক্তি ও মুক্তি

শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড। যুগ-যুগান্তরের চিরস্থায়ী প্রবাদ। সেখানে সমসংখ্যক নারীকেও কোনোভাবে পিছিয়ে রাখা যাবে না। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নব আঙ্গিকে কত অসমতা সামনে এসে যাচ্ছে বলাই বাহুল্য। সেখানে সবার আগে উঠে আসে নারী-পুরুষের অসাম্য, বিভাজন যা সমাজ ব্যবস্থায় কঠিন এক বলয়। ঊনবিংশ শতাব্দীর নারী জাগরণের পথিকৃৎ বেগম রোকেয়াও ভেবেছেন মেয়েদের আলোকিত জগতে পা রাখতে হলে সবার আগে বিদ্যাশিক্ষা জরুরি। সময়টা ছিল অবোধ বালিকাদের অপ্রাপ্ত বয়সে বিয়ের পিঁড়িতে বসানো। তার আগে নারী শিক্ষা নিয়ে ভেবেছেন উনিশ শতকের আর এক প্রাণপুরুষ ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। তিনিই প্রথম নারী শিক্ষার জন্য আন্দোলন শুরু করেন। উদাত্ত কণ্ঠে আহ্বান জানালেন কন্যা শিশুদের সবার আগে বিদ্যালয়ের গণ্ডিতে প্রবেশ করানো। নিজ উদ্যোগে বহু বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন তার অসামান্য কৃতিত্ব সমতার আলোকে কন্যা শিশুদের বিবেচনায় আনতে। আজ আমরা একবিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকে দাঁড়িয়েও আহ্বান জানাতে হচ্ছে, নারী শিক্ষা কতখানি জরুরি সার্বিক সমাজ কাঠামো গঠন প্রক্রিয়ায়। সমাজের একটা অংশ যদি  দ্রুততার সঙ্গে এগিয়ে যায় বাকি সমসংখ্যক যদি পদে পদে  হোঁচট খায় তা হলে দৃশ্যমান উন্নয়ন অধরাই থেকে যাবে। আমরা চিরায়ত সংস্কারাচ্ছন্ন ঐতিহ্যিক ধ্যান-ধারণায় আবর্তিত।
সঙ্গত কারণে নারী শিক্ষার প্রসার হলেও তার ধীরগতি এখনো সমতার আদলে জাতিকে এগিয়ে দিতে বারবার পিছু হটতে হচ্ছে। যেখানে আজও সেই পুরানো বিধি বাল্য বিয়েকে থামানো গেল নাÑ সেখানে শিক্ষার নবদ্যুতি পৌঁছানো কত দুরূহ বিষয় তা বলারই অপেক্ষা রাখে না। শুধু নারী শিক্ষা নয়, এই অপরাজেয় বিদ্যোৎসাহী পণ্ডিত আরও পরামর্শ দিলেন বিধবা নারীদেরও নতুন করে বিয়ের মাধ্যমে জীবন শুরু করা বাঞ্ছনীয়। কিন্তু আজও তেমন পশ্চাদপদ কুসংস্কারাচ্ছন্ন ধারাকে বদলানো গেল না। বাল্য বিয়ে প্রচলন থাকা মানেই এক অবোধ কন্যা শিশুর শিক্ষার উন্মুুক্ত অঙ্গন রুদ্ধতার কঠিন বলয়ে আটকা পড়ে যায়। তাই এখনো দাবি উঠছে নারী শিক্ষা সমতাভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণে জরুরিই শুধু নয়, নিজেকে মানুষের কাতারে নিয়ে আসার সর্বোত্তম উপায়ও বটে। পুরানো সরকারের লাগাতার অপশাসনে অতিষ্ঠ, উদ্বিগ্ন জাতির যখন নতুন বাংলাদেশের আধুনিক পরিক্রমাকে স্বাগত জানায় সেখানে সমসংখ্যক  নারীও পেছনে থাকার কোনো সুযোগ তৈরি না হওয়াও সময়ের অপরিহার্যতা। চলমান অনেক ইতিবাচক পরিস্থিতি আজ রুদ্ধতার অর্গল ক্রমান্বয়ে খুলে দিচ্ছে। নারী শিক্ষা প্রসারিত হচ্ছে দৃশ্যমান আর দৃষ্টি নন্দনভাবে। তা ছাড়া সুশিক্ষিত নারীরা ঘরে বসেও থাকছেন না। বহুমাত্রিক পেশায় নিজেদের দীপ্ত পদচারণায় নারীর কর্মক্ষেত্রে যে অবাধ বিচরণ তা যেন পেছনের সব অপবাদ, অপঘাত মুছে দেওয়ার পরম নির্মাল্য। তবে নারী শিক্ষা অবাধ ও অবারিত করতে হলে সবার আগে বাল্য বিয়ের ওপর কঠিন বেষ্টনী আরোপ করা নিতান্ত জরুরি বিষয়। বাল্য বিয়ে রোধ করা সম্ভব না হলে নারী শিক্ষাকে তার যথার্থ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করতে বেগ পেতে হবে। সেটা শুরু করতে হবে পারিবারিক গণ্ডি থেকেই পরিবারই তার কন্যা শিশুকে সব ধরনের অধিকার মর্যাদা দিয়ে সামনের জীবন তৈরিতে মুক্ত আবহ নিয়ে আসতে হবে। আমরা কিন্তু প্রাথমিকভাবে পারিবারিক। পরবর্তীতে সামাজিক নিয়ম, আচার-অনুষ্ঠানে সম্পৃক্ত হই। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা ব্র্যাক এক প্রতিবেদন উল্লেখ করে একজন কন্যা শিশু নাকি প্রথমেই তার মায়ের কাছ থেকেই অধিকার, স্বাধীনতার তারতম্যের শিকার হয়। মা-ই নিজের পুত্র-সন্তানের সঙ্গে তার গর্ভজাত কন্যাটির ফারাক তৈরি করেন। তবে এখন তেমন প্রভেদ-বিভাজন সেভাবে লক্ষণীয় নয়। একজন আধুনিক মা শিক্ষিত-অশিক্ষিত যাই হোন না কেন সন্তানের জীবন গড়ার প্রেক্ষিতে কোনো বৈষম্যকে সামনে আনছেন না। সেখানেও বলা যায় শিক্ষার মূল হাতিয়ার যাতে মা নিজেই তার সন্তানদের সেভাবে বিভাজনের গণ্ডিতে ফেলছেন না। যুগের তাগিদে সময়ের দৃপ্ত আহ্বানে রক্ষণশীল মায়েরা এখন আধুনিকতার নব আঙ্গিকে কন্যা সন্তানকেও পেছনে ফেলে রাখার কথা ভাবতেও পারছেন না। একবিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকের মধ্যাহ্নে আমরা তেমন সমতার বলয় প্রত্যক্ষ করছি যা সমসংখ্যক নারীকেও যোগ্যতা ও দক্ষতায় নিজের মতো এগিয়ে যেতে সুষ্ঠু পরিবেশ পরিস্থিতি উপহার দিচ্ছে। যার কারণে নারী সমাজ সক্ষমতা এবং পারদর্শিতায় নিজের অবস্থান তৈরিতে ক্রমান্বয়ে সামনের দিকে ধাবিত হচ্ছে। নারী শিক্ষা যত অবারিত হবে সমসংখ্যক ততই সমানভাবে এগিয়ে যাবে। 

×